Tuesday, 14 January 2020

ভুলোদার ল্যাজ এবং ভৌস্তক গাঙ্গুলি

দেশলাইদার এপিসোডটার পরে অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। ভুলো দাদা-বৌদি  এখন সব ভুলে  সংসারে মন দিয়েছে, হীরুদা আর সুচিস্মিতাদি ব্যস্ত বিয়ের প্ল্যানিং-এ।  মিকিভাই আর স্যান্ডার বৈবাহিক জীবনে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় মিকিভাই মনের দুঃখে বনবাস নিয়েছে, বকুলব্রত একটা কেমিকাল ফ্যাক্টরিতে বাসন ধোয়ার কাজ পেয়েকদিন খুব বাকতাল্লা দিয়ে আপাতত কি কারণে আন্ডারগ্রাউন্ড।

আমি আর রাজু কেমন আছি? তা ভালোই, ওই আপনাদের  দয়ায় চলে যাচ্ছে কোনো মতে আজ্ঞে, হেঁ হেঁ ! একখান চাকরি জুটাইসি, দুইজনাতেই! হ্যাঁ বড়দা, এই বাজারে! এক্কেরে হাতে গরম চাকরি!

দেশলাইদা তার কথা রেখেছিলেন, ভৌস্তকদার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। সে এক রোববারের সকাল, ভৌস্তকদা তাঁর সাদা চারতলা বাড়ির তিনতলার দক্ষিণখোলা বারান্দায় একটা আরামকেদারায়  বসে লুচি সহযোগে মাংসের ঘুগনি গলাস্থ করছিলেন।  সামনের চায়ের টেবিলে  তিনটে বাংলা আর দুটো ইংরেজি খবরের কাগজ খোলা।  ভদ্রলোকের সৌখিনভাবে কাটা চুল, দেওয়াল জুড়ে বই আর বই,  কি ভাষায় লেখা যে সেটা ঠিক বুঝলুম না! চোখের চশমা থেকে সোনা ঝিলিক মারছে মনে হলো।

" ও দেশলাইদা, এ কোন পার্টির বলেছিলেন? করে খাও? করে খেলে এত কিছু করা যায় ? " -ফক্কর রাজুটার কিছু একটা বলা চাই-ই চাই! ভাগ্গিস গলা নামিয়ে বলেছে!

দেশলাইদা এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালেন, মনে হলো উনি স্কোফিল্ড না হয়ে বামুন হলে রাজু ভস্ম হয়ে যেত আজ! ভাগ্গিস দেশে এখনও সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়নি!

আমি আস্তে করে বললুম, "দেখে শুনে করতে হবে, বুঝলি কিনা! তালে সব-ই হবে, কি বলেন সাইকেলদা?"

পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে আমরা দেখলাম কাঁসার থালা থেকে একটা একটা করে ফুলকো লুচি গায়েব হতে, সঙ্গে বাজারি-আনন্দ কাগজটার ১০ খানা পাতা উল্টোতে! আমাদের এক কাপ চাও জোটেনি এতক্ষন ! তিনজনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি একটা বেতের সোফায়, ভৌস্তকদার উল্টোদিকে। রাজুর স্বভাব নখ খাওয়া, ওর ডান হাতের অনামিকা থেকে কড়ে আঙুলের নখ সব শেষ। ভৌস্তকদা কাগজটা বন্ধ করলেন, তারপর ওই কাগজেই হাত মুছে ওটাকে পাশের ডাস্টবিনটায় ফেলে দিয়ে বললেন, "কাগজগুলো আজকাল পড়া যায় না! এহে! কদিন ছিলাম না দেশে, তার মধ্যেই নাড়ুদা  আর মিতুদা মিলে দেশটা শেষ করে দিলো হ্যা! ছ্যাঃ ছ্যাঃ!"

 দেশলাইদা দেখি পাশে বসে ঘাড় দোলাচ্ছে ছ্যাঃ ছ্যাঃ'র তালে তালে! তারপর বললো, "তা কবে আইলেন , ভৌস্তকদা ? পুঁতেদাদার খবর কেডা  ? "

-"ভালোই, সাইকেলভায়া, ওদিকে সবই ভালো! এই বয়সেও কি দাপট বলো তো পুঁতেদার ? আহা ! ডনিকে এক্কেরে মুঠোয়  করে রেখেছে! তা তোমার খবর কি? সঙ্গে এই দুইজন কে? "

-"ভুলাদারে মনে আসে, দাদা ? এনারা ভুলাদাদার ভাই! একখান চাকরি খুইজতাসেন, তা বাজারের অবস্থা জা "

হটাৎ থামিয়ে দেন ভৌস্তকদা দেশলাইদাকে,

-"বলো কি হে? ভুলোদার ভাই তোমরা? আগে বলবে তো ! ওরে লক্ষণ, লুচি নিয়ে আয়, লুচি নিয়ে আয়! ভুলোদার ভাইদের এতক্ষন বসিয়ে রেখেছি আমি..."

বিলাপ চলতে থাকে আরও কিছুক্ষনের জন্য ভৌস্তকদার! পরে লুচি, ঘুগনি এবং চা সহযোগে জানা যায় যে ভুলোদাই হাতে ধরে ভৌস্তকদাকে 'করে খাও'- তে ঢুকিয়ে ছিল! তার পর নিজে আর বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেনি, বড় বেশি মায়া ছিল কিনা কলেজের ইউনিয়ন রুমের ওপর! ভুলোদার ল্যাজ ধরেই করে খেতে শুরু করেন ভৌস্তকদা, এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের নেতা বনে যান পার্টির! কিন্তু তখনি হয় সমস্যা! উনি নাকি এত ভালোবাসা পেয়েছিলেন যে ওনাকে  রাজনীতি করাই ছেড়ে দিতে হয়!  শুধু পার্টি না, পার্টির বাইরেও নাকি ভৌস্তকদাকে সক্কলে খুব ভালোবাসে! রাশিয়ার পুঁতেদা, আমেরিকার ডনি থেকে দেশের নাড়ুদা, মিতুদা, টানিদি, এমনকি পিসিমনিও নাকি ভৌস্তক বলতে অজ্ঞান! সবাই এত ভালোবাসে ওনাকে, যে উনি "করে খাও" করাই  ছেড়ে দিয়েছিলেন পিসিমনি রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরে, "মানুষের ভালোবাসাটাই সব, কি বলো ? "

আমরা একটু হেঁ হেঁ করলাম ওনার কথায়! এই লোকগুলো, ডনি, ব্যারি, পুতেদা, নাড়ুদা এরা যে কারা, তাই বুঝছিলাম না।  কিন্তু পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, অতএব ঘাড় নেড়ে মেঝেতে মাথা ঠুকে গেলেও ভৌস্তকদার সব কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম!

"হুম! তা তোমাদের চাকরি চাই, তো? খবরের ওয়েবসাইট চালাতে পারবে?  এই যে বাজারি-আনন্দ, খবর রোজকার, কাল আর আজ, এমন কি এই টেলিগ্রামও এখন হয় নাড়ুদা কিনে রেখেছে, নয় তো পিসিমনি! আমি যেহেতু এদের সবাইকে সমান ভালোবাসি, আমি নিরপেক্ষ সংবাদ  পৌঁছে দিতে চাই বাংলার ঘরে ঘরে! একটা অনলাইন নিউজ দিয়ে শুরুটা করতে চাই! তোমরা দুজন আছো, ইয়াং ব্লাড, একটু দাঁড় করিয়ে দাও ওয়েবসাইটটা ! টাকা যা লাগে পাবে, পারমিশন সব হয়ে যাবে,  কিন্তু হার্ড ওয়ার্ক সব তোমাদের!খবর জোগাড়, তার সত্যতা বিচার, ওয়েব কনটেন্ট রেডি করা! পারবে? "

আমরা থতমত খেয়ে গেছি! চাকরিটা পেয়ে গেলাম কি?
-"কিহে, পারবে? "

কমদিন তো আর বেকার ছিলাম না, ঘরে বসে বসে বাপ-মার টাকায় আর কিছু না হোক কম্পিউটার-এর কোর্স আমি রাজু দুজনেই অনেক করেছি!  আর লেখার হাত কারোরই নেহাত খারাপ নয়, সে তো আপনারা জানেনই 'ভুলোদা সিরিজে'র র দৌলতে!সুতরাং, টুক করে ঘাড় নেড়ে দিলুম!

-"এই তো! আরে ভুলোদার ভাই যখন, তখন তো তৈরী ছেলে! মাসে আপাতত হাজার পঁচিশ করে দেব, তারপর যদি সাইটের কাটতি ভালো  হয়, তখন কমিশন! রাজি?"

জীবনে চাকরি পাবো এই আশাটাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, দুজনেই! একটা করে ডিগ্রী আছে, গুচ্ছের ডিপ্লোমাও! কিন্তু চাকরিটা যে শেষে ভুলোদার দৌলতে হবে এটা  ভাবিনি! কেমন একটা ঘোরের মধ্যে বেরিয়ে আসছিলাম ভৌস্তকদার প্রাসাদপদম বাড়ি থেকে, মনের মধ্যে থেকে ভসভসিয়ে গান বেরিয়ে এলো , "চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা-"

-"ধ্যাৎ! তোমার বেলা নেই, থামো তো!" রাজু হটাৎ করে বলে উঠলো।

মনটাই বিগড়ে গেলো! অপদার্থ একটা, লোকের খুশি সহ্য হয় না! চাঁটিটা তুলেইছিলাম, কিন্তু ওর পরের কথাটা শুনে আটকে গেলো হাতটা ! রাজু  দেশলাইদাকে জিজ্ঞাসা করছে, "সবই তো হলো, কিন্তু এই পুঁতেদা, ডনি, নাড়ু, মিতু, টানি এরা কারা ? "

"পুঁতেদা হইলেন রাশিয়ার  কীতিমির পুতিন,  ডনি আমেরিকার ডোনাল্ড বাম্প,  নাড়ুদা আমাগো প্রাইম মিনিস্টার, 'লুইট্যা খাও' এর  নরেন্দ্র গোবুদ্ধি, টানিদি মানে বইস্যা  খাও-এর টানিয়া বান্ধি,   আর মিতুদা হইলো ওই লুইট্যা খাও-এরই  'মোটা ভাই',  কেমিতরো  বাহ্।  ভৌস্তকদারে কি যে সে লোক পাইসো ভায়া! এ হইলো ভৌস্তক গাঙ্গুলি! হেঁ হেঁ !"



নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য