দিনকাল আর মোটেই ভালো যাচ্ছে না। চাকরিটা পেলুম আর কোথাকার কে বাদুর খেয়ে না কি, দুনিয়াটারই লকডাউন করে দিল! খবর ঠিক না ভুল বের করার চক্করে নিজেরাই এখন খবর হয়ে যাওয়ার জোগার। আগে যেখানে আমি আর খেঁদি রোজ আড্ডা দিতুম সেখানে এখন সপ্তাহে একটা করে ভিডিওকল। কাজ বলতে অমুক পার্টির তমুক লোকের স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা কথার সত্যি-মিথ্যে দেখা আর দিনরাত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মিম পাঠানো। কাল থেকে আবার তরজা লেগেছে। কে নাকি পোস্টারে 'অমুকবাবু জিন্দাবাদ' এর জায়গায় 'অমর রহে' লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে আর তাইই নাকি ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র।
পয়সাকড়ি মন্দ দিচ্ছে না। ঘরে বসে টাকা কামাও। কিন্তু তাতে কি আর আমাদের মতো বাউন্ডুলে লোকেদের মন ভরে? লকডাউন বন্ধ হতে ক'দিন আগে গিয়েছিলুম কলেজে। যে মাঠে বসে আমি, খেঁদি আর হীরুদা ঘাস ছিঁড়তুম সেখানে এখন আমাদের অনুপস্থিতিতে সাভানা জঙ্গল তৈরী হয়ে গেছে। কোনদিন হাতি কি জাগুয়ার বেড়িয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
হীরুদার পদোন্নতি হয়েছে। ছোট কালো মোষ ছেড়ে বড়ো মিশ-কালো মোষ ধোয়ার দায়িত্ব পেয়েছে। এবার ম্যানেজারের পদে গেলেই আর কাজে যেতে হবে না। অনলাইনে জুনিয়রদের মোষ ধোয়ানো শেখাবে। কথা হয়, যেটুকু ফোনে ফোনে। বকুলব্রত মাঝখানে লকডাউনের সুযোগে ক'দিন দোকানের কাজ ছেড়ে বড়ো বড়ো আবাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ডাবল দামে বাজার করে দিচ্ছিল আবাসনের লোকেদের। তাতে দু'পয়সা পেয়ে আর যোগাযোগ রাখেনি তেমন। কল্পতরু মিস স্যান্ডাকে নিয়ে ভুলোদার পাড়ায় চলে গিয়েছিল শুনেছিলাম। আর কোন খবর রাখা হয়নি।
এইসব নিয়েই কথা হচ্ছিল খেঁদির সাথে। এই লকডাউনের বাজারে খেঁদি একটা প্রেম নামিয়েছে। সেকথা আরেকদিন হবে নাহয়। এই ডিসেম্বরে বিয়ে, দিন দশেক পরে। তো সে তার সাথেই একটু বাইক-বিহারে সন্ধ্যার হাওয়া খেতে যাবে। সন্ধ্যার কথায় মিস স্যান্ডাকে মনে পড়লো। বুকের বামদিকটায় মোচড় দিয়ে উঠল খানিক। খেঁদিকে বিদায় জানিয়ে আমি পাড়ি জমালাম একলাই।
এমন সময় ফোনে বেজে উঠল মিকিভাইয়ের নাম্বার। বিয়ের পর মিকিভাইয়ের বাড়িতে কার্তিক ফেলার প্ল্যানটা প্ল্যানই থেকে গিয়েছিল। লকডাউনে পুলিশ টস জিতে এমন ব্যাটিং শুরু করেছিল কেউ আর কার্তিক নিয়ে ফিল্ডিং দেওয়ার সাহসই পায়নি। তবে এতদিন পরে ফোন করছে যখন সুসংবাদই হবে।
কিন্তু ফোন ধরে যা বুঝলাম তাতে সুসংবাদ তো মনেই হলো না। বরং গভীর দুঃসংবাদই বোঝা গেল। আমাকে এখনই ছুটতে হবে পুলিশ স্টেশনে। সাথে খেঁদি থাকলে বরং কাজে দিতো, ম্যানহোলের ঢাকনা চোর ধরার পর ভালোই ওঠাবসা হয়ে গিয়েছিল পুলিশের সাথে। সব হতচ্ছাড়া নচ্ছরগুলো বিপদে পড়লে কি আমারই ফোনে শুধু নেটওয়ার্ক থাকে!
থানায় ঢোকার মুখেই দেখা হয়ে গেল মিস স্যান্ডার সাথে। ওর বাবার সাথে বেড়িয়ে আসছে থানা থেকে। পিছনে গুচ্ছের পুলিশ। যেন আসে পাশের সব থানার পুলিশ ভীড় করেছে এই থানায়। আমার মনটা কেমন মাতাল-চিংড়ি মাতাল-চিংড়ি হয়ে গেল। আমাদের সেই মিস স্যান্ডা, দু'বছর আগের মিস স্যান্ডা এখন আরও তন্বী হয়েছে। কোঁকড়ান ভেজা চুলে তাকে আরও মোহময়ী লাগছে। পুলিশ স্টেশনেও স্নানের এরকম ব্যবস্থা থাকে! আমার বাথরুমে কলটা খারাপ হয়ে গেছে। টয়লেটের জেট-স্প্রে দিয়ে স্নান করছি বিগত সাতদিন। মিস স্যান্ডা কি রোজ এখানে স্নান করতে আসে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল মিকিভাইয়ের কথা। মিস স্যান্ডা বেড়িয়ে আসছে তো মিকিভাই কোথায়! সব ভুলে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলাম থানার ভেতরে।
থানায় ঢুকে দেখলাম একটা চেয়ার অতিকষ্টে মিকিভাইয়ের পাহাড়প্রমাণ ভার ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। দু'বছর আগের কল্পতরু বাগচী লকডাউনের বাজারে কল্পবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সারাদিনের ধকলের ছাপ চোখে-মুখে। ভেটকি পাতুরিতে কেলিয়ে যাওয়া ভেটকির মতোই গা এলিয়ে দিয়েছে চেয়ারে।
পুলিশি কাজকর্ম সেরে বেরুতে বেরুতে সন্ধ্যে সাতটা। এতক্ষণ মিকিভাই একটাও কথা বলেনি। কী হয়েছিল জিজ্ঞেস করতে যাবো এমন সময় মিকিভাই নিজেই জিজ্ঞেস করল, "বেইজিং যাবি?" বুঝলাম পুলিশের প্যাঁদানি খেয়ে নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়েছে মিকিভাইয়ের।
-বেইজিং! তোর কী মাথা খারাপ হয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভ চলছে আর থানা থেকে ছাড়া পেতে না পেতেই তোকে বেইজিং যেতে হবে!
-আরে যাবি কিনা বল। আমি যাচ্ছি।
বলাবাহুল্য, আমার কেন জানিনা মনে হলো মিকিভাই সিরিয়াস। তাই মিনমিন করে বললাম, "কিন্তু আমার তো পাসপোর্ট নেই!"
-বেইজিং রেস্টুরেন্ট। তোপসিয়ায়।
আমার আশায় নিমপাতা বেঁটে দিল একবারে! হায়রে, ল্যাম্পপোস্টকে আমি লাইটহাউস ভেবে নিয়েছিলাম! যাইহোক, মিকিভাইয়ের ঘাড় ভেঙ্গে খাওয়াটা বেশ ভালই হবে ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। একটা উবার ট্যাক্সি ডেকে রওনা দিলুম বেইজিংএর পথে।
(ক্রমশ)
পুনশ্চঃ খেঁদি কোন নতুন চরিত্র নয়, বরং পুরানো একটি মুখ্য চরিত্রই। বাংলা সাহিত্যে বিড়ম্বনাময়-উৎপটাং ছেলেদের ভীড়ে মেয়ে চরিত্র যথেষ্ট দুর্লভ। অথচ আজকালকার সমানাধিকারের যুগে যেখানে ছেলে-মেয়েরা সাবলীলভাবে মেলামেশা করতে পারে সেখানে একদল চ্যাংড়ার ভীড়ে একটা চিংড়ী থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আর যখন পুরো সিরিজটার অন্য সৃষ্টিকর্তা নিজে একজন মেয়ে, তখন গল্পের মুখ্য চরিত্রে একজন চিংড়ী থাকাটা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই প্রয়াসেই 'বুড়োদা' চরিত্রটির নাম পরিবর্তন করে খেঁদি রাখা হয়েছে। বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিল খেয়া। কিন্তু আমাদের মতো অকালকুষ্মন্ড জুনিয়রের দয়ায় খেয়াদি>খেঁদি হয়ে গেছে।
No comments:
Post a Comment