Sunday, 15 May 2022

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য

লকডাউন, বাজারে আগুন, আর মনে ফাগুন নিয়ে ২০২০ টা কাটিয়েই  ফেললাম। ২০২০'রই শুরুর দিকে চাকরিখানা জুটিয়েছিলাম আমি আর রাজু , সে গপ্পো তো আপনারা জানেনই। দুজনে মিলে প্ল্যান বানিয়েছিলাম সুন্দরবন যাব প্রথম মাসের মাইনে পেলে। রাজু তো ভুলোদার থেকে টাকা ধার করে আমাজন থেকে একখানা রিফারবিশড ডিএসএলআরও কিনে ফেললো, "খেঁদি, বাঘের ছবি তুলবোই বুঝলে তো! দরকার হলে তোমাকে টোপ দিয়ে বাঘ ডেকে আনবো সামনে।"

কি অসভ্য ছেলে ভাবুন দিকি! সবে হাতটা মুঠো করেছি ওর পিঠে একটা রদ্দা বসানোর জন্যে, আমার মতলব বুঝে তিড়িং করে দুপা সরে গেল, তার পর বললো, " আহা চটছ কেন! তোমাকে কি খেতে পারবে নাকি বাঘ এক সিটিং-এ! বাঘ শুনেছি খুব অলস প্রাণী, তোমার একটা ঠ্যাং শেষ করতেই ওর ল্যাদ লেগে যাবে!"

সেইটা ছিল ফেব্রুয়ারী মাস।  তারপর বাকিটা ইতিহাস। সুন্দরবনের বাঘের আর আমাকে খেতে হল না, কোন হতভাগা চীনদেশে বাদুড় খেয়ে পৃথিবী জুড়ে লকডাউন আনলো, আর আমার আর রাজুর নতুন চাকরির মাইনের অর্ধেক বেরিয়ে গেলো শুধু ৫০ টাকার ফ্লেক ব্ল্যাকে ১৫০ টাকাতে কিনে কিনে। অবশ্য তারই মধ্যে আমার একটু গতি হয়েছে বটে অন্যদিকে, হেঁ হেঁ, ঐজন্যেই মনে ফাগুন বলছিলুম, কিন্তু সেই গপ্পো রাজু বলবেখন। আমি বরং ২০২০ টা স্কিপ করে ২০২১-এর জানুয়ারিতে এনে ফেলি আপনাদের। 

আনলক ৭ বা ৮ কিছু একটা চলছে তখন দেশে। সক্কালবেলা উঠে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, আর মনটা করছে লুচি লুচি। ভুলোদার বাড়ি যাব কিনা ভাবছি, বৌদিকে বললে খান দশেক কি আর করে দেবে না! কিন্তু লকডাউন শুরু হয়ে অবধি ভুলোদার বাড়িতে ঢোকার জন্যে স্ট্রিক্ট প্রোটোকল মেনে চলতে হচ্ছে। যাওয়ার অন্তত এক ঘন্টা আগে ফোন করে জানাতে হবে। আমাদের সকলের একসেট করে জামা ভুলোদা আগেই জমা করে নিয়েছে। যে বা যারা আসবে, তারা ফোন করলে বৌদি তাদের জামা ওয়াশিং মেশিনে ফেলবে। তারপর পৌঁছালে প্রথমে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভুলোদা ফেস শিল্ড আর পি পি ই কীট পরে স্যানিটাইজার স্প্রে করবে আপাদমস্তক। তারপর সোজা গেস্ট বাথরুম। স্নান করে কাচা জামা পরলে তবে আসল বাড়িতে ঢুকতে পাওয়া যাবে।  জানুয়ারির শীতে সক্কালবেলা এত ফাসাদ পোহাবো কিনা কটা লুচির জন্যে সেইটা ভাবছি, মোবাইলটা বেজে উঠল।  ভৌস্তকদা। আমার আর রাজুর বস। ওনার সাপ্তাহিক নিউজ ওয়েবসাইট "সর্বভারতীয় নিরপেক্ষ সংবাদ"-এর আমরা দুজন একাধারে রিপোর্টার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এবং এডিটর। যদিও নামে সর্বভারতীয়,  এক বছরে হাজার খানেকের বেশি ওর ফলোয়ার হয় নি।  যদিও ভৌস্তকদা তাতে বিচলিত নন।  ওনার বক্তব্য, "এক লক্ষ জালিয়াতের আমার দরকার নেই, একশো সৎ মানুষই বিপ্লবের জন্য যথেষ্ট। যতদিন আমাদের তিনজনের বাইরে একজনও পাঠক থাকবে, ততদিন আমি ওয়েবসাইটটা চালিয়ে যাব।" 

ফোনটা রিসিভ করলাম।  ওদিক থেকে ভৌস্তকদার গম্ভীর গলা ভেসে এলো, "খেয়া, আগের সপ্তাহের কন্টেন্ট-এর ওপর পাঠকদের রিভিউ ইমেল গুলো পড়ছিলাম বুঝলে। এই আনলক ৭-এর প্রাক্কালে সবাই জানতে চাইছে এই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে কোন কোন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া যায়। মানুষ এই এত দিন ঘরবন্দি থেকে পাগল হয়ে উঠেছে, এটা নিয়ে কিছু করার দরকার। একটা ভ্রমণ স্পেশাল এডিশন বার করি চলো।"

-"হ্যাঁ ভৌস্তকদা, আইডিয়াটা ভালোই। ঠিক আছে, আমি নর্থ বেঙ্গলের দিকের জায়গা গুলো নিয়ে আজই ইন্টারনেটে একটু ঘেঁটে দেখে নিচ্ছি..রাজুকে বলছি সাউথের দিকটা দেখে নিতে.."

আমার কথা শেষ হলো না, ভৌস্তকদা প্রায় আঁতকে উঠলেন, "ইন্টারনেটে দেখে লিখবে! না না একদম নয়।  মনে রেখো, আমরা পাঠকদের খাঁটি জিনিস পরিবেশন করি, এটাই আমাদের মোটো। আর এই মারণ রোগের সময় লোককে চেনা জানা টুরিস্ট স্পটে না পাঠিয়ে আমাদের উচিত কোনো অচেনা নির্জন  জায়গায় পাঠানো। সবথেকে ভালো হল জঙ্গলের দিকে কিছু জায়গার সন্ধান দেওয়া। খোলা বাতাস আর বিশুদ্ধ অক্সিজেনে মানুষের করোনাকালো ফুসফুস ভরে উঠবে। তোমাদের আমার এক বন্ধুর বাড়ি পাঠাবো ভাবছি। সে থাকে নর্থ বেঙ্গলেই, বক্সার জঙ্গলে। ইন্ডিয়ার জঙ্গল নিয়ে ওর থেকে ভালো কেউ জানে না।  নামটা লিখে রাখো। বনংশুর নট্যাচার্য্য। জানো, ওদের কোন পূর্বপুরুষ গিরিশ ঘোষের থেকে নট্যাচার্য্য উপাধি পেয়েছিলেন। অবশ্য আমরা বন্ধুরা ওকে বুনো বলেই ডাকি। আমি ওকে বলে রাখবো। তুমি রাজর্ষিকে ফোন করে নাও।  আজ বৃহস্পতি, শনিবারের গুয়াহাটি এক্সপ্রেসে সিট আছে দেখেছি। টিকেট করে নাও, অফিসের খরচ সব, তোমরা শুধু বিলটা রাখবে।"

আমি কোনো কথা বলার আগেই ফোনটা কেটে দিলেন ভৌস্তকদা। ভদ্রলোককে যে বলবো ওনার বন্ধুর একটা কন্টাক্ট নম্বর দিতে, সেই সুযোগও হলো না।  যাইহোক, রাজুকে ফোন করলাম। সে তো শুনে মহা খুশি, "খেঁদি, ডিএসএলআর টা কিনে কটা কাক আর কুকুরের ছবি ছাড়া কিছু তোলা হয় নি।  ফ্রীতে জঙ্গল ভ্রমণ হয়ে যাবে গো, তুমি ব্যাগ গোছাও, আমি টিকিট কাটছি। বক্সা তো, আলিপুরদুয়ার হয়ে যেতে হবে মনে হয়। শোনো, তুমি ওই বুনোশুরকে একটা ফোন করে নাও, ওর বাড়ি কিভাবে যাব আলিপুরদুয়ার থেকে সেটা জেনে নাও। "

"বুনোশুর না, বনংশুর। আরে ভৌস্তকদা নম্বরটাই দেননি। ঠিক আছে, তুই টিকিট কাট, আমি জেনে নিচ্ছি ভৌস্তকদাকে ফোন করে। "

কিন্তু এরপরে একটা রীতিমতো মুশকিলে পড়লাম। টিকিট তো রাজু পেয়ে গেল, কিন্তু ভৌস্তকদার ফোন বার বার সুইচড অফ আসতে লাগল। এই বনংশুরকে ভুলোদাও চেনে না, তাই ওদিক থেকেও কোন সুবিধা হল না।  শনিবার সকালে রাজু ফোন করে বললো, "খেঁদি, যা থাকে কপালে, ট্রেনে উঠে যাই চলো। ট্রেন আলিপুরদুয়ার পৌঁছনো অবধি ভৌস্তকদাকে ফোন করে যাব। তার পর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।"

সেটাই করা ঠিক হবে ডিসাইড করলাম। 

সেইমতো একটা ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে যাচ্ছি, একটা ফোন এলো। অচেনা নম্বর। ধরলাম।  ওপার থেকে এক মহিলাকণ্ঠ ভেসে এলো, গলায় সুমিষ্ট আন্তরিকতা, "ভাই তুমি কি খেয়া কথা বলছো? আমার নাম সুছন্দা। আমি বনংশুর নট্যাচার্য্যের স্ত্রী। আমাদের বন্ধু ভৌস্তক পরশু বলেছিল তোমাদের আগামীকাল আমাদের এখানে আসার কথা।  কিন্তু তারপর আর তার কোনো পাত্তা নেই। ওকে ফোন করে পাচ্ছি না।  আমি তোমাদের ওয়েবসাইটের কন্টাক্ট থেকে তোমার নম্বরটা পেলাম।  তা তোমরা কি আসছো?"

হাতে চাঁদ পেলাম যেন। সুছন্দাদিকে বলে দিলাম যে আমরা আসছি। উনি বললেন যে আমাদের নিতে স্টেশনে নিতে আসবেন, কারন কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ওঁদের বাড়ি অবধি যায় না। রাজুকে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়ে রওনা দিলাম হাওড়া স্টেশনের দিকে। 


ট্রেন চলছে ঢিকির ঢিকির করে। সবে সে এখন মালদা টাউন ছাড়িয়েছে। আমি আর রাজু কপালক্রমে একটা সাইড আপার-সাইড লোয়ার পেয়েছি, এবং গুছিয়ে বসে মোবাইলে মাল্টিপ্লেয়ার সাপ-লুডো খেলছি। রাজুর একটা ঘুঁটি সাপের মুখে পড়ে ৯১ থেকে সদ্য ৩-এ নেমেছে, তার বন্য আনন্দে আমি  ভাবছি  বারসোই'তে নেমে একটা চা খাব কিনা। এমনসময়, কক্কর কোঁ করে একটা মুরগি ডেকে উঠলো। আমি চমকে উঠে এদিক ওদিক মুরগীটাকে খুঁজছি, রাজু বেজার মুখে বলে উঠলো, "খেঁদি, ওটা আমার মেসেজ টোন"। আমারও ফোনটা ভাইব্রেট করছিলো, নোটিফিকেশন চেক করে দেখলাম,  'ভুলোদার পালিত পোষ্য' হোয়াটস্যাপ গ্রুপে মেসেজ এসেছে একটা। শুচিস্মিতাদির মেসেজ। 

আমি হোয়াটস্যাপটা খুলতে খুলতে রাজু পড়ে ফেলেছে মেসেজটা, তার মুখটা বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে, "খেঁদি, কেস জন্ডিস তো গো!"

আমিও দেখলাম। শুচিস্মিতাদি লিখেছে, "আজ  ভোর থেকে হীরুর কোন খবর নেই।  ভোর ৫ টায় উঠে মোষ খাটালে মোষগুলোকে ব্রেকফাস্ট-এর যাবনা দিতে যাবে বলে বেরিয়েছিল, সঙ্গে বাজারের থলি নিয়ে, একেবারে বাজার করে ফিরবে। সকাল নয়টায় এই  এস এম এস টা  করেছে। তোমরা কেউ কিছু জানো কি?" এর সাথে একটা স্ক্রিনশট, হীরুদার এস এম এস টা।  সেটা এই রকম, " বিশেষ কারণে দার্জিলিং যেতে বাধ্য হচ্ছি। সুযোগ বুঝে কারণ জানাবো। নিজে থেকে আমাকে কন্টাক্ট করিস না, বিপদ আছে।"

আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। রাজু আমার থেকে বেশি উপস্থিত বুদ্ধি রাখে, সে হীরুদাকে কল করেছে ততক্ষনে। কল বেজে বেজে কেটে গেল, কেউ ধরলো না। রাজু বেশ উদ্বিগ্ন মুখে আমার দিকে তাকালো, "ব্যাপার কি বলো তো খেঁদি? হীরুদা তো এরকম ছেলে নয়, বেশ আঁটঘাট বেঁধে কাজ করার ছেলে। আমাদের মতো উঠলো বাই তো দার্জিলিং যাই করবে না।  আবার বলছে যে বিপদ আছে?"

আমিও বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। রাজুর কথাটা ঠিক।  এদিকে ভৌস্তকদাকে কল-এ পাচ্ছি না, ওদিকে হীরুদাও বেপাত্তা। গ্রুপে ততক্ষনে মিকিভাই, বকুল মেসেজ করেছে তারা কিছু জানে না বলে।  রাজুকে বললাম যে " গ্রুপে লেখ,  আমরাও কিছু জানি না, আমরা একটা আসাইনমেন্ট-এ ডুয়ার্স যাচ্ছি, এখন ট্রেনে। "

রাজু তাই লিখলো। শুচিস্মিতাদি সবার উত্তর দেখে টেখে মেসেজ করলো, "আচ্ছা, কিছু জানতে পারলে জানাস। "

এর পরে আর লুডোটা ঠিক জমলো না; দুজনে পালা করে হীরুদাকে কল করতে থাকলাম বারবার। সেই একই ফলাফল, বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে।

ঘন্টা খানেক কেটে গেল এমনি ভাবেই, ট্রেন বারসোই ঢুকবে এবার। রাজুকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছি, ও চা খাবে কিনা স্টেশনে নেমে, আমার ফোনটা  বেজে উঠলো। আননোন নাম্বার থেকে ফোন। রাজুর দিকে একবার তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করলাম ।  

ওপার থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এলো, "অ মোটাবুইন, তা কেমন আসেন? তা কোন কম্পার্টমেন্ট বুইন আপনাদের?" 

দেশলাইদার গলা।  বহুদিন দেশলাইদার সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই, আমাদের চাকরি জুটিয়ে দিয়ে উনি আবার আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেছিলেন, বছর খানেক কোনো পাত্তা ছিল না। সেই দেশলাইদা ফোন করে কম্পার্টমেন্ট জানতে চাইছেন। কিসের কম্পার্টমেন্ট?

সেই প্রশ্নটাই গলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।  

"ট্রেনের, খেঁদি, ট্রেনের।  কোন কম্পার্টমেন্টে আছিস তোরা? বল, আমরা আসছি।" এবারের  গলাটা হীরুদার। 

"-হীরুদা?" অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম আমি , রাজুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, সেও উৎসুক হয়ে শুনছে আমার কথা।  

-"হুম, বেশি না হেজিয়ে কোন কম্পার্টমেন্ট বল।  ফোন টোন করা মোটেই সেফ নয় এখন।"

গলা দিয়ে ভসভসিয়ে বেরিয়ে আসা প্রশ্ন গুলোকে দমিয়ে কোনোক্রমে বললাম, "ইয়ে, মানে, এস- সিক্স, ৩১-৩২।"

ওপার  থেকে কট করে ফোনটা কেটে গেল। রাজুর সপ্রশ্ন দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ওকে বললাম, "প্রথমে ফোন করেছিলেন দেশলাইদা, তারপর হীরুদা কম্পার্টমেন্ট জানতে চাইল। ওরা এদিকে আসছে।"

রাজুর ভ্রুদুটো এমনিই কুঁচকে থাকে সারাক্ষন। শুনে একদম জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়ে গেলো দেখলাম। 

ট্রেনটা ঘটঘট করতে করতে বারসোই ঢুকছে ততক্ষনে। গতি কমতে কমতে একেবারে থেমে যাওয়ার আগে আমার মাথায় কেউ একটা কটাস করে চাঁটি মারলো। ঘুরে দেখি হীরুদা দাঁড়িয়ে আছে।  সঙ্গে চিরাচরিত বিগলিত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেশলাইদা, ওরফে সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড।     

হীরুদার থেকে বিশেষ কোনো কথা বেরোলো না।  বারসোই তে আমরা সকলেই চা খেতে নেমেছি, সেইসময় সে শুধু এইটুকু বললো, "তোদের এখন আলিপুরদুয়ার-টুয়ার যেতে হবে না , আমার সাথে কালিম্পঙ চল। ঘোর বিপদ। "

আমি একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বলতে যাচ্ছিলাম, "ইয়ে কিন্তু আমাদের আসাইনমেন্ট...", কথা কেটে দেশলাইদা বলে উঠলেন, "হ:, ঘর বিপদ, ওরা ভৌস্তক দাদারে ধইরা ফেলাসে, হেইবার ভুলা দাদারে ধইরা ফ্যাল্লাই আর দেখিতে হইব না"..

রাজু চা শেষ করে ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে বললো, "ওরাটা কারা দাদা?"

দেশলাইদা জবাব না দিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হীরুদা বললো, "বলবো, সব বলবো। কালিম্পঙ-এ পৌঁছে সেফ লোকেশনে গিয়ে সব বলবো। ভালোই হলো তোরা জুটে গেলি, আমরা দুজনে সামলাতে পারতাম না হয়তো। প্রতিপক্ষ বেশ ক্ষমতাবান কিন্তু, ম্যাজিক ট্যাজিক জানে যা শুনছি। "

দেশলাইদা  খ্যাঁকখ্যাঁক করে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন, "যথেষ্ট হৈসে, আর নয় হেইখানে, পরে হইবো। আপনারা বুনোদারে ফোন কইরা মানা করে দিয়েন, আর আমাদের সঙ্গে চলেন খেঁদিদিদি, ভয় পাবেন না, ভৌস্তকদা কিসু কইবেন না।  আর সইত্য বলতে কি, ভৌস্তকদারে উদ্ধার করতে হইবো, তবে না চাকরি থাকুম আপনাদের। "

ওরা দুজন আর আমাদের সাথে উঠলো না, বলল নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে দেখা করে নেবে। হীরুদা আবার আমাদের বিশেষ করে বলে দিল শুচিস্মিতাদি বা অন্য কাউকে এখন ওর সাথে দেখা হওয়ার কথা না জানাতে।  আর ঘুণাক্ষরেও কাউকে না বলতে যে আমরা কালিম্পঙ যাচ্ছি। আমি আর রাজু ফিরে এসে বসলাম নিজেদের সিটে। রাজু বলল, "ও খেঁদি, তাহলে কি কেউ কিডন্যাপ করেছে ভৌস্তকদাকে ? আমরা কি তাহলে দেশলাই আর হীরুদার সাথেই যাচ্ছি ?"

-"কিডন্যাপের কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না রে ভাই।  কিন্তু হ্যাঁ, আমারও মনে হচ্ছে ওদের সাথেই যাওয়া উচিত। কিছু একটা সিরিয়াস কেস হয়েছে রে।  আচ্ছা তুই আগে জানতিস হীরুদা আর দেশলাইদা দুজন দুজনকে চেনে?"

রাজু মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে দিলো। ট্রেনটা নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছবে রাত দশটার দিকে। আমরা আর শোওয়ার চেষ্টা করলাম না। রাজু ওর ক্যামেরাটা বার করে খুটখুট করতে শুরু করলো, আর আমি ফোন করলাম বনংশুর নট্যাচার্য্যের স্ত্রী সুছন্দাদিকে । ভদ্রমহিলাকে আসবো না বলায় তিনি বেজায় মনোক্ষুণ্ণ হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "কেন ভাই? আমি যে তোমাদের জন্য বনমুরগী আনিয়ে রাখলাম, সঙ্গে আলুবোখরা? বনমুরগিটা তো ম্যারিনেটও করা হয়ে গেছে রোস্ট-এর জন্যে। বনমুরগীর রোস্ট আর আলুবোখরার চাটনির কি হবে এবার? "

বনমুরগীর ঝোল আর আলুবোখরার চাটনি! পোল্ট্রি খেয়ে খেয়ে কষা পড়ে যাওয়া জিভের জল টেনে মনে মনে হীরুদা আর দেশলাইদাকে দুটো বশিষ্ঠমুনি লেভেলের অভিশাপ দিলাম, তার পর মিনমিনে গলায় বললাম, "ইয়ে দিদি, মানে কাজ পড়ে গেছে একটু, বুঝছেনই তো।  আর ওখান থেকে কালিম্পঙ টা অনেক দূরে,  যাওয়ার কোনো ডাইরেক্ট ব্যবস্থাও তো নেই, থাকলে আগে ওখানে গিয়ে বনমুরগিটা খেয়েই তারপর যেতাম নাহয়। "

আমার কথাটা শেষ হওয়ার সাথে তিনটে জিনিস হলো। প্রথমে  রাজু দেখলাম ক্যামেরা রেখে  আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কেন সেটা বুঝলাম না, কিন্তু ওর ওরকম তাকানোতে আমার কেমন যেন পেটের ভিতরে একটা পাখি উড়তে শুরু  করেছে মনে হলো, কোনো কাজ পন্ড হয়ে গেছে বোঝার ঠিক  আগের মুহূর্তে যেমন হয়। তখনও অবশ্য আমি বুঝিনি, ঠিক কি কেস কেঁচিয়েছি। সেটা বুঝলাম সুছন্দাদির পরের প্রশ্নটা শুনে, 

ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করলেন, "ও তোমরা বুঝি কালিম্পঙ যাচ্ছ?"

নিজে তো দেখিনি, রাজু পরে বর্ণনা দিয়েছিল,  "খেঁদি, দেখলাম তোমার মুখটা এক মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল। যাক, তোমার বুদ্ধি না থাকলেও  লজ্জা ঘেন্নাটা এখনো আছে  দেখে ভালোই লেগেছিল।  " 











Monday, 2 May 2022

হিস্টেরিক্যাল হানিমুন

যাঁরা আমাদের আগের পর্ব পড়েছেন তাঁরা জানেন মিকিভাইকে পুলিশি হেফাজত থেকে বের করে আমরা চলেছি বেইজিংএর পথে, থুড়ি বেইজিং রেস্টুরেন্টের পথে।

পথে যেতে যেতে মুখ খুললো মিকিভাইয়ের। থিম-বিয়ের ব্যবসা ভালোই চলছিল মিকিভাইয়ের। গোল বাঁধলো এপ্রিলে। পুরুলিয়ার আযোধ্যা পাহাড়ে একটা বিয়ের বরাত পেয়েছিল মিকিভাই। থিম ছিল ভয়ঙ্কর ভিসুভিয়াস। তাঁবুর আকারে প্যান্ডেলটা ঠিকঠাকই নামিয়েছিল মিকিভাই। দুর্ভাগ্যবশতঃ বিয়ের দিন শর্টসার্কিট থেকে নাকি আগুন লেগে যায়। তাতেও বিপদ হওয়ার চান্স কমই ছিল। কিন্তু 'ভয়ঙ্কর ভিসুভিয়াস' থিমের বিয়েতে আগুন লেগেছে দেখে লোকে ভেবে নেয় প্র্যাঙ্ক হচ্ছে। তাই লোকজন আগুন নেভানোর জায়গায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে লুকোনো ক্যামেরা খুঁজতে। আর তাতেই ঘটে যায় বিপত্তি। বেশ কয়েকজন জখম হয়। ভয় পেয়ে মিকিভাই পুলিশ আসার আগেই পালিয়ে আসে দীঘায়। পরে অবশ্য জানতে পারে পুলিশ মিকিভাইয়ের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই দায়ের করেনি!

কিন্তু কথায় বলে না, অভাগা যেখানে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। মিকিভাইয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য দীঘা শুকিয়ে যায়নি। দু'দিন পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল দেশব্যাপী লকডাউন। মিকিভাই আটকা পড়ে যায় দীঘার হোটেলে।

তাড়াহুড়োয় ফোনটাও ভিসুভিয়াসেই ফেলে এসেছিল মিকিভাই। চেনা পরিচিত কিছু লোকের নাম্বার জোগাড় করে হোটেল মালিকের ফোন থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু অজানা নাম্বারে ফোনে কথা বললে করোনা ছড়ায় কিনা জানা না থাকায় ফোন তোলেনি কেউই। দীর্ঘ একমাস পরে মিকিভাই যখন কপর্দকশূন্য অবস্থায় বাড়ি ফেরে তখন ভুলোদাই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেয় পাশের ফ্ল্যাটে।

ইতিমধ্যে মিকিভাইয়ের তোলা মিস স্যান্ডার কিছু ছবি ইন্সটাগ্রামে ভাইরাল হয়ে যায়। মিস স্যান্ডা হয়ে ওঠে একজন ইনফ্লুয়েন্সার আর মিকিভাইয়ের অভিষেক হয় ফ্যাশান ও ডিজাইনের দুনিয়াতে। স্বামী-স্ত্রী জুটি অচিরেই স্যামি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে স্থানীয় ফ্যাশান জগতে। আর আজকেই ছিল মিকিভাইয়ের বানানো পোষাকে মিস স্যান্ডার প্রথম লোকসম্মুক্ষে আত্মপ্রকাশ।

সুনাম-পরিচিতি-খ্যাতির বাইরে একটা ব্যাপারে খচখচানি রয়েই গিয়েছিল মিস স্যান্ডার। বিয়ের দেড়বছর পরেও হানিমুনে যাওয়া হয়নি তাদের। বারবার প্ল্যান করার পরও দীঘার স্মৃতি ত্রাস হয়ে তাড়া করত মিকিভাইকে। শেষমেশ মিস স্যান্ডা কোলকাতাতেই হানিমুন সারার কথা জানায়।

প্রস্তাবটি লুফে নেয় মিকিভাই। মিস স্যান্ডার ফ্যাশান ওয়াকের থিম ছিল 'অতীত ও বর্তমান।' সেই অনুযায়ী মিকিভাই তার হানিমুনের থিম বানায় 'হিস্টোরিক্যাল হানিমুন।' ফ্যাশান শোতে মিকিভাই মিস স্যান্ডার জন্যে বানিয়েছিল স্পেশ্যাল 'নেফারতিতি কস্টিউম'। তার সাথে যোগ হয় কলকাতার ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে ঘোরা। নেই-মামার চেয়ে কানা-মামা ভালো। রাজিও হয়ে যায় মিস স্যান্ডা।

কিন্তু আজ সকালে ড্রেস খুঁজতে গিয়ে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায় স্যামির। এক রাতের মধ্যে ইঁদুরে কুঁচিকুঁচি করে কেটে রেখেছে সেটা। মিস স্যান্ডার আজই ফ্যাশান শোতে প্রথম আত্মপ্রকাশ। অনেক কষ্ট করে পাওয়া ডেট ক্যান্সেলও করা সম্ভব নয়। মাথায় হাত পরে দু'জনের। কিন্তু অতলান্ত-আটলান্টিক, হরান্ডাস-হিমালয়, ভয়ঙ্কর-ভিসুসিয়াস যার মস্তিষ্কপ্রসূত, তার কাছে এটা তো তুচ্ছই। মিকিভাই মিস স্যান্ডার পুরো শরীরে টিস্যুপেপার জড়িয়ে মিস স্যান্ডাকে বানিয়ে তোলে দ্য মমি স্যান্ডা, ফ্রম দ্য ডাইন্যাস্টি অব স্যান্ড। শীতকাল বলে আরোই কোন অসুবিধা হয়নি। মিস স্যান্ডা মমি-শরীরে জড়িয়ে নেয় জ্যাকেট ও ট্রাউজার। দু'জনে বেড়িয়ে পরে 'হিস্টোরিক্যাল হানিমুনে'।

এতদূর পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। সমস্যার সূত্রপাত হয় ময়দানে ফুচকা খেয়ে মিস স্যান্ডার পেট খারাপ শুরু হলে। মাঝ-ময়দানে সুলভ শৌচালয় খুব একটা সুলভ তো নয়ই বরং বেশ দুর্লভই। দুর্ভাগ্যবশতঃ তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে শৌচালয়ে পৌঁছে টিস্যুপেপারের জট খোলার আগেই ঘটে যায় অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা। 

শেষমেশ মানসম্মান বাঁচাতে কোমরে জ্যাকেট জড়িয়ে বেড়িয়ে আসে মিস স্যান্ডা। পরিস্থিতি বেহাল হতে পারে ভেবে মিকিভাই আগেই উবার ট্যাক্সি বলে রেখেছিল। কিন্তু উর্ধাঙ্গে টিস্যু-আবৃত জ্যান্ত তন্বী-মমি দেখতে ভীড় করা জনগণকে পেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠতে পারলে তো! 

কিছুক্ষণ পরে অচিরেই পৌঁছে যায় সাংবাদিকদের দল। খোদ কলকাতার বুকে চলমান সুন্দরী মমির মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার দিকেই তাকিয়ে থাকে তাবৎ সাংবাদিককুল। নেটদুনিয়ায় প্রচারের অন্য মাধ্যম পেয়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার ছাড়েনি স্যামি। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অনুকূল বানাতে তাদের যা জুড়ি নেই। খটাখট পোজ দিতে শুরু করে মিস স্যান্ডা। ওদিকে করোনাকালীন সময়ে লোকজমায়েতে প্ররোচনার অভিযোগ দায়ের করে কোন এক সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। পুলিশ বাধ্য হয় পৌঁছাতে। জেরা করার সময় আই-ডি কার্ড দেখতে চাইলে আধার কার্ডের ছবির সাথে মিকি-স্যান্ডা কারুর সাথেই মুখের মিল না থাকায় থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। 

ইতিমধ্যে লালবাজার থেকে দু'টি আলাদা আলাদা ডিটেকটিভের দল পৌঁছায় থানায়। একদল পৌঁছায় পাঁচবছর আগে মিউজিয়াম থেকে চুরি যাওয়া একটি মমির ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুলের কাপড়ের সন্ধানে। অন্য একটি দল পৌঁছায় নতুন প্রকারের কোন এক ভাইরাসের ব্যাপারে তদন্ত করতে।

সৌভাগ্যবশতঃ এদের মধ্যেই একজন ছিল মিস স্যান্ডার ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ার। স্বপ্নের মিস স্যান্ডাকে স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে সেই যবনিকা পতন ঘটায় সব রহস্যের। সে নিজের দায়িত্বে মিস স্যান্ডাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থাও করে। আর আমাদের অভাগা মিকিভাইয়ের নাম্বার অনেক ফোন ঘুরে উপস্থিত হয় আমার দরবারে।

"ভাই, আর যাই করিস, বউকে ফুচকা খাওয়াস না!", বেইজিং থেকে বেরিয়ে আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়ার আগে এটাই ছিল মিকিভাইয়ের শেষ কথা। 

ট্যাক্সি ছুটছে যানজটহীন রাস্তায়। হাল্কা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে ডিসেম্বরের। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার চোখের সামনে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছে মিস স্যান্ডায় ভেজা ঢেউখেলানো চুল আর একটা 'হিস্টোরিক্যাল হানিমুনের' 'হিস্টেরিক্যাল হানিমুন' হয়ে যাওয়ার কাহিনী।।

মিকিভাইয়ের মহাফ্যাসাদ

দিনকাল আর মোটেই ভালো যাচ্ছে না। চাকরিটা পেলুম আর কোথাকার কে বাদুর খেয়ে না কি, দুনিয়াটারই লকডাউন করে দিল! খবর ঠিক না ভুল বের করার চক্করে নিজেরাই এখন খবর হয়ে যাওয়ার জোগার। আগে যেখানে আমি আর খেঁদি রোজ আড্ডা দিতুম সেখানে এখন সপ্তাহে একটা করে ভিডিওকল। কাজ বলতে অমুক পার্টির তমুক লোকের স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা কথার সত্যি-মিথ্যে দেখা আর দিনরাত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মিম পাঠানো। কাল থেকে আবার তরজা লেগেছে। কে নাকি পোস্টারে 'অমুকবাবু জিন্দাবাদ' এর জায়গায় 'অমর রহে' লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে আর তাইই নাকি ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র।

পয়সাকড়ি মন্দ দিচ্ছে না। ঘরে বসে টাকা কামাও। কিন্তু তাতে কি আর আমাদের মতো বাউন্ডুলে লোকেদের মন ভরে? লকডাউন বন্ধ হতে ক'দিন আগে গিয়েছিলুম কলেজে। যে মাঠে বসে আমি, খেঁদি আর হীরুদা ঘাস ছিঁড়তুম সেখানে এখন আমাদের অনুপস্থিতিতে সাভানা জঙ্গল তৈরী হয়ে গেছে। কোনদিন হাতি কি জাগুয়ার বেড়িয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

হীরুদার পদোন্নতি হয়েছে। ছোট কালো মোষ ছেড়ে বড়ো মিশ-কালো মোষ ধোয়ার দায়িত্ব পেয়েছে। এবার ম্যানেজারের পদে গেলেই আর কাজে যেতে হবে না। অনলাইনে জুনিয়রদের মোষ ধোয়ানো শেখাবে। কথা হয়, যেটুকু ফোনে ফোনে। বকুলব্রত মাঝখানে লকডাউনের সুযোগে ক'দিন দোকানের কাজ ছেড়ে বড়ো বড়ো আবাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ডাবল দামে বাজার করে দিচ্ছিল আবাসনের লোকেদের। তাতে দু'পয়সা পেয়ে আর যোগাযোগ রাখেনি তেমন। কল্পতরু মিস স্যান্ডাকে নিয়ে ভুলোদার পাড়ায় চলে গিয়েছিল শুনেছিলাম। আর কোন খবর রাখা হয়নি।

এইসব নিয়েই কথা হচ্ছিল খেঁদির সাথে। এই লকডাউনের বাজারে খেঁদি একটা প্রেম নামিয়েছে। সেকথা আরেকদিন হবে নাহয়। এই ডিসেম্বরে বিয়ে, দিন দশেক পরে। তো সে তার সাথেই একটু বাইক-বিহারে সন্ধ্যার হাওয়া খেতে যাবে। সন্ধ্যার কথায় মিস স্যান্ডাকে মনে পড়লো। বুকের বামদিকটায় মোচড় দিয়ে উঠল খানিক। খেঁদিকে বিদায় জানিয়ে আমি পাড়ি জমালাম একলাই।

এমন সময় ফোনে বেজে উঠল মিকিভাইয়ের নাম্বার। বিয়ের পর মিকিভাইয়ের বাড়িতে কার্তিক ফেলার প্ল্যানটা প্ল্যানই থেকে গিয়েছিল। লকডাউনে পুলিশ টস জিতে এমন ব্যাটিং শুরু করেছিল কেউ আর কার্তিক নিয়ে ফিল্ডিং দেওয়ার সাহসই পায়নি। তবে এতদিন পরে ফোন করছে যখন সুসংবাদই হবে।

কিন্তু ফোন ধরে যা বুঝলাম তাতে সুসংবাদ তো মনেই হলো না। বরং গভীর দুঃসংবাদই বোঝা গেল। আমাকে এখনই ছুটতে হবে পুলিশ স্টেশনে। সাথে খেঁদি থাকলে বরং কাজে দিতো, ম্যানহোলের ঢাকনা চোর ধরার পর ভালোই ওঠাবসা হয়ে গিয়েছিল পুলিশের সাথে। সব হতচ্ছাড়া নচ্ছরগুলো বিপদে পড়লে কি আমারই ফোনে শুধু নেটওয়ার্ক থাকে!

থানায় ঢোকার মুখেই দেখা হয়ে গেল মিস স্যান্ডার সাথে। ওর বাবার সাথে বেড়িয়ে আসছে থানা থেকে। পিছনে গুচ্ছের পুলিশ। যেন আসে পাশের সব থানার পুলিশ ভীড় করেছে এই থানায়। আমার মনটা কেমন মাতাল-চিংড়ি মাতাল-চিংড়ি হয়ে গেল। আমাদের সেই মিস স্যান্ডা, দু'বছর আগের মিস স্যান্ডা এখন আরও তন্বী হয়েছে। কোঁকড়ান ভেজা চুলে তাকে আরও মোহময়ী লাগছে। পুলিশ স্টেশনেও স্নানের এরকম ব্যবস্থা থাকে! আমার বাথরুমে কলটা খারাপ হয়ে গেছে। টয়লেটের জেট-স্প্রে দিয়ে স্নান করছি বিগত সাতদিন। মিস স্যান্ডা কি রোজ এখানে স্নান করতে আসে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল মিকিভাইয়ের কথা। মিস স্যান্ডা বেড়িয়ে আসছে তো মিকিভাই কোথায়! সব ভুলে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলাম থানার ভেতরে। 

থানায় ঢুকে দেখলাম একটা চেয়ার অতিকষ্টে মিকিভাইয়ের পাহাড়প্রমাণ ভার ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। দু'বছর আগের কল্পতরু বাগচী লকডাউনের বাজারে কল্পবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সারাদিনের ধকলের ছাপ চোখে-মুখে। ভেটকি পাতুরিতে কেলিয়ে যাওয়া ভেটকির মতোই গা এলিয়ে দিয়েছে চেয়ারে। 

পুলিশি কাজকর্ম সেরে বেরুতে বেরুতে সন্ধ্যে সাতটা। এতক্ষণ মিকিভাই একটাও কথা বলেনি। কী হয়েছিল জিজ্ঞেস করতে যাবো এমন সময় মিকিভাই নিজেই জিজ্ঞেস করল, "বেইজিং যাবি?" বুঝলাম পুলিশের প্যাঁদানি খেয়ে নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়েছে মিকিভাইয়ের।

-বেইজিং! তোর কী মাথা খারাপ হয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভ চলছে আর থানা থেকে ছাড়া পেতে না পেতেই তোকে বেইজিং যেতে হবে!

-আরে যাবি কিনা বল। আমি যাচ্ছি। 

বলাবাহুল্য, আমার কেন জানিনা মনে হলো মিকিভাই সিরিয়াস। তাই মিনমিন করে বললাম, "কিন্তু আমার তো পাসপোর্ট নেই!"

-বেইজিং রেস্টুরেন্ট। তোপসিয়ায়। 

আমার আশায় নিমপাতা বেঁটে দিল একবারে! হায়রে, ল্যাম্পপোস্টকে আমি লাইটহাউস ভেবে নিয়েছিলাম! যাইহোক, মিকিভাইয়ের ঘাড় ভেঙ্গে খাওয়াটা বেশ ভালই হবে ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। একটা উবার ট্যাক্সি ডেকে রওনা দিলুম বেইজিংএর পথে।

(ক্রমশ)


পুনশ্চঃ খেঁদি কোন নতুন চরিত্র নয়, বরং পুরানো একটি মুখ্য চরিত্রই। বাংলা সাহিত্যে বিড়ম্বনাময়-উৎপটাং ছেলেদের ভীড়ে মেয়ে চরিত্র যথেষ্ট দুর্লভ। অথচ আজকালকার সমানাধিকারের যুগে যেখানে ছেলে-মেয়েরা সাবলীলভাবে মেলামেশা করতে পারে সেখানে একদল চ্যাংড়ার ভীড়ে একটা চিংড়ী থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আর যখন পুরো সিরিজটার অন্য সৃষ্টিকর্তা নিজে একজন মেয়ে, তখন গল্পের মুখ্য চরিত্রে একজন চিংড়ী থাকাটা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই প্রয়াসেই 'বুড়োদা' চরিত্রটির নাম পরিবর্তন করে খেঁদি রাখা হয়েছে। বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিল খেয়া। কিন্তু আমাদের মতো অকালকুষ্মন্ড জুনিয়রের দয়ায় খেয়াদি>খেঁদি হয়ে গেছে।

Tuesday, 14 January 2020

ভুলোদার ল্যাজ এবং ভৌস্তক গাঙ্গুলি

দেশলাইদার এপিসোডটার পরে অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। ভুলো দাদা-বৌদি  এখন সব ভুলে  সংসারে মন দিয়েছে, হীরুদা আর সুচিস্মিতাদি ব্যস্ত বিয়ের প্ল্যানিং-এ।  মিকিভাই আর স্যান্ডার বৈবাহিক জীবনে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় মিকিভাই মনের দুঃখে বনবাস নিয়েছে, বকুলব্রত একটা কেমিকাল ফ্যাক্টরিতে বাসন ধোয়ার কাজ পেয়েকদিন খুব বাকতাল্লা দিয়ে আপাতত কি কারণে আন্ডারগ্রাউন্ড।

আমি আর রাজু কেমন আছি? তা ভালোই, ওই আপনাদের  দয়ায় চলে যাচ্ছে কোনো মতে আজ্ঞে, হেঁ হেঁ ! একখান চাকরি জুটাইসি, দুইজনাতেই! হ্যাঁ বড়দা, এই বাজারে! এক্কেরে হাতে গরম চাকরি!

দেশলাইদা তার কথা রেখেছিলেন, ভৌস্তকদার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। সে এক রোববারের সকাল, ভৌস্তকদা তাঁর সাদা চারতলা বাড়ির তিনতলার দক্ষিণখোলা বারান্দায় একটা আরামকেদারায়  বসে লুচি সহযোগে মাংসের ঘুগনি গলাস্থ করছিলেন।  সামনের চায়ের টেবিলে  তিনটে বাংলা আর দুটো ইংরেজি খবরের কাগজ খোলা।  ভদ্রলোকের সৌখিনভাবে কাটা চুল, দেওয়াল জুড়ে বই আর বই,  কি ভাষায় লেখা যে সেটা ঠিক বুঝলুম না! চোখের চশমা থেকে সোনা ঝিলিক মারছে মনে হলো।

" ও দেশলাইদা, এ কোন পার্টির বলেছিলেন? করে খাও? করে খেলে এত কিছু করা যায় ? " -ফক্কর রাজুটার কিছু একটা বলা চাই-ই চাই! ভাগ্গিস গলা নামিয়ে বলেছে!

দেশলাইদা এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালেন, মনে হলো উনি স্কোফিল্ড না হয়ে বামুন হলে রাজু ভস্ম হয়ে যেত আজ! ভাগ্গিস দেশে এখনও সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়নি!

আমি আস্তে করে বললুম, "দেখে শুনে করতে হবে, বুঝলি কিনা! তালে সব-ই হবে, কি বলেন সাইকেলদা?"

পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে আমরা দেখলাম কাঁসার থালা থেকে একটা একটা করে ফুলকো লুচি গায়েব হতে, সঙ্গে বাজারি-আনন্দ কাগজটার ১০ খানা পাতা উল্টোতে! আমাদের এক কাপ চাও জোটেনি এতক্ষন ! তিনজনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি একটা বেতের সোফায়, ভৌস্তকদার উল্টোদিকে। রাজুর স্বভাব নখ খাওয়া, ওর ডান হাতের অনামিকা থেকে কড়ে আঙুলের নখ সব শেষ। ভৌস্তকদা কাগজটা বন্ধ করলেন, তারপর ওই কাগজেই হাত মুছে ওটাকে পাশের ডাস্টবিনটায় ফেলে দিয়ে বললেন, "কাগজগুলো আজকাল পড়া যায় না! এহে! কদিন ছিলাম না দেশে, তার মধ্যেই নাড়ুদা  আর মিতুদা মিলে দেশটা শেষ করে দিলো হ্যা! ছ্যাঃ ছ্যাঃ!"

 দেশলাইদা দেখি পাশে বসে ঘাড় দোলাচ্ছে ছ্যাঃ ছ্যাঃ'র তালে তালে! তারপর বললো, "তা কবে আইলেন , ভৌস্তকদা ? পুঁতেদাদার খবর কেডা  ? "

-"ভালোই, সাইকেলভায়া, ওদিকে সবই ভালো! এই বয়সেও কি দাপট বলো তো পুঁতেদার ? আহা ! ডনিকে এক্কেরে মুঠোয়  করে রেখেছে! তা তোমার খবর কি? সঙ্গে এই দুইজন কে? "

-"ভুলাদারে মনে আসে, দাদা ? এনারা ভুলাদাদার ভাই! একখান চাকরি খুইজতাসেন, তা বাজারের অবস্থা জা "

হটাৎ থামিয়ে দেন ভৌস্তকদা দেশলাইদাকে,

-"বলো কি হে? ভুলোদার ভাই তোমরা? আগে বলবে তো ! ওরে লক্ষণ, লুচি নিয়ে আয়, লুচি নিয়ে আয়! ভুলোদার ভাইদের এতক্ষন বসিয়ে রেখেছি আমি..."

বিলাপ চলতে থাকে আরও কিছুক্ষনের জন্য ভৌস্তকদার! পরে লুচি, ঘুগনি এবং চা সহযোগে জানা যায় যে ভুলোদাই হাতে ধরে ভৌস্তকদাকে 'করে খাও'- তে ঢুকিয়ে ছিল! তার পর নিজে আর বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেনি, বড় বেশি মায়া ছিল কিনা কলেজের ইউনিয়ন রুমের ওপর! ভুলোদার ল্যাজ ধরেই করে খেতে শুরু করেন ভৌস্তকদা, এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের নেতা বনে যান পার্টির! কিন্তু তখনি হয় সমস্যা! উনি নাকি এত ভালোবাসা পেয়েছিলেন যে ওনাকে  রাজনীতি করাই ছেড়ে দিতে হয়!  শুধু পার্টি না, পার্টির বাইরেও নাকি ভৌস্তকদাকে সক্কলে খুব ভালোবাসে! রাশিয়ার পুঁতেদা, আমেরিকার ডনি থেকে দেশের নাড়ুদা, মিতুদা, টানিদি, এমনকি পিসিমনিও নাকি ভৌস্তক বলতে অজ্ঞান! সবাই এত ভালোবাসে ওনাকে, যে উনি "করে খাও" করাই  ছেড়ে দিয়েছিলেন পিসিমনি রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরে, "মানুষের ভালোবাসাটাই সব, কি বলো ? "

আমরা একটু হেঁ হেঁ করলাম ওনার কথায়! এই লোকগুলো, ডনি, ব্যারি, পুতেদা, নাড়ুদা এরা যে কারা, তাই বুঝছিলাম না।  কিন্তু পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, অতএব ঘাড় নেড়ে মেঝেতে মাথা ঠুকে গেলেও ভৌস্তকদার সব কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম!

"হুম! তা তোমাদের চাকরি চাই, তো? খবরের ওয়েবসাইট চালাতে পারবে?  এই যে বাজারি-আনন্দ, খবর রোজকার, কাল আর আজ, এমন কি এই টেলিগ্রামও এখন হয় নাড়ুদা কিনে রেখেছে, নয় তো পিসিমনি! আমি যেহেতু এদের সবাইকে সমান ভালোবাসি, আমি নিরপেক্ষ সংবাদ  পৌঁছে দিতে চাই বাংলার ঘরে ঘরে! একটা অনলাইন নিউজ দিয়ে শুরুটা করতে চাই! তোমরা দুজন আছো, ইয়াং ব্লাড, একটু দাঁড় করিয়ে দাও ওয়েবসাইটটা ! টাকা যা লাগে পাবে, পারমিশন সব হয়ে যাবে,  কিন্তু হার্ড ওয়ার্ক সব তোমাদের!খবর জোগাড়, তার সত্যতা বিচার, ওয়েব কনটেন্ট রেডি করা! পারবে? "

আমরা থতমত খেয়ে গেছি! চাকরিটা পেয়ে গেলাম কি?
-"কিহে, পারবে? "

কমদিন তো আর বেকার ছিলাম না, ঘরে বসে বসে বাপ-মার টাকায় আর কিছু না হোক কম্পিউটার-এর কোর্স আমি রাজু দুজনেই অনেক করেছি!  আর লেখার হাত কারোরই নেহাত খারাপ নয়, সে তো আপনারা জানেনই 'ভুলোদা সিরিজে'র র দৌলতে!সুতরাং, টুক করে ঘাড় নেড়ে দিলুম!

-"এই তো! আরে ভুলোদার ভাই যখন, তখন তো তৈরী ছেলে! মাসে আপাতত হাজার পঁচিশ করে দেব, তারপর যদি সাইটের কাটতি ভালো  হয়, তখন কমিশন! রাজি?"

জীবনে চাকরি পাবো এই আশাটাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, দুজনেই! একটা করে ডিগ্রী আছে, গুচ্ছের ডিপ্লোমাও! কিন্তু চাকরিটা যে শেষে ভুলোদার দৌলতে হবে এটা  ভাবিনি! কেমন একটা ঘোরের মধ্যে বেরিয়ে আসছিলাম ভৌস্তকদার প্রাসাদপদম বাড়ি থেকে, মনের মধ্যে থেকে ভসভসিয়ে গান বেরিয়ে এলো , "চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা-"

-"ধ্যাৎ! তোমার বেলা নেই, থামো তো!" রাজু হটাৎ করে বলে উঠলো।

মনটাই বিগড়ে গেলো! অপদার্থ একটা, লোকের খুশি সহ্য হয় না! চাঁটিটা তুলেইছিলাম, কিন্তু ওর পরের কথাটা শুনে আটকে গেলো হাতটা ! রাজু  দেশলাইদাকে জিজ্ঞাসা করছে, "সবই তো হলো, কিন্তু এই পুঁতেদা, ডনি, নাড়ু, মিতু, টানি এরা কারা ? "

"পুঁতেদা হইলেন রাশিয়ার  কীতিমির পুতিন,  ডনি আমেরিকার ডোনাল্ড বাম্প,  নাড়ুদা আমাগো প্রাইম মিনিস্টার, 'লুইট্যা খাও' এর  নরেন্দ্র গোবুদ্ধি, টানিদি মানে বইস্যা  খাও-এর টানিয়া বান্ধি,   আর মিতুদা হইলো ওই লুইট্যা খাও-এরই  'মোটা ভাই',  কেমিতরো  বাহ্।  ভৌস্তকদারে কি যে সে লোক পাইসো ভায়া! এ হইলো ভৌস্তক গাঙ্গুলি! হেঁ হেঁ !"



Tuesday, 24 September 2019

কার্তিক বিভ্রাট

-সে টাকা নাহয় আমি দিলাম। তোদের চাকরিটা তো আর করে দিতে পারলাম না। আর হীরুও কিছু দিও পারলে। মিকিভাইয়ের বিয়ের পর প্রথম কাত্তিকপূজো বলা কথা। কার্তিক তো ফেলতেই হয়। কী বল সৌণক?
-একদম। তাহলে অর্ডার দিয়ে দিই আমাজন থেকে। আগেরবার করেছিলাম যেরকম... বলতে বলতেই থেমে গেল বুড়োদা। মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়ল নীরবতা। আমরাও দেখলাম ভুলোদার মুখটা বিরিয়ানির হাঁড়ি চাপা দেওয়ার কাপড়টার মতো লাল হয়ে গেল। জুলিয়াস সীজারের মতো গলায় ভুলোদা আর্তনাদ করে উঠলো, "সৌণক, তুমি!" তারপর গটগট করে বাড়ির দিকে চলে গেল আমাদেরকে পিছনে ফেলে।
বুঝলেন না তো! বুঝতে গেলে আপনাদের ফিরে যেতে হবে ঠিক একবছর আগের কার্তিকপুজোর দিনে। তখন সবে আমাদের ভুলোদার বিয়ে ঠিক হয়েছে। মাস তিনেক পরে ডিসেম্বরে বিয়ে। এমনসময় হীরুদার ফোন, ভুলোদা নাকি পাগল হয়ে গেছে। হীরুদা যাচ্ছিল মোষখাটালের মোষেদের গা ধোয়াতে।তখন নাকি ভুলোদাকে জিপিওর সামনে এক কাঁধে একটা কার্তিকঠাকুর অন্য কানে ফোন নিয়ে উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখা গেছে।
আমাদের তখন কাজ বলতে কলেজ ইউনিয়নে আড্ডা দেওয়া আর বিকেলের দিকে ভুলোদার বাড়ি গিয়ে লেগপিস-ডানহিল সমেত সরকারের তুলোধোনা করা। কার্তিকপুজো থাকায় কলেজেও ছুটি। আমরা পত্রপাঠ গিয়ে হাজির হলাম ভুলোদার বাড়ি। মোষেদের স্নানাদি
ও অন্যান্য প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরে হীরুদার আসতে দেরী হয়েছিল একটু। যাইহোক, গিয়ে দেখি ভুলোদার প্রাসাদোত্তম বাড়ির সামনে আমাদের সেমিকম্যুনিষ্ট ভুলোদা চুপচাপ বসে আছে আর ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদছে। পাশে পড়ে আছে সেই কার্তিকঠাকুর যার ময়ূরটি লেজ হারিয়ে ময়ূরীতে পরিণত হয়েছে। আর ভুলোদার পোষা নেড়িকুকুরটা অনেকক্ষণ ময়ূরের সাথে ভাব জমানোর বৃথা চেষ্টা ছেড়ে কার্তিকের তীরটা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করছে।
আমরা কাছে যেতেই ভুলোদা আমাদের হাতে ডানহিলের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "কেউ আমার ভালো চায় না।"
কথায় কথায় জানতে পারলাম আজ সকালে ভুলোদার বাড়িতে আমাজন থেকে একটা অর্ডার এসেছিল ক্যাশ অন ডেলিভারীতে। সেটা খুলে নাকি দেখা যায় তাতে একটা কার্তিকঠাকুর আর একটা চিরকূট। তাতে লেখা, "বাবা, আমি আগেই এসে গেলাম। তুমি জলদি মা'কে নিয়ে এসো।" কিন্তু ততক্ষণে ডেলিভারীবয় বাইক চড়ে হাওয়া। তারপর আমাজনে বেশ কয়েকবার ফোন করেও ওরা ওটা ফেরত নিতে চায়নি। বিক্রি হওয়া ঠাকুর নাকি ওরা ফেরত নেয় না। ক'দিন আগের গনেশপুজোর পর মুম্বাইতে নাকি পুজো হওয়া গনেশ ফেরতের লাইন লেগে গিয়েছিল। তাতে নাকি আমাজনের বেজায় ক্ষতি হয়েছে।
যাইহোক, এরপর জিপিওতেও গিয়েছিল আমাদের ভুলোদা যেখানে হীরুদা দেখেছে। কিন্তু তারা নাকি পরামর্শ দিয়ে পুজো করে ফেলার। অগ্রিম নিমন্ত্রণও চেয়ে রেখেছে তারা।
আমরাও সেই পরামর্শই দিলাম। পুজো করে নাও ভুলোদা। তা শুনে ভুলোদা বলে উঠলো, "তুমি বুঝতে পারছো না রাজর্ষি। আমি এখন অবিবাহিত। এই অবস্থায় কার্তিক পুজো করলে ছি ছি পড়ে যাবে। আমার আর বিয়ে হবে?" আমরা বললাম, "কিন্তু ঠাকুর যদি পাপ দেয়! কার্তিকঠাকুরের পাপ তো আর যে সে পাপ নয়!" কিন্তু ভুলোদা তার সিদ্ধান্তে অটল।
ইতিমধ্যে হীরুদাও এসে গেছে। ফেলুদা, ব্যোমকেশ আর কিরীটী এক হয়ে যা বোঝা গেল তা হলো এই যে কেউ ভুলোদার প্রাইম অ্যাকাউন্ট ইউজ করে অর্ডার দিয়েছে কার্তিকটা। কিন্তু সেই অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পাড়াশুদ্ধু লোকের জানা থাকায় আর জানা যায়নি কে বা কারা রয়েছে এই ঘটনার পিছনে।
ঘটনাটা রহস্যই হয়ে ছিল এতোদিন। জানতাম শুধু আমি আর বুড়োদা। আজ বুড়োদা মুখ ফস্কে না বলে ফেললে হয়তো কেউই জানতে পারত না কোনদিন।
যাইহোক, ভুলোদা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আজ অনেকদিন পর। ভুলোদার প্রিয় অরেঞ্জ চিলিজের থেকে খাবার অর্ডারও দেওয়া হয়েছিল সেইমতো। খাবার এসেও গেছে কিন্তু ভুলোদাই তো হাওয়া। এখন তো আর ভুলোদাকে ফোন করে পেমেন্ট করে দিতে বলা যায় না! নিজের পকেট থেকেই খসবে আজ।
সেদিন অবশ্য ভুলোদা নিরাশ করলেও পাড়ার লোকেরা কিন্তু নিরাশ করেনি। তারাই শেষমেশ চাঁদা তুলে বামুন ডেকে পুজোর ব্যবস্থা করে। ভুলোদার কাছের লোক বলে রাতের খিচুড়িভোগে রীতিমতো নিমন্ত্রণও জানিয়েছিল আমাদের। গিয়ে দেখি, প্যান্ডেলের ভিতরে সেই কার্তিক ঠাকুর যার হাতে তীর না থাকায় কেউ একটা ডান্ডা ধরিয়ে দিয়েছে। আর প্যান্ডেলের উপর লেখা, "বাবা আমায় ঘরে ঢুকতে দেয়নি তাই পাড়ার কাকুরা থাকতে দিয়েছে।"

Thursday, 19 September 2019

ভুলোদার দেশলাই বিভ্রাট

বিকেল চারটে কি সাড়ে চারটে হবে, রোজকার মতো আমি আর রাজু গড়ের মাঠে বসে ঘাস চিবুচ্ছি। ভুলোদা ফাইনালি আজ কথা দিয়েছে আমাদের জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ডের বাড়ি নিয়ে যাবে, একটু সন্ধ্যে হলে। বেকার জীবনের অবসান ঘটছে ভেবে আনন্দটা খুব চেষ্টা করেও ঠিক ফিল করে উঠতে পারছিনে। বার বার মনে হচ্ছে, কাল থেকে এই ঘাস গুলো শুধু ঘোড়াতেই খাবে...
"গোরুতে, বুড়োদা, গোরুতে"  রাজু  ভুল শুধরে দেয়, "ঘাস, পাতা, মাধ্যমিকের খাতা সব গোরুতেই খাবে এর পর!"
কটাং করে একটা চাঁটি মারলাম ওকে। ইমোশনের মধ্যে  গোরুর ডাক না ডাকলেই হচ্ছিলো না যেন ওর! পকেট থেকে পিসিমনি বিড়ির প্যাকেটটা সবে বের করেছি, রাজু বলে, "মালটা  রেডি রাখো, দেশলাইদা আসছে!"
দেশলাইদার সাথে অনেকদিনের আলাপ। উনি আমাদের ঘাস চিবুনোর সিনিয়র। মানে আমাদেরও আগে থেকে গড়ের মাঠে আসেন, একলাই; একটু দূরে বসে আপন মনে লম্বা ঘাস, বেঁটে ঘাস, মোটা ঘাস এসব বিভিন্ন রকম ঘাস চিবিয়ে থাকেন, আর উদাস দৃষ্টিতে আকাশ দেখেন। উঠে যাওয়ার ঠিক চার মিনিট পনেরো সেকেন্ড আগে এসে আমাদের পাশে বসেন। একটা হাত বাড়িয়ে দেন, আমি বা রাজু দেশলাইয়ের বাক্স খুলে একখানা বার করে ভদ্রলোকের হাতে দিই, উনি নির্লিপ্ত ভাবে সেটা নিয়ে কান খোঁচাতে শুরু করেন। ঠিক পৌনে তিন  মিনিট পরে "আঃ" বলে একটা স্বস্তির নিঃস্বাস ছেড়ে বলেন, "কাইল ওইদিগেরে ঘাসডা এট্টু ট্যাস্ট কইরা দেখেন মোটাভাই, ভালো রস হইসে!" তার পর উঠে  চলে যান। উনি  আমাকে মোটাভাই আর রাজুকে শুঁটোভাই বলেন, আর আমরা ওনাকে বলি দেশলাইদা।
দেশলাইদাকে দেখে মনটা ফের খারাপ হয়ে গেলো। আজ ওনার বাড়ানো হাতে গোটা বাক্সখানা তুলে দিয়ে বললুম, "রাখুন দেশলাইদা, আর হয়তো দেখা হবে না কোনোদিন"
দেশলাইদা চোখে একটা চশমা পড়েন, পরনে লুঙ্গি আর হাফহাতা ফতুয়া।  আমার কথাটা শুনে আমার দিকে তাকালেন।  তারপর তাকিয়েই রইলেন। খানিক্ষন পর বুঝলাম, জানতে চাইছেন কেন দেখা হবে না।  রাজুও বুঝেছিল ব্যাপারটা, সেই বললো, "একটা চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে বুঝলেন দেশলাইদা, আর হয়তো আসতে পারবো না এদিকপানে!"
আমি বললুম, "ছুটিছাটার দিনে এসে দেখা করে যাবো নাহয় আপনার সাথে। ভালো থাকবেন। " 
দেশলাইদার চশমা নেমে এসেছে প্রায় নাকের ডগায়, "আরে কও কি শুঁটোভাই, তুমাদের চাকরি হোতাসে ? ও শুঁটোভাই, আমারেও একখান জুটায়ে দাও না, ও মোটাভাই"...
পাক্কা পনেরো মিনিট।  পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে এই এককথা বিভিন্ন সুরে ও কথায় বার বার বলে গেলেন দেশলাইদা। শেষকালে খানিকটা বিরক্ত হয়েই উঠে পড়লাম মাঠ থেকে। এমনিতেও সাইকেল স্কোফিল্ডের বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিলো।
অতঃপর বাস ধরে ঝুলে ঝুলে ভুলোদার বলে দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে গমন। ভুলোদা আমাদের যেরকম বিবরণ দিয়েছে ভদ্রলোকের, তাতে কনফিডেন্স পাওয়ার বদলে আমি খানিকটা বোমকে গেছি। 'করে খাও' পার্টির মস্ত লিডার ছিলেন সাইকেল, কিন্তু 'করে খাও' গিয়ে রাজ্যে এখন  'পাল্টি খাও' পার্টির শাসন। 'পাল্টি খাও'-এর পিসিমনি শপথ নিয়েছিলেন দেশ থেকে বহিরাগতদের তাড়াবেন।  সেই শুনে আমাদের সাইকেলদাদা 'বসে  খাও' পার্টির সাথে জোট বাঁধার মিটিং  করতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা। সেখানেই ভদ্রলোককে  ধরে 'লুটে খাও' পার্টির কিছু লোক।  তারপর ? "সাইকেল স্কোফিল্ড নাম হ্যায় তো জেল মে তো জানা হ্যায়"  স্লোগান দিতে দিতে ওনাকে সিধে নিয়ে যায় কোর্টে। সেখানে ৫ টাকার  স্ট্যাম্প পেপার কিনে ওনার নামের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় 'জয়শ্রীরাম"। তারপর থেকেই সাইকেলদা আন্ডারগ্রাউন্ড। তবে ওনার এখনো কিছু বন্ধু আছে, যারা 'করে খাও' থেকে পাল্টি খেয়ে 'পাল্টি খাও' এর মেম্বার এখন।  তারা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার চপোন্নতিতে মন দিয়েছে, মানে চপের ফুডচেন খুলেছে। সেইসব দোকানেই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবেন হয়তো উনি, সেরকমই আমাদের বলেছে ভুলোদা।
তা এত বড়ো বিপ্লবীর সাথে একলা একলা দেখা করাটা ঠিক মানায় না, তাই ভুলোদাকে ধরে কয়ে আসতে রাজি করিয়েছি আমাদের সাথে। সে বলেছে সে আলাদা করে ওলায়  আসবে, তার আবার বাসের ভিড় পোষায় না! অগত্যা, এই ভর সন্ধ্যেবেলা একখানা নোংরা এঁদো গলির মধ্যে ঢুকে তিন নম্বর বাড়ির গোয়ালের পাশ দিয়ে গিয়ে আশশ্যাওড়া গাছের পাশে একটা ক্লাবঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রাজু। ভুলোদা কিংবা স্কোফিল্ড, কারুরই টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না!
-"আই রাজু, ঠিক এলুম তো রে?"
-"হ্যাঁ গো বুড়োদা, এক্কেরে ঠিক! এই তো আকাশবাণী স্পোর্টিং ক্লাব, এখানেই আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে সাইকেলদাদা!"
-"কিন্তু দরজায় তো তালা! কই তিনি? ভুলোদাই বা কই? এটা আন্ডারগ্রাউন্ড না রে, ব্লান্ডারগ্রাউন্ড,  আমাদের। ভর সন্ধ্যেবেলা, আশশ্যাওড়া গাছ. জয়শ্রীরাম!"
রাজুর  একটু সাহস বেশি। সে একবার গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে, "দাঁড়াও ফোন করি ভুলোদাকে।"
কিন্তু ফোন লাগে না. ব্যস্ত। একবার, দুবার, তিনবার, ব্যস্ত। "দুত্তেরি ছাই" বলে ফোনটা পকেটস্থ করে ও। আমি নিজের ফোন থেকে ফোন করি ভুলোদাকে, এবং, ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং এর সাথে সাথেই  কান ফাটানো চিৎকার করে ওঠে কেউ একজন "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...." ঠিক আমার মাথার উপর আশশ্যাওড়া গাছের মগডালে।  আমি আঁতকে উঠি, হাত থেকে ফোন পড়ে কেটে যায় ফোন খানা, এবং চিৎকারও বন্ধ! পরক্ষনেই দেখি রাজু ভূপতিত। মাথা চেপে ধরে উঃ আঃ করছে। ওকে তুলে দৌড়াবো নাকি আগেই দৌড়াবো ভাবতে গিয়ে চোখ পড়ে রাজুর পাশে পড়ে থাকা প্রমান সাইজের ট্যাবখানায়। এটাই মাথায় পড়েছে তবে ওর! কিন্তু আশশ্যাওড়ার পেত্নীর কাছে লেনোভোর ট্যাব কি করছে! ভাবতে ভাবতে দেখি আশশ্যাওড়ার মগডাল থেকে দুইখান গোদা সাদা পা ঝুলছে, আসতে আসতে  নিচু হচ্ছে সে দুটো।  তারপর প্রকটিত হলো একখানা বারমুডা, তারপর ব্র্যান্ডেড হাফশার্ট আর সবশেষে ভুলোদার অমায়িক বদন খানি! হাতে ভর দিয়ে সে  ঝুলছে মগডাল থেকে, আর চিঁচিঁ করে কি একটা বলছে।
রাজু উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষনে, "তুমি গাছে উঠে কি করছিলে ভুলোদা? আর ওই  চিৎকারটা কার ছিল ?"
"আগে নামাও  আমাকে তোমরা... ও সৌনক, একটু ধরো!"
রাজুর ব্রহ্মতালুতে চোট লেগে মেজাজ গরম, "আগে বলো"!
ঝুলায়মান ভুলোদার চিঁচিঁর মর্মার্থ ছিল এই যে, সে অনেক আগে এসে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমরা বা সাইকেল কেউই না থাকায় সে ভাবে বৌদিকে একটা ফোন করবে। টাওয়ার না পেয়ে রোখের মাথায় গাছে চড়ে যায়। এতক্ষন কথা বলছিলো, কিন্তু ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে  আমার ফোনটা  ঢোকে। ভুলোদার রিংটোন হলো এই কিছুদিন আগেই কোলাঘাটের চা দোকানি টার্নড প্লেব্যাক সিঙ্গার কালুদির গাওয়া নতুন গান 'মেরি তেরি'র প্রিলুড। সেটাই বাজাতে ভুলোদাও আমাদের মতো চমকে গিয়ে ট্যাব ফেলে দেয়  রাজুর মাথায়। তার পরেই নামার চেষ্টা করতে এই বিপত্তি। নামতে পারছে না।      
আমার একটু মায়া হলো। রাজুকে বললাম, "চ, তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা, তার পর হেই সামালো হাইয়া বলে যত জোরে পারিস টান মারবি।  ভুলোদা, তুমি হাত ছেড়ে দিও" বলে আমি জামার হাতা গোটানো শুরু করলাম! রাজুর এখনো রাগ যায় নি, সে,  "হুঁহ যত্তসব! গাছে উঠে বসে আছে! তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা! একি  মুরগি নাকি যে তুমি একটা ঠ্যাং আর আমি একটা! আস্ত জলহস্তী!"- এইসব গজ গজ করতে করতেই জামার হাতা গোটাচ্ছিলো, হঠাৎ পিছন থেকে খুব পরিচিতি গলায় কেউ বলে উঠলো, "আরে মোটাভাই-শুঁটোভাই! আপনারা  হেইখানডায় কি করতাসেন ?"
আমরা ভুলোদার কথা বেমালুম ভুলে পিছন ফিরলাম, "আরে দেশলাইদা ! আপনি!"
কিন্তু ভুলোদা ভুলতে দিলে তো! "ওরে ওই স্কোফিল্ড রে! ওরে আমাকে নামা রে কেউ! ওরে ডালটায় কাঠপিঁপড়ের বাসা আছে রে! আঙুলে কামড়াচ্ছে!"
আর তখন ভুলোদার আঙ্গুল! সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড হলো আমাদের দেশলাইদা ! 'করে খাও' পার্টির নেতা! পনের মিনিট ধরে আমাদের থেকে চাকরি চেয়ে গেছে আজ বিকেলে, আর ভুলোদা এত ঘটা করে তার কাছে এনেছে আমাদের চাকরির জন্যে! আমি রাজুর মুখের দিকে, রাজু আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম! দেশলাইদা ভুলোদার চিৎকারে লক্ষ্য করেছেন ভুলোদাকে, "ভুলাদাদা! আপনে ! গাসের উপর কি করতাসেন?"
ভুলোদার উত্তর দেওয়ার পরিস্থিতি নেই , আমিই বললুম, "আপনার কাছে এনেছিল দেশলাইদা, চাকরির জন্যে! কোনোদিন বলেন নি তো আপনি 'করে খাও' -এর এতবড়ো লিডার!"
দেশলাইদা ওরফে সাইকেলদা অমায়িক হেসে বললেন, "সে দিন হ্যাক্কালে সিলো, বুইলেন! এক্ষন আর কইরা খাওনের দিন নাই! এখন সব লুইট্যা খাও!
"কিন্তু আপনার বন্ধুরা? পাল্টি খাও পার্টির? চপ চেনের মালিকরা?" রাজুর ব্যাকুল জিজ্ঞাসা!
-"তারা হক্কলে ফের পাল্টি খাইয়াসে! লুইট্যা খাইতাসে এহন। আমারেও সিনতে পারে  না আর!" দুঃখী মুখ করে বললেন সাইকেলদা! 
হঠাৎ ধপাস করে আওয়াজ এবং গগনবিদারী আর্তনাদ! ভুলোদা পিঁপড়েভয় এবং মৃত্যুভয়ের  মধ্যে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। না, মরেনি, তবে তিন চারটে হাড় না গেলে খুশি হবো না।  এত্তদিন ধরে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে শেষে দেশলাইদা প্রসব করলো লোকটা! কিন্তু যন্ত্রনা এখানে শেষ হলে তো! আমাদের সব্বাইকে চমকে দিয়ে ফের একবার কালুদি আর্তনাদ ছাড়লেন,  "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...."! ভুলোদার ট্যাব! বৌদির নামখানা জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে!
যন্ত্রনা ভুলে একলাফে খাড়া ভুলোদা, এবং ফোন কানে দিয়ে "হালুউউ, বলুউউউ " বলে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালো আমাদের দিকে, "এই একটু ধরো তো" বলে আমাদের ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে জানি না, তবে বলে গেলো, "তোমরা তো দেখছি চেনো সবাই সবাইকে, কথা টথা বলে নাও তবে"।  বলে সিধা গোয়ালের পাশ  দিয়ে ধাঁ !
সাইকেলদা সেইদিন চা খাইছিলেন আমাদের। তারপর চশমাটা একটু নামিয়ে বলেছিলেন, "হ্যাকডা কাম আসে।  ভৌস্তকদা ফিরাসে রাশিয়া হইতে। ও লোক খুঁইজতাসিলো, হিন্দি জানা লোক।  বঙ্কিমসন্দ্রের হিন্দি অনুবাদ করনের তরে । 'লুইট্যা  খাও' পার্টির লোকসনেরা কিনতাসে না নইলে! ওরা বড্ডো বাইড়া গিয়াসে! হিন্দি বই না সাপাইলা ব্যবসা চলতাসে না ভৌস্তকদাদার। আমি তো হিন্দি সিখুম না, মইরা গেলেও না। আপনারা করেন তো কন, কথা কই!"
রাজু বললো,  "ভৌস্তকদা মানে ভৌস্তক গাঙ্গুলি ? 'করে খাও' পার্টির আমলের তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী? করে খাও কোমায় যাওয়ার পর এখন  উনি বই চাপানোর ব্যবসা শুরু করেছেন?"
রাজি হয়ে গেলাম সাইকেলদার কথায়। শারুক খানের স্কুলে পড়ে বড়ো হয়েছি, হিন্দি জানিনা মানে ? একশো বার জানতা হ্যায়, হাজার বার জানতা হ্যায়! ঠিক করলাম যাবো একদিন সাইকেলদার সাথে ভৌস্তকদার বাড়ি।    

Wednesday, 9 May 2018

রাখে হরি মারে কে

চারদিকে লালচে ধোঁয়া, ভূতের মতো লোকজন হিম্বি-ডুম্বি বলতে বলতে আমায় ঘিরে নাচছে। তাদের মুখগুলো দেখে কোষের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। নাকের জায়গায় ইয়া বড়ো থ্যাবড়া নিউক্লিয়াস। চোখগুলো আর চোখ নেই, মাইটোকন্ড্রিয়া হয়ে জ্বলছে। আর এন্ডোপ্লাসমিক রেটিকিউলিয়ামটা কেমন যেন কুটিল হাসি হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায়। ভয়ে চোখ বন্ধ করতে যাব এমন সময় শুনতে পেলাম কে যেন চেঁচিয়ে বলছে, 'স্যার, তেল গরম হয়ে গেছে।'
তেল গরম! শুনেছি নরকে নাকি পাপী-তাপীদের শাস্তিস্বরূপ গরম তেলে কড়কড়ে করে ভাজা হয়। সাথেসাথেই মনে পড়ল আজ বুড়োদার সাথে থানায় যাওয়ার কথা ছিল। তাহলে কি থানায় আমাদের এমন পিটিয়েছে যে সোজা নরকে এসে পৌঁছেছি!
যাক এসে যখন পড়েছি তখন আর কী করা যাবে। একটা কথা ভেবে তাও খুশি হলাম যে কিডনিটা বেঁচে গেছে। এমন দুর্মুল্যের বাজারে যেখানে মরা কুকুরদেরও ছাড় দিচ্ছে না সেখানে কিডনি সমেত মরাটা কি চাট্টিখানি কথা!
এমনসময় ঠুং ঠাং শব্দ শুনে চোখ খুললাম। দেখি হাতে কাঁটাচামচ নিয়ে কয়েকজন আমায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বুঝতে পারলাম ওরাই আমার খাদক আর নরকে ভাগারকান্ড রমরমিয়েই চলছে। খদ্দেরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, আরে, এদের তো চিনি। আর ডি পি, এস আর আর অর্জুন স্যার! যাদের কথা মনে পড়লেই আমার ভোরবেলায় ইয়ে পেয়ে যেত। রাজর্ষিভাজা হবে শুনে এরা স্কুল কামাই করে এতোদূর এসেছে! ডেডিকেশন মাইরি!
এরপর ওঁরা তিনজন আমায় টিপেটুপে পরীক্ষা করতে লাগলেন। নজর আমার পেটের দুই পাশে। সাহস করে শেষমেশ কিডনির কথাটা জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। শুনে ওঁনারা এমন হাসতে লাগলেন যে আমার পিলে চমকে উঠল। সর্বনাশ! ওঁরা কি আমার কিডনির লোভেই এসেছেন। আজকাল কি ভূতেদেরও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি হয় নাকি!
এমন সময় শুনি বুড়োদার গলা, 'ওঠ রাজু ওঠ।' এতক্ষণ তো বুড়োদার কথা মনেই ছিল না। গর্ব হল বুড়োদার জন্য। নিশ্চয় পালিয়েছে, আর এখন এসেছে আমায় বাঁচাতে। কিন্তু উঠতে গিয়ে টের পেলাম উঠতে আর পারছি না। কে যেন সর্বশক্তি দিয়ে টেনে রেখেছে। তাও শেষমেশ উঠে পড়লাম। উঠে দেখি বুড়োদা মুখের উপর চেঁচাচ্ছে, 'ওরে এমন ঘুমালে দেখবি কোনওদিন লোকজন শ্মশানে গিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। চল, থানায় যেতে হবে তো।'
বুঝলাম স্বপ্ন ছিল। জামাকাপড় পরে বেরুলাম। একে ভোরের স্বপ্ন, তায় বেরোতে না বেরোতে একশালিখ দেখেছি। কিডনিটাকে আমার একটা গান ডেডিকেট করতে ইচ্ছা হল, 'এ চলাই শেষ চলা হয়তো...'

যারা আমাদের আগের পর্ব 'মারে হরি রাখ কে' পড়েছেন, তারা অলরেডি জেনে গেছেন যে বুড়োদার কারণে আমার একখানি কিডনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যদিও আজ যে দেখলাম, তাতে এখন কন্ডিশান অনেকটাই ভালো। এমনকি কিডনিটা আমার বদলে বুড়োদার থেকে নেওয়াই যায়।
যাইহোক থানায় পৌঁছালাম। আমাদের দেখে বড়সাহেব প্রথমে এমনভাবে তাকালেন যে আমরা ওঁনার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছি। কিন্তু নাম বলতেই উনি বসতে বলে আমাদের জন্য জলখাবারের অর্ডার দিলেন। একটু পরেই বলি চড়বে কীনা, তাই এমন জামাই আদর।
কিন্তু তারপর যেটা হলো, সেটার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। উনি আমাদের সামনে একটা কুড়ি হাজার টাকার নোটের বান্ডিল এনে বললেন, 'এই নাও। সরকার থেকে তোমাদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সাহসিকতার জন্য।' শুনে আমরা যেন মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো থেকে পড়লাম। বলে কী!
তারপর যেটা জানতে পারলাম, ইদানীং এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি খুব বেড়ে গিয়েছিল। অম্বল আর কম্বল এই দুই ভাই রাতের বেলা নাকে গামছা বেঁধে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করতে বেরোত। যথারীতি এ ব্যাপারে পৌরসভার কোন হেলদোল ছিল না। অন্যদিকে ম্যানহোলের ঢাকনা খোয়া গেলে দুর্গন্ধে পাড়ায় টিকতে পারা যেত না। তাই বাসিন্দারা নিজেরাই চাঁদা তুলে কিনে নিত। একেকটি ঢাকনা পাঁচ'শ থেকে আট'শ টাকায় বিক্রি হতো। লোকজনের খরচও বেশী হতো না আর একেকটি ঢাকনা মাসে একবার চুরি করেই চলে যেত চোরেদের।
তা ওই কুয়োটা ছিল চোরাই ঢাকনা লুকিয়ে রাখার জায়গা। সেদিন রাতেও নাকি তারা চুরি করতে বেরিয়েছিল। কিন্তু বুড়োদার গান শুনে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কুয়োতেই লুকিয়ে পড়ে। আর পরে বুড়োদা গিয়ে পড়ে ওদের ঘাড়ে।
চোরেরা নাকি এখনও আইসিইউতে, কথা বলার অবস্থায় আসেনি। ঢাকনা সাপ্লাইয়ার নাকি দেখা করতে এসে চোরেদের অবস্থা দেখে ভয়ে নিজমুখে সব দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। ক'দিন আগেই নাকি পাড়ার মোড়ের মোড়েকালি স্বপ্নে ওকে ভয় দেখিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এতেই শেষ নয়। বুড়োদার নাম সাহসিকতার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। তাছাড়া আমাদের নিয়ে নাকি একটা বিজয় মিছিলেরও ব্যবস্থা হয়েছে। শুনে তো আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না!
যাইহোক, টাকা ক'টায় বেশ কয়েকদিন ভালোই চলবে। হোটেলের মাটন-চিকেনে এখন আর ভরসা নেই। ভাবছি একটা নধর পাঁঠা নিয়ে ভুলোদার বাড়িতে হানা দেব। অনেকদিনই যাওয়া হয়নি। 
আর হ্যাঁ, যারা এতোদিন আমাদের একঘরে করে রেখেছিলেন, ট্রিট চাইলে এলে ঘাড়ে বুড়োদা ছুঁড়ে মারব বলে রাখলুম।।

Sunday, 6 May 2018

মারে হরি, রাখে কে

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা।
ভোর তখন সাড়ে পাঁচটা। আমি সবে ঘুমের ফার্স্ট হাফ শেষ করে টয়লেট ব্রেকটা স্কিপ করে স্ট্রেট সেকেন্ডহাফে ঢুকব, এমন সময় ঘরের দেওয়াল-ছাদ বিদীর্ণ করে আওয়াজ এলো 'সেলফি ম্যাঁয়নে লে লিয়া...' রিংটোন এরকম রাখার একটাই কারণ, রাস্তাঘাটে ফোন বাজলে আমি শুনতে না পেলেও পাশের লোকটা ঠিকই বলবে, 'দাদা, হয় ফোনটা ধরুন আর নাহলে কালীঘাটের গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসুন।' ঘুরিয়ে ফোন করবার টাকাটা বেঁচে যায় তাতে। কিন্তু এমন অসময়ে!
ফোন নিয়ে দেখি বুড়োদার ফোন। বুড়োদার তো এখন স্বপ্নে তাঁর ভার্চুয়াল গার্লফ্রেন্ড অভিষিক্তাদির সাথে স্বপ্নে প্যারিসে যাওয়ার কথা। তাহলে কি স্বপ্নেও আজকাল বুড়োদাকে লোকজন ফ্রেন্ডজোন করতে শুরু করল!
যাইহোক, ফোন তুললাম। ফোন তুলেই শুনলাম বুড়োদা রাগসঙ্গীত গাইছে। সাথে একটু আধটু কান্নাও আছে, অনেকটা হিমেশ রেশমিয়া 'নাম তেরা তেরা' ছেড়ে ভৈরবী রাগ গাইলে যেমন শোনায়। বুঝলাম সিওর লেঙ্গি কেস। জিজ্ঞেস করলাম, 'কে লেঙ্গি মারলো?'
-আর লেঙ্গি মারবে না রে! আমার তো আর লেগ-ই ঠিক নেই। 
তারপর পাঁচমিনিট যা বলল তাতে বুঝলাম বুড়োদাকে হরি তুলে নেওয়ার আগে আমাকে শ্রীহরি হাসপাতালে ছুটতে হবে।
হাসপাতাল পৌঁছালাম। বুড়োদার এরকম না হলে জানতেই পারতাম না এটা হাঁস-মুরগীর খামার না হাসপাতাল! বুড়োদার ঘরে ঢুকে দেখলাম বুড়োদার পায়ে মোটা করে সাদা ন্যাকড়া জড়ানো। পায়ে বাঁধা একটা দড়ি উপরে ফ্যান থেকে নেমে বুড়োদার হাতে ধরা। ওটা ধরে টানতেই বুড়োদার ডান ঠ্যাং উঠছে আর ছেড়ে দিলে নামছে। হাসপাতালে এক্সরে না থাকায় নার্স মোবাইলে অনলাইন এক্সরে দিয়ে দেখেছে পা ভাঙেনি। তাই পায়ে কাপড় জড়িয়ে কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে গেছে ডেটিংএ। 
রুগীর সাথে দেখা করতে গেলে ফল নিয়ে যেতে হয়। আমিও আসার সময় কয়েকটা কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে এসেছিলাম। বুড়োদা আমায় দেখেই দড়ি ধরিয়ে বলল, 'নে, টানা শুরু কর। আমার হাত ব্যথা হয়ে গেছে।' কাঁচা আম খেতে খেতে আর দড়ি টানতে টানতে ভাবলাম আমাদেরই আর কিছু হলো না!
বুড়োদাকে নাকি কালরাত্রে দেশাত্মবোধক গানে পেয়েছিল। মাঝরাতে পাড়ার কুকুরদের ঘুম চটকে মার্চ করতে করতে 'চলরে চলরে চল/ উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/ নিম্নে উতলা ধরণীতল/ চলরে চলরে চল' গাইছিল। পথে একটি পরিত্যক্ত কুয়ো করকেটের ছাউনি দিয়ে ঢাকা ছিল। ছোটবেলায় পড়েছিলাম ব্রিজ পার করার সময় মার্চ করতে নেই। কিন্তু বুড়োদা সেটা বুঝলে তো! অভিকর্ষের টানে 'নিম্নে উতলা ধরণীতলে পৌঁছাতে বেশী সময় লাগেনি।
কিন্তু আমাদের বুড়োদা ফাইটারের জাত। ইদানীং মাউন্টেনিয়ারিং শিখছে। যেখানে সেখানে তরতর করে এমন অবলীলায় উঠে পরে যে মনে হয় ডারউইন দাদুই ঠিক। শুধু গাছে চড়াটাই বাকি রেখেছে কারণ গাছের অপঘাতে মৃত্যুও তো প্রাণ হত্যারই সামিল। আমাদের লেজেন্ড বুড়োদা সেই পঙ্গু অবস্থায় কুয়ো চড়ে উড়োদা হয়ে হাসপাতাল পৌছেছে। বুড়োদা আমাদের গর্ব, আমাদের অহঙ্কার, আমাদের দলের মাসদুর রহমান বৈদ্য। যাইহোক, আমার একটা কিন্তু খটকা লাগছিল। একেই বৃষ্টি-বাদলার দিন, মাটি নরম। বুড়োদা গর্তে পড়েছিল নাকি বুড়োদা পড়ে যাওয়ায় গর্ত তৈরী হয়েছিল। মানে বুড়োদার যা ওজন, উল্কাপতনের চেয়ে এফেক্ট কম কিছু হওয়ার নয়।

যাইহোক, বুড়োদাকে যতটা সিরিয়াস অবস্থায় দেখবো ভেবেছিলাম ততটা মোটেও নয়। বরং দু'তিন দিন পরেই ছাড়া পেয়ে যাবে। এমন সময় শুনি কে একজন গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করছে, 'সৌণক ব্যানার্জী, আপনি?'
-হ্যাঁ।
-আর আপনি?
-রাজর্ষি। রাজর্ষি সরকার। ওর বন্ধু, কী দরকার? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলাম।
-থানা থেকে আসছি। সুস্থ হয়ে থানায় আসবেন একবার।
বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে একশ আট। বুড়োদা আমার দিকে তাকাল। আমি মনে মনে ভগবান কে অশেষ ধন্যবাদ দিলাম একজোড়া কিডনি দিয়ে জন্ম দেওয়ার জন্য। হাজার হোক, অসুস্থ মানুষের থেকে তো আর কিডনি চাওয়া যায় না।
শ্রীহরিতে আসাটাই আমার কাল হলো। মারে হরি, রাখে কে!!

Friday, 2 March 2018

ভুলোদা এবং ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ

শীতটা সবে গেছে। ইদানিং বিকেলের দিকে দিব্বি ফুরফুরে হাওয়া দিয়ে থাকে, আর আমি আর রাজু নিয়ম করে গড়ের মাঠে বসে ঘাস চিবিয়ে থাকি। বিয়ের পরে ভুলোদা আমাদের জন্যে বাড়ির বাইরে 'প্রবেশ নিষেধে'র প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে দিয়েছে। নাঃ, আসলে আমরাই ভুলোদাকে বয়কট করেছি!
দোষটা অবশ্য ভুলোদাকে ঠিক দেওয়া যায় না, বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন বৌদি ভালো ভালো রান্না করতো, আর আমাদের ভুরিভোজের ব্যবস্থা হতো কিন্তু ভুলোদার সেসব চোখে দেখাই সার ছিল, চেখে দেখতে গেলেই বৌদির কটাক্ষে ভুঁড়ি ভস্ম হওয়ার ছিল কিনা। কতদিন ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ রুটি খেতে খেতে দেখা যায় যে সামনে বসে অপোগণ্ডের দল প্রেমসে মুরগির ঠ্যাং সাঁটাচ্ছে! আমাদেরই কষ্ট হতো বেচারার জন্যে! গলা দিয়ে নামতেই চাইতো না! কিন্তু বৌদির রান্না এমন অমৃততুল্য যে ভুলোদার রান্নাকেও হার মানিয়ে দেয়, তাই বৌদির কথা ভেবেই কোনোরকমে গলাধঃকরণ করে নিতে হতো আর কি বিরিয়ানী বা মুরগি-রোস্ট।
 বেশিদিন চললো না ব্যাপারটা। একদিন এরকম নেমতন্ন খেতে গেছি এরকম, বৌদি ছখানা থালা দিয়ে গেলেন সাজিয়ে রোজের মতন, আমাদের তিন মক্কেলের, বকুলের, সুচিস্মিতাদির আর স্বয়ং ভুলোদার। তার পর সেই থালায় পড়লো খান চারেক করে রুটি, আর সবুজ, গলা পাঁকের মতো এক দলা করে ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ, এক্কেরে ছয় এক্কে ছয়টা থালায়!
 আমাদের অবাক, হতবাক, বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে, ভুলোদা অমায়িক মিহি হেসে বললেন, "ওরে, আমিই তোর বৌদিকে বললাম, যে তুমি শুধু আমার কথাই ভাবলে সোনাই, ওদের কথা ভাবলে না! ওরাও তো রোজ রোজ এত মুরগি মটন খেতে খেতে হাফিয়ে উঠছে, ওদের ও তো প্রাণ কাঁদে ঢ্যাঁড়শের জন্য! তাছাড়া, শৌনকটা এমনিতেই আমার অর্ধেক, চেহারার দিক  থেকে আর কি!এবার তো আমাকেও ছাপিয়ে  যাবে, শুচি আর হীরেনের বিয়ে, ওদের তো ডায়েট করাই উচিত। আর বকুলব্রত, রাজর্ষি দুটোই পেটরোগা! এবার থেকে আমায় যা দেবে, ওদেরও তাই দেবে।"
তার পর থেকে বৌদির হাজার ফোনেও আর ডিনার করিনি ওবাড়িতে।
সে যাক, কথা হচ্ছে যে ইদানিং আমি আর রাজু একদমই হতাশ, ভবঘুরে আর বেকার। কাজের মধ্যে দুই, খাই আর শুই। তাই ভুলোদার বাড়িতে আজ যাবো ভাবছি। ভুলোদা পার্টির অনেককে চেনে টেনে। তাদের মধ্যে একজন আছেন বিরাট শিবভক্ত, এবং তাঁর হাত প্রচুর লম্বা, মানে  যে হাতটা দেখা যায় না সেইটা আর কি।  ভদ্রলোকের নাম মিস্টার সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড।  দেখি যদি ভুলোদা ধরে কয়ে একটা হিল্লে করতে পারে!



Thursday, 1 March 2018

শুভবিবাহ

ভুলোদাকে দেখলে মায়া হয়। অতো বড়ো মাপের ও মনের মানুষটার সাথে এরকম হল, ভাবাই যায় না। যাই হোক, দেখা করতে গিয়েছিলাম ভুলোদার বাড়ি। ভুলোদার কান্নার সুর সানাইয়ের সুরের সাথে মিলে যাওয়ায় অনুনাদ তৈরি হয়েছে, যার ফলে বেশ অনেক দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া নাক থেকে টোয়েন্টি ফোর আওয়ার রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা তো আছেই। আমায় দেখে ভুলোদা হীরুদার গলায় বলে উঠলো, ‘রাজু, ওঠ শিগগির।‘ তারপরই মোষ-খাটালের মোষ ধোয়ার বালতি করে এক বালতি জল ঢেলে দিলো গায়ে। আমি ধড়মড় করে উঠতেই দেখি হীরুদা আর বুড়োদা চেঁচাচ্ছে, ‘কতক্ষণ ধরে ডাকছি। বিয়ে শুরু হলো বলে।‘
-বিয়ে! বিয়ে ভেঙ্গে গেছে না!
-আরেকবার বলে দেখ। ভুলোদা তোর ইয়ে ভেঙ্গে দেবে।
বুঝলাম বাবার দয়ায় স্বপ্ন দেখছিলাম। সেজেগুজে বেরোতে দেখি বিয়ে শুরু হব হব করছে।

সে ভুলোদা সুখে থাকুক বিয়ে করে। ছোটোবেলা থেকে পড়ে এসেছি ‘সেবা পরম ধর্ম।‘ আপাতত হেঁশেলের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় স্বস্কন্ধে তুলে নিলুম। আপাতত এই পর্যন্তই।।

ডেঞ্জারাস

ভুলোদা সাতদিন হল নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করেছে। সাতদিন ধরে ননস্টপ বিসমিল্লা খাঁর সানাইইয়ের করুন সুর বেজে যাচ্ছে। তার ভুঁড়িখানা স্থায়ীভাবে স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধন্ত নিয়েছে। কিন্তু তাঁর শরীর আর এই ধকল সহ্য করতে পারছে না। কাল রাত থেকে সানাইয়ের পরিবর্তে মাঝে মাঝে সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু তা যে শেষে এমন বিপদ ঘটাবে তা আর কেউ আশা করেনি। আজ সকাল থেকে তাঁর গলা থেকে আলট্রাসোনিক সাউন্ড বেরচ্ছে। দলে দলে বাদুড়েরা আসতে শুরু করেছে। খবর দেওয়া হয়েছে বনবিভাগে।
উপস্থিত অতিথিবর্গ হায় হায় করতে করতে বিয়েবাড়ি ত্যাগ করেছেন। বুড়োদা অবশ্য হায় হায় করছিল অন্য কারনে। সে রসগোল্লার কড়াইয়ের কাছে গিয়ে দেখে সবকটি রসগোল্লাই তাদের স্থায়ী আস্তানা ছেড়ে ঘাঁটি গেড়েছে বিভিন্ন জনার পেটে। একটিও আর নাই।

হীরুদার মোষ-খাটালে কাজ থাকায় বিয়েতে আসতে পারেনি। সব শুনে বলল, 'বাপরে! কী ডেঞ্জারাস!!'

ভুলোদার বিয়েভঙ্গ

--হ্যালো।
--ভুলোদা বলছ?
--বকুল তোর কোন আক্কেল নেই? আমি বিয়ে করব বলে চার ঘণ্টা বসে আছি। খিদের চোটে এই ভর শীতেও কোলাব্যাঙগুলো হাইবারনেশন থেকে বেরিয়ে এসে পেটের ভিতর ফড়িং খাই, ফড়িং খাই করে বেড়াচ্ছে। আর তুই এখনও বৌদিকে নিয়ে পৌঁছুলি না! নাহয় আমি প্রিয়তমার মুখ না দেখা পর্যন্ত নির্জলা উপোস করব ঠিক করেছি। কিন্তু তাই বলে আমাকে দিয়ে অনশন করানর প্ল্যান ছিল তোর! ফোনটা পর্যন্ত সুইচ অফ করে রেখেছিস। আর কতক্ষন এই ব্যাঙের নাচ সহ্য করতে হবে বল তো।
--জানিনা ভুলোদা। হয়ত সারাজীবন...
--মানে? কোথায় এখন তুই?
--হাসপাতালে। মাথাটা এখনও টনটন করছে।
--কী হয়েছে? কোন অ্যাক্সিডেন্ট নয়তো? ও ঠিক আছে তো?
--সে আর নেই ভুলোদা।
--মানে!!!
--হ্যাঁ ভুলোদা। সে চলে গেছে।
--কী বলছিস?? আমার...
--হ্যাঁ ভুলোদা। শেষে জোর করাতে যাবার সময় আমার মাথায় লাঠির বাড়ি মেরে গেছে।
--মানে! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার কিন্তু ইয়ার্কি সহ্য হচ্ছে না।
--রাস্তায় আসতে আসতে বৌদি আমায় গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। আমি গাড়ি দাঁড় করাতেই সে বলল, 'বকুল, ওই কুমড়োপটাশটাকে বলে দিস আমি চললুম।' তারপর চোখ খুলে দেখি হাসপাতালের বেডে শুয়ে ব্লাড নিচ্ছি। পাড়ার ছেলেরা চিনতে পেরে হাসপাতালে এনেছে। যাওয়ার সময় মাথা ফাটিয়ে দিয়ে গেছে আমার।
কিছুক্ষণ পর এক ভয়ানক আর্তনাদ শোনা গেল। কলাদার কানে তালা ধরে গেল। সুচিস্মিতাদি চেয়ার থেকে উলটে পড়ে গেল। কয়েকটা কাক ভয়ে উড়ে পালাতে গিয়ে বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হয়ে মারা গেল।।

ভুলোদার সন্ধ্যা-পর্ব

ভুলোদাকে নিশ্চয়ই ভুলে যান নি ? আর মিকি ভাই কে মনে আছে তো ? ওই যাঁর গর্দান থেকে পাছা সকলই ছেচল্লিশ আর যিনি  ভুলোদার  বিয়েতে অক্টোপাসের চাটনি রান্না করার প্ল্যান করেছিলেন ? না মনে থাকলে 'ভুলোদা এবং মিকিভাই' খানা একবার ঝালিয়ে নেবেন নাহয়! তা সেইবার ভুলোদার বাড়িতে মিকিভাইয়ের 'হরেনডাস হিমালয়' শুনে হরিবোল বলে পালিয়ে এসেছিলুম আর তিনজনে মিলে বকুলব্রত (ভুলোদার পাড়াতুতো শ্যালক) এবং ভুলোদাকে যথেচ্ছ ছিছিক্কার করেছিলাম, যা তা লোকের খপ্পরে পড়ে যায়, নিজেদের কোনো ভালোমন্দ বিচার বোধ নেই এই সব বলে টলে! কিন্তু পরবর্তী কালে দেখা গেলো মিকিভাই আদতে অত্যন্ত কাজের লোক মশাই! কিভাবে বুঝলাম? অরে রসুন, সেটাই তো গপ্পো!

হীরুদা প্রথম খবরখানা দেয়; হীরুদা আর আমাদের শুচিস্মিতাদিদি সেদিন গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে গেছিলো বোধয়, হীরুদা  মোষখাটালের ম্যানেজার হওয়ার পর থেকে ওরকম প্রায়ই যাচ্ছে ওরা ! বলে কিনা ভুলোদার সাধের সেকেন্ডহ্যান্ড মারুতিখানায় চড়ে ভুলোদার নতুন  ফিটনেস ট্রেনার মিস স্যান্ডা আর আমাদের মিকিভাইও গড়ের মাঠে চক্কর কাটছে!
আমি আর রাজু মিস স্যান্ডার কেসটা  জানতাম; মিকিভাইএর মতে, ভুলোদার  বিয়ের থিম, 'বিগ বং' যেহেতু  দাদার বিশাল বপুর কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে, ভুলোদা যাতে কিছুতেই রোগা না হয়ে যায়, তার জন্যে ভুলোদার উচিত বিয়ে পর্যন্ত ফিগার মেনটেন করা! অতঃপর তাঁরই সুপারিশে  মিস স্যান্ডার আগমন!

মিস স্যান্ডা সুন্দরী, তন্বি এবং বাপ্-মা প্রদত্ত সন্ধ্যা নামখানার পক্ষপাতী নন। কিন্তু স্রেফ এই বলে মিস স্যান্ডাকে বর্ণনা করা সম্ভব হবে না! বেশি জটিল না করে শুধু এইটুকু বলি, স্যান্ডার আগমনী গান বাজতেই আমি সুগন্ধার সৌরভ  প্রায় ভুলতে বসেছিলাম; রাজুর চাকরির প্রিপারেশনের জন্যে বার বার করে ভুলোদার হেল্প নেওয়ার দরকার পড়ছিলো, আর  সেটাও কিনা কাক-ভোরে আর বিকেলগুলোতে যখন ভুলোদার ডায়েট চার্ট ধরে ব্রেক -ফাস্ট আর ডিনার খাওয়া হচ্ছে কিনা দেখতে স্যান্ডা হাজির থাকতো!  আর হীরুদা বেচারা , লাইসেন্সের অভাবে  আড়চোখে চেয়ে চেয়ে প্রায় টেরা হয়ে যেতে বসেছিল !!

 যাই হোক, আমাদের এই বাঁদরামি বেশিদিন চলেনি, হীরুদার চোখ তো  শুচিস্মিতাদি দায়িত্ব নিয়ে সরিযে এবং সারিয়ে ফেলে দিন তিনেকের মধ্যেই, রাজুকে স্যান্ডা রাখির দিন রাখি পরিয়ে দিলো, আর আমার তো বিষে বিষক্ষয় হলো একদিন রাস্তায় সুগন্ধাকে পাড়ারই যাদবপুরিয়া এঞ্জিনিয়ার তন্ময়ের সঙ্গে ফুচকা খেতে দেখে ! দুঃখের চোটে স্যান্ডা সন্ধ্যার আলোর মতো ভ্যানিশ!

বকুল কিছুদিনের জন্যে বাড়ি গেছে, সে এই সান্ধ্য-রেসে অংশই নেয় নি!

কিন্তু তাই বলে অমন ৩৬-২৪-৩৬ মেয়ের সাথে ৪৬-৪৬-৪৬ মিকিভাইকে বারবার বহুবার দেখা যেতে দেখলে কিরীটি -ব্যোমকেশের চেলারা কদিন আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? চাকরির এই আকালে সময় কাটাতে  আমাদের মতো ফেল্টু গ্রাজুয়েটদের ফেলুদারাই তো ভরসা....    


তো দিনকতক একটু ঘুরঘুর শুরু করলাম, ভুলোদার পাড়ায় এবং ভুলোদার শ্বশুরবাড়ির পাড়ায়। বকুলের পিছনে টিউশনে গলার রক্ত মুখে আনা পয়সা খরচ হলো আমার এবং রাজুর দুইজনারই! কিন্তু কৌতূহল বড়ো দায়, বিশেষত বেকার জীবনে।
তিন দিন পর রাজুর ফোন, "বুড়োদা, খবর আছে, আজ সন্ধ্যাবেলা হীরুদার বাড়ি।" খবর আমারও ছিল, কাজেই সন্ধ্যেবেলা সন্ধ্যার রহস্য-উন্মোচনে হাজির হলাম হীরুদার বাড়ি।

হীরুদা একলা থাকে, ছোট্ট একখানা ফ্ল্যাটে। ভাড়া করে, সেই কলেজ আমল থেকে। ভুলোদার সাথে  আলাপ হওয়ার আগে এটাই ছিল আমাদের  'ডেন'! একদিকে ছড়ানো বই খাতা, একটা তার ছেঁড়া গিটার, একপাশে  খাটে ছড়ানো কলেজের টেক্সট বই থেকে ইদানিংয়ের 'তিনদিনে টেট পাশ'! তারই মধ্যে ধুলো টুলো ঝেড়ে বসা গেলো।

রাজুর উৎসাহ চরমে। হিয়ার(রাজুর 'প্রাক্তন চাপ') পরে ওর  হিয়াতেই  আঘাত বেশি করেছে কিনা  স্যান্ডা! হীরুদা চা বসিয়েছে কি বসায়নি , শুরু হয়ে গেলো! "আরে, বাবা রিসেন্টলি একটা চাকরির কোচিঙে ভর্তি করেছে, 'সরকারদার সরকারি চাকরির প্রশিক্ষণ ', সেইখানে যাচ্ছি সন্ধ্যেবেলা এই সপ্তা থেকে। একটা ছেলে আসে, বাইকে চেপে। ইয়া বডি মালটার !আকাশ নাম।  কাল কোচিং শেষ হয়েছে, দেখি স্যান্ডা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। নটা মতো হবে তখন! আমি কথা বলতে যাবো যাবো, এমনি সময় সে আকাশের বাইকে চেপে হুউস! একদম লিপ্টে বসে দুজনে, আর দুজনাতেই বিশাল খুশি....কেসটা জন্ডিস লাগছে হীরুদা!"

হীরুদা আমাদের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, "মিকিভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলুম,কিছু বললো না তেমনি, লাজুক লাজুক হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেলো"

আমার খবরটা ওদের দিলাম, সোর্স বকুল, মিকিভাইকে নাকি দিনকয়েক আগে জাভেদ হাবিব থেকে বেরোতে দেখা গেছে, স্পাইক ছেড়ে মিকিভাই নাকি আজকাল চুল রাখার চেষ্টায় আছেন, সঙ্গে হাফ-প্যান্ট ছেড়ে ডেনিম ধরেছেন! আর স্যান্ডা মিকিভাইয়ের টিমে নতুন আমদানি। আগে একটা ছেলে ছিল ফিটনেস ট্রেনার ! সে ছেড়ে দিয়েছে রিসেন্টলি!

রাজু খুব মাথা-টাথা নাড়িয়ে বললো, "ইস, মিকিভাইটাও আমাদের দলে নাম লিখতে চলেছে! আজকালকার দিনে কি অবস্থা! একটা সফল প্রেমও কি নামে  না!"

আসলে মনে মনে খুশি হয়েছি না দুঃখ পেয়েছি ঠিক বুঝলাম না! পাপী মন, নিজের সুখের চেয়েও অন্যের দুঃখ দেখতে বেশি ভালোলাগে! তবু, মিকিভাইয়ের ওপর কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে ! লোকটা প্রচুর বাজে বকে ঠিকই,  তবু লোকটার মন ভালো! আর হাজার হলেও ভুলোদা সূত্রে লোকটা দলের একজন হয়ে গেছিলো!

যাইহোক,সেদিন তো  হীরুদার রান্না ভাত -ডিমের ঝোল খেয়ে খানিকক্ষণ  -গুলতাপ্পি মেরে ফিরে এলাম!

বোম পড়লো দুদিন পর, ভুলোদার জরুরি তলবে! ভুলোদার বাড়িতে গিয়ে দেখি সক্কলে হাজির! বকুল, স্যান্ডা, শুচিস্মিতাদি সমেত হীরুদা, রাজু, মিকিভাই এবং একটি নতুন ছেলে, যাকে আমি চিনি না! রাজু দেখি 'থ' মেরে দাঁড়িয়ে আছে!

আমায় দেখে একপাশে ডেকে নিয়ে বললো,"ও বুড়োদা, এই তো সেই আকাশ!"

ভুলোদা সকলের জন্য আজ অনেকদিন পর নিজে হাতে লেগ-ফ্রাই বানিয়েছেন। নিয়ে এলেন! আজ ভুলোদা নিজের ওই বড়ো চাকা ওয়ালা চেয়ারটাতেই বসেছেন, আমরা সোফা টুল যে যা পেরেছি দখল করে বসে।

হীরুদা গলা সামান্য নামিয়ে বললো, "কেসটা কি হচ্ছে বলতো? সূচি সব জানে, তাও  বলছে না! ভুলোদা ওকে কাল ফোন করেছিল, আজ দুজনে মিলে সারাদিন ধরে প্রচুর রান্না টান্না  করেছে! রাতেও এখানেই খাবে সকলে ! বকুল ও কিস্সু জানে না!"

আমি আর রাজু ঘাড় নাড়লাম! জানি না! ভুলোদাকেই বলতে দেওয়া হোক!

ভুলোদা একটু গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন, " তোমরা যারা এখানে আছো, সকলেই আমার খুব প্রিয়, আমার একমাত্র আপনজন। আজ সেই আপনজনদের  মধ্যে দুজন নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে, আমি খুব খুশি! হীরেন, সৌনক, তোমাদের দায়িত্ব বেড়ে গেলো কিন্তু ! এবার একটা না, দুটো বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে! কল্পতরুবাবু আজ আমাদের সকলকে সাক্ষী রেখেছে স্যান্ডার সাথে রেজিস্ট্রিটা করে নেবেন! স্যান্ডার তরফ থেকে ওর ছেলেবেলার বন্ধু আকাশ আছে, আর স্যান্ডা চায়, ওর রাখি-ভাই রাজর্ষি সই করুক, কল্পতরুর তরফে আমি আর হীরেন সই করবো! একটু পরেই উকিলকাকা এসে যাবেন..."

আমি জানি না আমার মুখের মানচিত্র কেমন ছিল এতসব শুনে টুনে, হীরুদার মুখে একটা টারান্টুলা ঢুকে গেলেও অবাক হতাম না এত বড়ো  হাঁ হয়ে গেছিলো ওর মুখ! রাজুকে দেখে মনে হচ্ছিলো ও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না! মিকিভাই বিশাল গর্দানের মধ্যে মাথাটা প্রায় লুকিয়ে ফেলতে পারলে বেঁচে যান এত লজ্জা পেয়েছেন! স্যান্ডা আর শুচিস্মিতাদি পিকচার থেকেই আউট!

তারপর? তারপর আর কি! উকিলকাকা এলেন, স্যান্ডাকে শাড়ি পরিয়ে নিয়ে এলো শুচিস্মিতাদি, খাওয়া দাওয়া হলো, সই-টই ও! মিকিভাই চুপিচুপি জানিয়ে গেলেন তাঁর বিয়ের থিম-'শখের সকার'-"পুরো ফুটবল বেসড থিম, বুঝলে ভাই, একদম!"

বাড়ি ফেরার সময় রাজু আর আমি একসাথে বেরিয়েছিলাম, বাস-রাস্তায় এসে আলাদা হওয়ার আগে রাজু বললো,"বুঝলে বুড়োদা, খুব ভালো লাগছে, খুউব ভালো লাগছে...."









 

ভুলোদা এবং মিকিভাই

 হীরুদা মোষ খাটাল জয়েন করার কয়েকদিন পরের ঘটনা। হীরুদা তো যা হোক এখন তাও খাটালের খেয়ে খাটালেরই মোষ তাড়াচ্ছে, আমার আর রাজুর পকেট ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি। তা রাজুও দুদিন ধরে বেপাত্তা, ফোন করলে বলে,'বুড়োদা, ফালতু জ্বালিও না, চাকরির জন্যে পড়াশোনা করছি!' অগত্যা পাড়ার মোড়ে ক্লাবের রকে বসে একা একাই বিকেল কাটাচ্ছি আর বিড়ি টানছি; মনে আশা একটু পর সুগন্ধা যাবে সামনের রাস্তা দিয়ে পড়তে, তার পর উঠবোখন!
তা সুগন্ধাকে আসতে দেখে চটপট বিড়িটা ফেলে পকেট থেকে নোটবই বার করে একটা আঁতেল আঁতেল ভাবালু মুখ নিয়ে খুব গম্ভীর ভাবে সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে আছি আর আড়চোখে ঝাড়ি মারছি, ফোনটা তারস্বরে গান গেয়ে উঠলো-'বাবা আমার কি বিয়ে হবে না!'; সুগন্ধা তখন ঠিক সামনে দিয়ে যেতে যেতে আমার দিকে একটা 'এহেহে' মার্কা লুক দিয়ে গেলো! ব্যাস! প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন! রিংটোনখানা ইমিডিয়েট পাল্টাতে হবে! আর কোন হতভাগার ঠিক এই সময়ে আমাকে দরকার পড়লো! নিশ্চই অক্কমার  ঢেঁকি রাজুটার ! এইসব ভেবে টেবে চরম বিরক্তির সাথে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আমি অবাক!
ভুলোদা! ভুলোদা ফোন করেছে! আমায়! মাসদুয়েক পরে! বৌদির নাম আমার নামের কাছাকাছি; বৌদিকে ডায়াল করতে গিয়ে আমায় করেনিতো? এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা তুললাম,'ভুলোদা, বলো বলো, আদ্দিন পর মনে পড়েছে ভাইকে!'
ওপাশ থেকে ফাটা কাঁশির মতো গলায় আওয়াজ এলো,"ভুলোদা নোই, আমি বকুল বলছি। ভুলোদা বললো রাজুদা আর হিরুদাকে জুটিয়ে রাত্তিরে চলে আসতে, কাজ আছে। "

 আমি হ্যাঁ না কিছু বলার আগেই কট করে ফোন কেটে দিলো বকুলব্রত। ভুলোদার পেয়ারের পাড়াতুতো শালা। রাগে গজগজ করতে করতে উঠে পড়লাম রক থেকে। বকুলটার আস্পদ্দা বড্ডো বেড়েছে। ভুলোদাই বাড়িয়েছে ওকে! হতচ্ছাড়া বানর! মর্কট! কপি! অখাদ্য বাঁধাকপি একটা!

যতই যাই হোক. ভুলোদার ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা এখনো আমার, রাজুর, হীরুদা কারোর নেই। অতএব, আটটা বাজার আগেই তিনমূর্তি একজোট হয়ে ভুলোদার বৈঠকখানায় সোফাসীন হয়ে গুলতানি মারছি আজ অনেকদিন পর। সঙ্গে শুকনো চানাচুর। ভুলোদা, বকুল কেউ বাড়িতে নেই, আমাদের সক্কলের কাছে এবাড়ির একটা করে চাবি আছে, তাই নিজেরাই নিজেদের আতিথ্যে বরন করে নিয়েছি। রান্নাঘর আর ফ্রিজ ঘেটে দেখাও হয়ে গেছে, কিন্তু ওবেলার ডাল ছাড়া কিছু ছিল না।  অগত্যা চানাচুর এবং পিএনপিসি চলছে পুরোদমে।

ঠিক পিএনপিসি না, হীরুদা নিজের কথাই বলছিলো। শুচিস্মিতাদি নাকি খুব খুশি মোষ -খাটালে হীরুদা চাকরি পাওয়াতে । সে তো চাকরি পেয়ে গেছে আজ বছর দুয়েক হল , কোনোক্রমে বিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিলো। এইবার নাকি হীরুদার সাথে মা-বাবার দেখা করাবে। ভালো ভালো! সবার ভালো হোক , সবার বিয়ে হোক! রিং-টোনটা চেঞ্জ করবো না, ডিসিশন নিলাম। অতি সত্য কথা কৈছে ওটা!

আধঘন্টা ধরে হীরুদার ভ্যাজভ্যাজানি শুনে প্রায় বিরক্ত হবো হবো করছি, এমন সময় গ্রিল দরজা খোলার আওয়াজ!
আমরা তিন মক্কেল সচকিত! রাজু একটু আগেই বলছিলো,"ভুলোদার সাথে একটা বোঝাপড়ার দরকার আছে, প্রেম করছে বলে আমাদের এইরকম ইগনোর মারতে পারে না লোকটা!" কিন্তু বেড়ালের গলায় প্রর্থম ঘন্টাটা কে বাঁধবে, সেইটা এখনো ঠিক হয়ে ওঠেনি!

কিন্তু এরপর যা ঘটলো, তাতে ওসব বেমক্কা মাথা থেকে ধাঁ! এক্কেরে আবির্ভাব ঘটলো ধরাধামে ইয়ে থুড়ি ভুলোধামে, এক মহাপুরুষের!

প্রথমে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকেছিলো খ্যাংরাকাঠী বকুল, তার পিছনে শান্তিনিকেতনি ঝোলা কাঁধে বিপুল বপু আমাদের ভুলোদা। আর তার পর? তারপর যেজন প্রবেশিলো, তাহারে বর্ণনা করিবার ভাষা মোরে ঈশ্বর দেন নাই! উপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাহার সকলি ছেচল্লিশ! [হরিণঘাটা ফার্মে এক-প্রজাতির জীব সযত্নে লালিত-পালিত হয়, অনেকটা তাদের মতো গড়ন!] চুলে ফুটবলার ছাঁট, ঘাড় থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত সব লেপে-পুছে ছাটা, তার উপরে যেকটি রয়েছে, জেল-লেপিত হয়ে তারা স্পাইকের মতো উর্দ্ধগামী! চোখে অধুনালুপ্ত গোল চশমা, গায়ে হাফ-শার্ট, যার বোতাম গুলো ছিঁড়ে যেতে যেতেও যায়নি! পরনে টাইট হাফপ্যান্ট, তাতে লেখা 'ম্যান,ইউ!' হাতে একখানা লাল ফাইল, তার ভেতর থেকে কিছু কাগজ উঁকি মারছে!

আমি থ! হীরুদার চোখ সকেট থেকে বেরিয়ে আসি আসি! রাজুর মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে অট্টহাসি চেপে আছে!

ভুলোদা অমায়িক হাসি হেসে বললেন," এই তো, হীরেন, সৌনক, রাজর্ষি তোমরা এসে গেছো দেখছি! বসো, বসো!" আমরা উঠে দাঁড়িয়েছিলাম বোধহয় ওদের দেখে, ঠিক মনে নেই,"ইনি হলেন কল্পতরু বাগচি, ওরফে মিকিভাই; বকুলের পাড়ার মানে তোমাদের বৌদির পাড়ার স্বনামধন্য ডেকোরেটার! ভাবছি বিয়ের প্যান্ডেল ওইসব দায়িত্ব এঁনাকেই দেব-"

ভুলোদা আরও কিছু বলেছিলো হয়তো, কিন্তু কানে আসেনি আমার। আমি আর হীরুদা তখন রাজুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, বেচারা এত কাশছিলো যে প্রায় প্রাণ বেরিয়েই যায় এমন অবস্থা!

কল্পতরু বাগচি ওরফে মিকিভাই ততক্ষনে জাকিয়ে বসেছেন গদি  আঁটা বড়ো চাকা লাগানো চেয়ারটায়, যেটাতে  কেনা ইস্তক ভুলোদা ছাড়া কেউ বসেনি!


রাজুর মাথায় চড়চাপাটি মেরে ওকে তো কোনোক্রমে সামলালাম। বকুল ততক্ষনে গেস্ট-স্পেশাল চায়ের কাপ বের করে তাতে চা নিয়ে এসেছে; মিকিভাই পায়ের উপর পা তুলে বসে সুরুৎ সুরুৎ করে তাই পান করছেন। ভুলোদা খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক তাকিয়ে শেষে সোফার উল্টোদিকে রাখা একটা টুলের উপর বসেছেন। আমরা তিনজন সোফায় ; ঘরে কেমন একটা শ্মশানের শান্তি বিরাজ করছে। মিকিভাই তাঁর গোল চশমা সামান্য নামিয়ে সেই ফাঁক দিয়ে আমাদের তিনজনকে জরিপ করছেন। আমি দেখলুম হীরুদা নিজের একমনে ভুলোদার ঘরে ঝোলানো রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে দাঁত  দিয়ে নখ কাটছে, আর রাজু ভুরু কুঁচকে দেখছে মিকিভাইকে। হঠাৎ উড়ে এসে এইরকম ভুলোদার চেয়ার  জুড়ে করে বসাটা ওর মোটেই পছন্দ হয়নি। ভুলোদা টুলে ঠিক স্বস্তি পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না, বারবার নড়েচড়ে বসছেন আর উসখুস করছেন, যেন কিছু একটা বলতে চান কিন্তু আমাদের তিনজনের  অবস্থা দেখে বলার সাহস পাচ্ছে না!

বকুল আমাদের জন্যেও চা নিয়ে এসেছে, শেষে নিজে এককাপ নিয়ে এসে দরজায় হেলান দাঁড়ালো;  তারপর ওই কথা শুরু করলো;" হুম, কলাদা, ভুলোদাকে দেখাও ডিজাইন গুলো!"
'কলাদা!' আমি হিরুদার দিকে তাকালাম, সে তখনও নখ খাচ্ছে।
রাজু আমার দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি  দিয়ে মিকিভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল 'হ্যাঁ ,কলাদা ,দেখান কি প্যান্ডেলের ডিজাইন হবে  টবে , আমরাও একটু দেখি ।'
ভুলোদা টুলের উপরেই নড়েচড়ে বসলেন আর একবার। তাঁর চোখে মুখে বেশ একটা লজ্জা লজ্জা আগ্রহ ফুটে উঠেছে, ঠোঁটে হালকা একটা উত্তমকুমারমার্কা লাখটাকার হাসি!

মিকিভাই এই প্রথম কথা বললেন,  অমন বরাহসুলভ চেহারা থেকে যে অমন মিহি মাখন আওয়াজ বেরোতে পারে, তা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল! "হাঁ, ইয়ে ভুলোবাবু, আমি আজ খান তিনেক ডিজাইন  এনেছি, একটা হলো গিয়ে 'অপূর্ব অতলান্তিক' ; মানে বুঝলেন কিনা, ওই সমুদ্র থিম....প্যান্ডেল হবে নীল...গায়ে থাকবে  অক্টোপাস, শার্ক ,নীল তিমি, চাই কি দুএকটা গোল্ড-ফিশ টিস্ ও  দিয়ে দেব। ফুল সব হবে ওয়াটার বেসড ,ওয়াটার লিলি, শালুক, পদ্ম ... কেটারিং ও আমাকেই দেবেন নিশ্চই, খাবার সব সামুদ্রিক খাবার, শার্কের পাখনার ঝাল, অক্টোপাসের চাটনি এই দুটো আমার স্পেশালিটি। একটা বিউটি পার্লারএর সাথে কন্টাক্ট তো আছেই , ওরা সোনাইকে মারমেইড আর আপনাকে পাইরেট সাজিয়ে দেবে, ব্যাস! দেখেবেন, লোকে একশো বছরেও ভুলবে না আপনাদের বিয়ের কথা!"

আমরা সবাই চুপ! রাজু একটা ঢোক গিলে বললো,"একশো কেন, হাজার বছরেও ভুলবে না! তা কলাদা, আপনার এই থিমটা আগে কোথাও করেছেন?"

কলাদা  অমায়িক হেসে বললেন "আরে, কি যে বলো! আমি তো সবে কালকে ডিসাইড করেছি যে এই ব্যাবসায় নামবো! এর আগে তো আমি ফুটবল কোচ ছিলাম। আমাদের ওখানকার স্কুল টিমের।"

আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, "ছেড়ে দিলেন কেন?"

"আর বলো কেন ভাই! এখনকার লোকেরা এক্সপেরিমেন্ট করা পছন্দ করে না! আমাদের স্কুল টীম আমি আসার  আগে পর পর দুবার ইন্টার-স্কুল জিতেছে, যে ছেলেটি গোল-কিপার সে নাকি একটি গোল ও খায়নি। কিন্তু আমি জানি ও খুব ভালো ডিফেন্ডার হতে পারতো যদি ওকে সুযোগ দেওয়া হতো! এদিকে আর  একটি ছেলে, যার মধ্যে গোল-কিপিং করার পোটেনশিয়াল রয়েছে, সে বসে আছে বেঞ্চে! তো আমি করলাম কি, একটা ম্যাচে গোল-কিপারকে মাঠে নামিয়ে ওই ছেলেটিকে কিপার করে দিলাম! ব্যাস! পরের ম্যাচে চাকরি গেলো! যাক যে, যা গেছে তা যাক! ভুলোবাবু  বলুন "অপূর্ব অতলান্তিক" কেমন লাগলো?"

রাজু হঠাৎ ফটাস করে জিজ্ঞেস করলো," ম্যাচের রেজাল্টটা বললেন না তো, কলাদা?"


কল্পতরু বাগচী কটমট করে রাজুর দিকে তাকিয়ে বললেন,"আমরা এখানে কি নিয়ে আলোচনা করছি হে ছোকরা? ভুলোবাবু মাফ করবেন, এইসব সিরিয়াস আলোচনা এইসব চ্যাংড়া ছোঁড়াদের নিয়ে হয় না!" অপূর্ব অতলান্তিক ছাড়াও আরো দুটো প্ল্যান আছে, একটা হলো 'হরেনডাস হিমালয়' আর একটা 'ডেলিসিয়াস ডেসার্ট'! যদি বলেন যে আলোচনা সিরিয়াসলি করবেন তো বলেন, আমি ডেসক্রাইব করবো। নাহলে আমি উঠছি!"

আমার পাপী চোখ বকুলের দিকে চলে গেলো হঠাৎই! দেখি ও পিছনদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে , কিন্তু ওকে দেখে মনে হচ্ছে ছেলে প্রবল হাসছে!

ভুলোদা তড়িঘড়ি বললেন , "অরে খামোখা চটেন কেন মশাই! বাচ্চা ছেলে, ছেড়ে দিন! আর ঐসব বিদেশী থিম টিম না, আমি মশাই খেটে  খাওয়া আম-আদমি, যদি একদম সাবেকি বাঙালি থিম কিছু থেকে থাকে তো বলুন। আর খরচটাও!"

 কল্পতরু বাগচী খানিক্ষন চোখ বুজে ভাবলেন দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে, তারপর বললেন, "একটা প্ল্যান আসছে মাথায় কিন্তু ফর্মুলেট করতে দুদিন লাগবে, দুদিন পরেই নাহয় আসবো  তাহলে?"

সেদিন অবশ্য ভুলোদা সবাইকেই রাতে খাইয়ে ছেড়েছিলেন। আর যাওয়ার আগে আমি আর রাজু বকুলকে সাইড করে ডেকে হাতে একটা সিগারেট গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কল্পতরুর কোচিং জীবনের কালান্তক ম্যাচের পরিনাম কি ছিল!

 '৭-০', বকুল হাসতে হাসতে  জবাব দিয়েছিলো," কলাদার কোচিং লাইফের  প্রথম এব্বং শেষ ম্যাচ!'

'এইবার বোঝা গেলো বুড়োদা", রাজু আমাকে বললো, "টাইটেল ডিফেন্ডাররা প্রথম ম্যাচে ৭ গোল খেলে কোচের অপূর্ব অতলান্তিক' ছাড়া আর লুকোনোর জায়গাই  বা কোথায় বলো!"

Wednesday, 28 February 2018

ডি ফর দেবদূত


বাবার দয়াই হোক আর মা কালি/কালীর দয়াই হোক, সেদিন ভুলোদার বাড়িতে মুখ ঝামটা খাবার পর থেকে আমার লেখাপড়া কিন্তু হেব্বি চলছে। এখন পড়তে পড়তে রাতে হাল্কা ঘুমিয়ে পড়লেই তো স্বপ্নে আরডিপি, এসআর আর অর্জুন স্যারের মুখ একসাথে ভেসে ওঠে আর ভয়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়তেও শুরু করে দিই। কাউকে বলবেন না, একদিন তো আবার ভয় পেয়ে...
যাইহোক, গ্ৰুপ ডির পরীক্ষার ফর্ম তুলতে গিয়েছিলাম সেদিন। এমনিতে তো চিরকাল ডি পেয়েই পাশ করেছি। এককালে তো ভুলোদার কাছে ডি ফর ডানহিলে সুখটান দিতে দিতে ডি ফর 'পিসির' আলোচনা চলতো। ভাগ্য ভালো থাকলে মানুষ যেমন মাঝে মাঝে সি বা বি পেয়ে যায় আমাদেরও তেমনি মাঝে মধ্যে চিকেন, বাটারনান জুটে যেত। সেই আমি গ্রূপ ডির ফর্ম তুলবো এ তো ভবিতব্য।
কিন্তু ওই কথায় আছে না, অভাগা যেখানে যায়, হিরোশিমা হয়ে যায়। আমারো হল তাই। দিব্যি দাঁড়িয়ে ছিলাম স্কোয়াডে, হঠাৎ উলটে গেলাম। চোখ খুলে দেখি হাসপাতাল। একে তো ক'দিন ভুলোদার হাতের অমৃত খাওয়া হয়নি, তারপর পড়াশুনা করেছি ঢের। অভ্যাস না থাকলে যা হয়।
হাসপাতালের খাবার দিয়ে গেছে। সে খাবার এত সুস্বাদু যে অজ্ঞান মানুষও আরেকবার জ্ঞান হারাবে। কিন্তু কী আর করা যাবে। ভুলোদা তো আমায় ভুলেই গেছে, এখন জীবনধারণের জন্য এই খাবারই খেতে হবে।
কিন্তু ওই যে বলেছি, ভাগ্য ভালো থাকলে মানুষ যেমন মাঝে মাঝে সি বা বি পেয়ে যায়। হঠাৎ দেখলাম  একটা রোগামত আলমারী, যার মাথায় একটা উলটানো বিরিয়ানির হাঁড়ি, তার উপর একটা পেল্লায় ঢাউস সাইজের হেডফোন আর হাতে আনন্দবাজার পত্রিকার সাইজের একটা ট্যাবলেট; এ যে আমাদের ভুলোদা ছাড়া কেউ হতেই পারে না তা আমি একটা ডানহিলের বাজি রেখে লিখে দিতে পারি।
আমি পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুঝলাম। ভুলোদা আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, 'ভালো আছ?'
একটু অবাক হলাম বই ভুলোদার আমায় 'তুমি' সম্বোধনে। কিন্তু মানুষ মারা গেলে যদি তার সম্মান আকাশচুম্বী হয় তবে শরীর খারাপ হলে একটু তো বাড়তে পারেই। চোখ বন্ধ করেই বললাম, 'হ্যাঁ'
-সকালে ব্রেকফাস্ট করেছ?
-আর ব্রেকফাস্ট। দেখছ তো কী দিয়েছে।
-রেস্ট নাও। যা ধকল গেল তোমার।
-হ্যাঁ
-তোমার সাথে পরে কথা বলব। রাখি তাহলে?
কানের কাছে কে যেন বলে উঠলো, 'ওরে পামর, চেয়ে দেখ। তুই কোথাকার কে! ভুলোদা ভুলোবৌদির সাথে কথা বলছে, তোর সাথে নয়।' বুকের ভিতর নাগাসাকি এসে পড়লো।
চোখ খুললাম। ভুলোদার মুখে সেই আদি অকৃত্রিম হাসি। যে হাসি কয়েক হপ্তা আগে মা কালির স্থানান্তরণের আগে পর্যন্ত দেখেছিলাম। ভুলোদা বলল, তাড়াতাড়ি সেরে ওঠ। আমার বাড়িতে তোর নেমন্তন্ন আছে।

ডি ফর ডেঞ্জারই হবে কে বলেছে? ডি ফর দেবদূতও হয় মাঝেমধ্যে।।

ভুলোদার প্রেম -২

ভুলোদাকে নিশ্চয়ই সক্কলের মনে আছে? আমার, রাজুর আর হীরুদার লোকাল গার্জেন ভুলোদা? যার হাতের লেগ-ফ্রাই খেয়ে পিসিমনির মাথায়  লেগ-ফ্রাই শিল্পের পরিকল্পনা এসেছিলো? তা এই ভুলোদা এতদিন ধরে আমাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবার আগামী ফাল্গুনে সরকারিভাবে হোম-মিনিস্টার ঘরে আনতে চলেছেন।

ভুল বুঝবেন না, আমরা তিনজন খুবই খুশি গোটা ব্যাপারটায়, কিন্তু কথা হোলো গিয়ে, একটু একটু করে নিজেদের দায়ভার নিজেদের বুঝে নিতে হচ্ছে। তার মধ্যে আমাদের হবু বৌদিমণির পাড়ার ছেলে বকুলব্রত বিশ্বাস ভুলোদার বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেছে। বকুলের একটা চাকরির দরকার, কলকাতায় থাকলে চাকরি-বাকরির সুবিধা,বৌদির সুপারিশে বকুল এসে ঢুকে পড়েছে একেবারে ভুলোদার রান্নাঘরে। ভুলোদার গোল্ড-ফ্লেক লাইট থেকে বিরিয়ানির লেগ-পিস্ এখন ওই পায়, আমাদের কপালে চা আর ব্রিটানিয়া মারি!

ভুলোদার বাড়িতে আজকাল আর যাওয়াও  যায় না! ভুলোদাকে আজকাল গান পেয়েছে! আর সে কি ভয়াবহ গান! ভুতের রাজা ছাড়া সে গান নেওয়ার ক্ষমতা এই দুনিয়ায় কারো নেই! প্রেমে পড়লে মানুষ একটু আধটু গান -টান গে, তাই বলে ক্রমাগত নাকি সুরে চিঁচিঁ ডাক ছেড়ে 'সখি ভাবনা কাহারে বলে!' উফফ ! হীরুদা তো বলেই দিয়েছে, সুর না, অসুর ভর করেছে ভুলোদাতে!


রাগ হওয়ার আরেক খান কারণ আছে আমার আর রাজুর! হীরুদা এর মধ্যে পাশের পাড়ার মোষ-খাটালে ম্যানেজারের চাকরি জুটিয়েছে, সামনের হপ্তায় জয়েনিং! সব্বার কিছু না কিছু ভালো হচ্ছেই! শুধু  আমাদেরি ফাটা কপাল! আমার একখান টুইশানি ছিলো, অনেক ধরে করে এবং ভুলোদার সুপারিশ কাজে লাগিয়ে পাড়ার সুন্দরী মামনি সুগন্ধাকে অঙ্ক কষাতে যেতাম। তা কবি মানুষ তো, চার বাই চার ম্যাট্রিক্স কষাতে গিয়ে সুগন্ধাকে নিয়ে চার বাই চার ছন্দে কবিতা লিখে ফেলেছিলাম ওরই খাতায়! পরের দিন সযত্নে বিদায়; চাকরি তো গেলোই.যে মাসটা পড়াতে গেছিলাম টাকাও পেলাম না!

রাজুটার হালও সমানভাবে খারাপ, বেচারা কাল বলছিলো প্রাইমারি স্কুলে চাকরির ফর্ম তুলতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে, ডাক্তার বেড-রেস্ট দিয়েছে! আগে হলে এইসব দিনে ভুলোদার বাড়ি গিয়ে পিসিমনির ভার্চুয়াল শ্রাদ্ধ করা যেত.... কিন্তু থাক, যা গেছে তা যাক!

আপাতত আমি আর রাজু গড়ের মাঠে বসে ঘাস ছিড়ছি, আর চিবুচ্ছি, আর গান গাইছি,'we shall overcome.." ওই যাঃ, গলায় ঘাস আটকে গেলো নাকি এই রে..এ যে কোথাও শান্তি নেই!


Sunday, 25 February 2018

ভক্তির বিপত্তি

নমস্কার, আমি হলাম শ্রীমান রাজর্ষি সরকার ওরফে রাজু। হীরুদা, সৌনকদা ওরফে বুড়োদা এবং আমি বস্তুতপক্ষে সেম খোঁয়াড়ের প্রোডাক্ট। বয়সে আমিই কনিষ্ঠ, তাই আদরে-যত্নে-সিনিয়রগিরির ঠ্যালায় গরু-কাম-বাঁদরের সংকরে পরিণত হয়েছি।

ভুলোদা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। বুড়োদার থেকে আপনারা ইতিমধ্যেই আমাদের প্রিয় ভুলোদার পরিচয় পেয়ে গেছেন। এটাও নিশ্চিত জেনে গেছেন যে আসছে শীতে ভুলোদার আর ভুলোবউদির (ভুলোবউদি বললাম বলে ক্ষেপচুনিয়াস হয়ে যাবেন না প্লিজ) চারহাত, চারপা, আটচোখ (বউদির চশমা আছে কি ছাই মনে পড়ছে না, না থাকলে না হয় একটা গগলস পরে নেবেন খন) সব এক হওয়ার দিন।

তা যাই হোক, ভুলোদার বাড়ি শেষ গিয়েছিলাম তা বেশ হপ্তাখানেক আগে। দেখলাম ভুলোদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধুচ্ছে। আমার দেখে-শুনে বেশ ভাল লাগলো। আগে ভুলোদা ঘরের ভেতরে একটা দেচকিতে হাত ধুত এখন অন্তত বাইরে এসে হাত ধুচ্ছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, 'ভুলোদা, হতে একটু জল দাও তো, মুখটা ধুয়ে নিই।' ভুলোদা কীসব আকাশ-পাতাল ভেবে ঘর থেকে অন্য একটা বোতল এনে বললে, 'এই নে, মুখ-টুখ ধুয়ে জুতো বাইরে রেখে ভিতরে আয়।' পরে জানতে পারলাম ওটা নাকি 'স্পেশাল গোমূত্র', আমাজন থেকে অর্ডার দিয়ে ভুলোদা আনিয়েছে। সেটাই দুয়ারের সামনে ছড়াচ্ছিল। শুনে আমার মাথায় লোডশেডিং হয়ে গেল। আমাদের লিডার, আমাদের  আদর্শ, কম্যুনিস্ট ভুলোদা শেষে গোমুনিস্ট হয়ে গেল!

কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো বসে রইলাম। ঘোর কাটতে দেখলাম ভুলোদা একটা সুন্দর আঁক কষা খাতায় কিসব লিখছে। আমি দেখতে গেলাম, ভুলোদা মানা করলো। বলল, 'স্নান করে আয় রাজু। পবিত্র মনে এসব দেখবি।' আমার তখনও হ্যাংওভার কাটেনি, স্নান করে আসাটাই বিধেয় মনে হল।

স্নান-টান করে এলাম। ভুলোদা তৈরি হয়েই ছিল। আমি বাবু হয়ে সামনে গিয়ে বসতেই আমার হাতে খাতাটা তুলে দিয়ে ভুলোদা বললে, 'যত্ন করে নে রাজু।' আমি হিয়ার (আমার প্রাক্তন চাপ) হাতের কথা মনে করে খাতাটা নিলাম, কোলে বসালাম, হাত বোলালাম বার কয়েক। তারপর খাতার দিকে তাকাতেই আমার চোখ মাউন্ট এভারেস্ট। সেই মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বসে দেখতে পেলাম ভুলোদা নামক সূর্যের থেকে সম্ভূত 'শ্রী শ্রী কালী মাতা সহায়' নামক রৌদ্রকিরণে বিগলিত হয়ে যাচ্ছে ধরার সব পাপ-তাপ-গ্লানি, ঝকমক করে উঠছে ভুলোদার ড্রয়িংরুমখানা!

'কী করেছো কি ভুলোদা!' আমি আঁতকে উঠলাম। ভুলোদা হাসিমুখে বলল, 'প্রতি লাইনে তিনবার, প্রতি পৃষ্ঠায় সাতাশ লাইন, দু'পাতায় একশ আটবার কালীনাম জপ! নে নে। দেরী করিস না। উচ্চারণ করে পড়া শুরু কর, দেখবি মন শুদ্ধ হয়ে যাবে।'

কি আর করা যাবে। পাল্লায় পড়েছি যখন, করতে তো হবেই। জোরে জোরে পড়তে শুরু করলাম। এতো মন দিয়ে সেমেস্টারের পড়া করলে এতদিনে একটা হিল্লে হয়ে যেত। যাইহোক, দ্বিতীয় পাতায় পৌঁছিয়েই আমি যেন ভক্তিরসের আধিক্য অনুভব করতে শুরু করলাম। প্রথম পাতার হ্রস্ব'ই' কালি দ্বিতীয় পাতায় দীর্ঘ'ঈ' কালীতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে ব্যাপারটাকে বানান ভুল ভেবে পাত্তা দিলুম না কিন্তু পরে দেখলাম ঐ পাতার প্রত্যেক কালী-ই দীর্ঘ'ঈ'। ব্রহ্মতালুতে কে যেন টং করে আঘাত করলো, আমিও আমার আধ্যত্ম চেতনার গভীরতম স্তরে উপলব্ধি করলাম অমোঘ সত্য। কে যেন কানের কাছে বলে গেল, 'ওরে পামর, চেয়ে দেখ। শ্রী শ্রী কালি মাতা সহায় ক্রমশ শ্রী শ্রী কালীইইইই মাতা সহায় তে পরিণত হয়েছে।' আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম ভক্তির ডাক যেন ট্রোপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, আয়োনোস্ফিয়ার ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কিন্তু কেন জানিনা আমার মনে হল ভক্তির ডাকটা ঠিক দেবলোকোস্ফিয়ারে পৌঁছচ্ছে না।

ভুলোদা যেন বুঝতে পেরেছিল ব্যাপারটা। তাই জিজ্ঞেস করল, 'লিখবি?'

আমিও যেন এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিলাম। বললাম, 'দাও।'

খাতা নিয়ে ভক্তিভরে লেখা শুরু করলাম। আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম কি করব। ভক্তিতরঙ্গকে আরও দুরত্ব অতিক্রম করতে হবে। তার মানে তরঙ্গের এনার্জি আরও বেশী হতে হবে। অর্থাৎ আরও উচ্চ স্বরের তথা উচ্চ স্বরবর্ণের সাহায্য নিতে হবে। তাই ঠিক পরবর্তী স্বরবর্ণ দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। ট্রায়াল এন্ড এরর মেথডে ঠিক করতে হবে।

ভক্তিরসে বিভোর হয়ে কতক্ষন লিখেছিলাম জানিনা। হঠাৎ ভুলোদা উঠে এসে বলল, 'দেখি কি লিখলি।' আমিও গদগদ চিত্তে খাতাটা এগিয়ে দিলাম, নিশ্চয়ই ভুলোদা আমার এক্সপেরিমেন্টে খুশি হবে এই বিশ্বাস রেখে।

ভুলোদা আর্কিমিডিসিয়ান 'ইউরেকা' আর্তনাদে চিৎকার করে উঠল, 'কী করেছিস!' আমিও ভুলোদার ভক্তিবাণী স্বর্গদুয়ারোস্ফিয়ারে পৌঁছানোর পন্থা আবিষ্কার করেছি ভেবে লাজুক 'ডারউইনিয়ান' হাসি হাসতে যাব এমন সময় চোখে পড়লো আরডিপি, এসআর আর অর্জুন স্যারের মুখ; কুটিল, বীভৎস, নৃশংস। যেন সেদিনের মতো আমায় বলছে, 'কি ভাবছো, পাশ করে যাবে!' বুঝতে পারলাম এক্সপেরিমেন্টটা এবারেও কেঁচিয়েছি।

-কী লিখেছিস!

-শ্রী শ্রী কালু মাতা সহায়। আমি মিনমিন করে বললাম। বস্তুতঃ স্বরবর্ণে, দীর্ঘ'ঈ'এর পর হ্রস্ব'উ'ই আসে।


পরমুহুর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম ভুলোদার বাড়ির বাইরে এবং দরজা সপাটে বন্ধ। হীরুদা তো পাড়ার মোষ-খাটালে মোষ নিয়ে বেজায় ব্যস্ত। তাই তাকে আর ঘাঁটাইনি। বুড়োদাকে বলতে গেলাম শুনলই না উলটে বললে আমি নাকি সেদিন বাবার দয়ায় হাই হয়ে ভুলোদার বাড়ি গিয়েছিলাম।


আমার দুঃখের কথা কেউই শুনলে না। এখন আপনাদের কোর্টেই বল রাখলাম। আপনারাই দেখুন।।

ভুলোদার প্রেম

ভুলোদার সাথে প্রথম আলাপ হয় কলেজের ইউনিয়ন অফিসে। হীরেনদা মানে হীরুদা বারদুয়েক আর আমি একবার টেস্টে ফেল করার পর পরের বছরও যখন পরীক্ষায় দায়িত্ব নিয়ে ধেড়িয়েছি,আমাদের তিননম্বর মক্কেল রাজু অর্থাৎ রাজর্ষি প্ল্যানটা দিয়েছিলো। রাজুটা এমনিতে ছেলে ভালো, পাস-টাস করে, তাও বেশিরভাগ সময়েই না টুকে! ওই বললো,"বুড়োদা, যা পরীক্ষা হয়েছে বলছো, পাস করবে বলে তো মনে হয় না, হীরুদাকে নিয়ে একবার ইউনিয়ন অফিসটা ঘুরে এসো, তোমরা কলেজে রয়ে গেলে আমার ডিগ্রী নিতে লজ্জা করবে,মাইরি বলছি!"

ভুলোদা তখন পার্টি করে।  কলেজ ছেড়ে বেরিয়েছে বহুদিন, তাও মায়া কাটেনি। এমনিতেও ভুলোদার মায়া একটু বেশি! আমার আর হীরুদার দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছিলো সেইদিনই! তারপর কলেজ শেষ হতে আমাদের চক্করে রাজুরও যখন কিস্যু চাকরি-বাকরি জুটলো না, আমাদের তিন বাপে খেদানো-মায়ে তাড়ানো বন্ধুর চা-সিগারেট থেকে মুরগি-মটন জোটানোর দায়িত্বটাও সযত্নে নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলো। আমরাও, সুবোধ ছেলের মতো কলেজ ক্যান্টিন থেকে ভুলোদার ড্রয়িং রুমে শিফট করে গেলাম!

কিন্তু এইবার মনে হচ্ছে সেই পাট চুকলো! তাই দুঃখের কাহিনী বলতে আসা, যদি সমব্যাথী পাওয়া যায়!

ভুলোদার তিনকূলে একটা খ্যাঁকখ্যাকে নেড়ি কুত্তা ছাড়া কেউ নেই; বিশাল মাইনের চাকরি করে, টাকা খরচের জায়গা পায় না, অসাধারণ রান্নার হাত! সময়কালে ভুলোদা মেয়েদের জায়গায় পার্টিকে বেশি সময় দিয়ে ফেলায় প্রেম-ট্রেমের অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে!

এহেন ভুলোদা কিছুদিন আগে তেত্রিশ বছর বয়সে প্রথম প্রেমে পড়েছেন ! আর পড়েছেন মানে কি! এক্কেরে পপাত চ এবং মমার চ! আমাদের মধ্যে হীরুদা অভিজ্ঞতা এবং লাল্টু চেহারার দৌলতে একখান প্রেম নামিয়েছে সফল ভাবে, আমার আর রাজুর কেবল দাগাই সার! সেই আমাদের ধরে বসিয়ে 'এক পলকে একটু দেখা' থেকে শুরু করে 'না না তুমি বলো' পর্যন্ত সঅঅব গল্প শোনানো দিয়ে ভুলোদার 'সস্নেহ' অত্যাচার শুরু হয়েছিল! এতদিনকার চিকেন-কষা আর ডানহিলের ঋণ শোধ করছি ভেবে ওগুলোকে হজম করছিলাম কোনোরকমে; হঠাৎ করে একদিন শুরু হলো ফোনাফুনি!

 আগে ভুলোদার ড্রয়িং রুমে কাশ্মীর সমস্যা থেকে শুরু করে পাড়ার কোন মেয়েকে কার সাথে কোথায়দ দেখা গেছে এইসব রসালো আলোচনার সাথে ভুলোদার হাতে তৈরি অমৃত সমান লেগ-ফ্রাইতে কামড় বসাতাম! এখন ভুলোদা আমরা গেলে পাড়ার মোড়ের দোকান থেকে আলুর চপ আনিয়ে দেয়, আর তারপর নিজে ছাতে উঠে যায় ফোন কানে দিয়ে! অপমান! অপমান!

তার মধ্যে ভুলোদা সিগারেট ছাড়বে বলে কথা দিয়েছে বৌদিকে,আপাতত 'রোজ খাওয়ার পরে একটা!' যার দৌলতে কোনোদিন সিগারেটের জন্যে এক পয়সা খরচ হয় নি, তাকে আজকাল গাঁটের কড়ি খসিয়ে কেনা সিগারেট খাওয়াতে হচ্ছে! যতক্ষণ ভুলোদা ফোন করে না, হোয়াটসআপ বাজতে থাকে টিং টিং! ভুলোদা নিজের নাম সার্থক করে আমাদের ভুলেই গেছে!

তার উপর ভুলোদার মাথায় চেপেছেন সাক্ষাৎ সরস্বতী! কাব্য-সরস্বতী ! আমি একটু লিখি-টিখি বলে আবার সেসব আমাকেই শুনতে হয়! 'বুইলে কিনা সৌনক,(আমার ভালো নাম; ভুলোদা আবার রাজনীতি করা মানুষ কিনা, সবাইকে তুমি করে কথা বলে আর ভালো নামে ডাকে!)আজ আরেক-খান ভাব মাথায় এলো; লোডশেডিং,ভ্যাপসা গরম.কিন্তু ও কথা বলছে বলে একদম ফুরফুরে বসন্ত লাগছে! নামিয়ে ফেলি কি বলো? ভ্যাপসা গরমটার ইম্পোর্ট্যান্স খানা বুঝছো তো?..'

আর ইম্পোর্ট্যান্স! বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে পাঁচ মিনিট ধরে ভুলোদার সাথে বাংলা সাহিত্যে উপেক্ষিত ভ্যাপসা গরমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার পর আমি তখন নিজের নামের ইম্পোর্ট্যান্স খানাই ভুলে মেরে দিয়েছি!

যাইহোক! এইসব কথা যেন ভুলোদার কানে তুলবেন না কেউ! বড়ো দুঃখে বলা এসব! আগামী ফাল্গুনে ভুলোদার শুভ-বিবাহ! কব্জি ডুব্বে সাঁটাতে হবে সেইসময়!                            

নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য