হীরুদা
মোষ খাটাল জয়েন করার কয়েকদিন পরের ঘটনা। হীরুদা তো যা হোক এখন তাও খাটালের
খেয়ে খাটালেরই মোষ তাড়াচ্ছে, আমার আর রাজুর পকেট ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি। তা
রাজুও দুদিন ধরে বেপাত্তা, ফোন করলে বলে,'বুড়োদা, ফালতু জ্বালিও না, চাকরির
জন্যে পড়াশোনা করছি!' অগত্যা পাড়ার মোড়ে ক্লাবের রকে বসে একা একাই বিকেল
কাটাচ্ছি আর বিড়ি টানছি; মনে আশা একটু পর সুগন্ধা যাবে সামনের রাস্তা দিয়ে
পড়তে, তার পর উঠবোখন!
তা সুগন্ধাকে আসতে দেখে চটপট বিড়িটা ফেলে পকেট
থেকে নোটবই বার করে একটা আঁতেল আঁতেল ভাবালু মুখ নিয়ে খুব গম্ভীর ভাবে সাদা
পাতার দিকে তাকিয়ে আছি আর আড়চোখে ঝাড়ি মারছি, ফোনটা তারস্বরে গান গেয়ে
উঠলো-'বাবা আমার কি বিয়ে হবে না!'; সুগন্ধা তখন ঠিক সামনে দিয়ে যেতে যেতে
আমার দিকে একটা 'এহেহে' মার্কা লুক দিয়ে গেলো! ব্যাস! প্রেস্টিজে
গ্যামাক্সিন! রিংটোনখানা ইমিডিয়েট পাল্টাতে হবে! আর কোন হতভাগার ঠিক এই
সময়ে আমাকে দরকার পড়লো! নিশ্চই অক্কমার ঢেঁকি রাজুটার ! এইসব ভেবে টেবে
চরম বিরক্তির সাথে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আমি অবাক!
ভুলোদা!
ভুলোদা ফোন করেছে! আমায়! মাসদুয়েক পরে! বৌদির নাম আমার নামের কাছাকাছি;
বৌদিকে ডায়াল করতে গিয়ে আমায় করেনিতো? এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা
তুললাম,'ভুলোদা, বলো বলো, আদ্দিন পর মনে পড়েছে ভাইকে!'
ওপাশ থেকে
ফাটা কাঁশির মতো গলায় আওয়াজ এলো,"ভুলোদা নোই, আমি বকুল বলছি। ভুলোদা বললো
রাজুদা আর হিরুদাকে জুটিয়ে রাত্তিরে চলে আসতে, কাজ আছে। "
আমি
হ্যাঁ না কিছু বলার আগেই কট করে ফোন কেটে দিলো বকুলব্রত। ভুলোদার পেয়ারের
পাড়াতুতো শালা। রাগে গজগজ করতে করতে উঠে পড়লাম রক থেকে। বকুলটার আস্পদ্দা
বড্ডো বেড়েছে। ভুলোদাই বাড়িয়েছে ওকে! হতচ্ছাড়া বানর! মর্কট! কপি! অখাদ্য
বাঁধাকপি একটা!
যতই যাই হোক. ভুলোদার ডাক অগ্রাহ্য করার
ক্ষমতা এখনো আমার, রাজুর, হীরুদা কারোর নেই। অতএব, আটটা বাজার আগেই
তিনমূর্তি একজোট হয়ে ভুলোদার বৈঠকখানায় সোফাসীন হয়ে গুলতানি মারছি আজ
অনেকদিন পর। সঙ্গে শুকনো চানাচুর। ভুলোদা, বকুল কেউ বাড়িতে নেই, আমাদের
সক্কলের কাছে এবাড়ির একটা করে চাবি আছে, তাই নিজেরাই নিজেদের আতিথ্যে বরন
করে নিয়েছি। রান্নাঘর আর ফ্রিজ ঘেটে দেখাও হয়ে গেছে, কিন্তু ওবেলার ডাল
ছাড়া কিছু ছিল না। অগত্যা চানাচুর এবং পিএনপিসি চলছে পুরোদমে।
ঠিক
পিএনপিসি না, হীরুদা নিজের কথাই বলছিলো। শুচিস্মিতাদি নাকি খুব খুশি মোষ
-খাটালে হীরুদা চাকরি পাওয়াতে । সে তো চাকরি পেয়ে গেছে আজ বছর দুয়েক হল ,
কোনোক্রমে বিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিলো। এইবার নাকি হীরুদার সাথে মা-বাবার দেখা
করাবে। ভালো ভালো! সবার ভালো হোক , সবার বিয়ে হোক! রিং-টোনটা চেঞ্জ করবো
না, ডিসিশন নিলাম। অতি সত্য কথা কৈছে ওটা!
আধঘন্টা ধরে হীরুদার ভ্যাজভ্যাজানি শুনে প্রায় বিরক্ত হবো হবো করছি, এমন সময় গ্রিল দরজা খোলার আওয়াজ!
আমরা
তিন মক্কেল সচকিত! রাজু একটু আগেই বলছিলো,"ভুলোদার সাথে একটা বোঝাপড়ার
দরকার আছে, প্রেম করছে বলে আমাদের এইরকম ইগনোর মারতে পারে না লোকটা!"
কিন্তু বেড়ালের গলায় প্রর্থম ঘন্টাটা কে বাঁধবে, সেইটা এখনো ঠিক হয়ে ওঠেনি!
কিন্তু এরপর যা ঘটলো, তাতে ওসব বেমক্কা মাথা থেকে ধাঁ! এক্কেরে আবির্ভাব ঘটলো ধরাধামে ইয়ে থুড়ি ভুলোধামে, এক মহাপুরুষের!
প্রথমে
পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকেছিলো খ্যাংরাকাঠী বকুল, তার পিছনে শান্তিনিকেতনি ঝোলা
কাঁধে বিপুল বপু আমাদের ভুলোদা। আর তার পর? তারপর যেজন প্রবেশিলো, তাহারে
বর্ণনা করিবার ভাষা মোরে ঈশ্বর দেন নাই! উপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাহার সকলি
ছেচল্লিশ! [হরিণঘাটা ফার্মে এক-প্রজাতির জীব সযত্নে লালিত-পালিত হয়, অনেকটা
তাদের মতো গড়ন!] চুলে ফুটবলার ছাঁট, ঘাড় থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত সব
লেপে-পুছে ছাটা, তার উপরে যেকটি রয়েছে, জেল-লেপিত হয়ে তারা স্পাইকের মতো
উর্দ্ধগামী! চোখে অধুনালুপ্ত গোল চশমা, গায়ে হাফ-শার্ট, যার বোতাম গুলো
ছিঁড়ে যেতে যেতেও যায়নি! পরনে টাইট হাফপ্যান্ট, তাতে লেখা 'ম্যান,ইউ!' হাতে
একখানা লাল ফাইল, তার ভেতর থেকে কিছু কাগজ উঁকি মারছে!
আমি থ! হীরুদার চোখ সকেট থেকে বেরিয়ে আসি আসি! রাজুর মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে অট্টহাসি চেপে আছে!
ভুলোদা
অমায়িক হাসি হেসে বললেন," এই তো, হীরেন, সৌনক, রাজর্ষি তোমরা এসে গেছো
দেখছি! বসো, বসো!" আমরা উঠে দাঁড়িয়েছিলাম বোধহয় ওদের দেখে, ঠিক মনে
নেই,"ইনি হলেন কল্পতরু বাগচি, ওরফে মিকিভাই; বকুলের পাড়ার মানে তোমাদের
বৌদির পাড়ার স্বনামধন্য ডেকোরেটার! ভাবছি বিয়ের প্যান্ডেল ওইসব দায়িত্ব
এঁনাকেই দেব-"
ভুলোদা আরও কিছু বলেছিলো হয়তো, কিন্তু কানে
আসেনি আমার। আমি আর হীরুদা তখন রাজুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, বেচারা
এত কাশছিলো যে প্রায় প্রাণ বেরিয়েই যায় এমন অবস্থা!
কল্পতরু বাগচি ওরফে মিকিভাই ততক্ষনে জাকিয়ে বসেছেন গদি আঁটা বড়ো চাকা লাগানো চেয়ারটায়, যেটাতে কেনা ইস্তক ভুলোদা ছাড়া কেউ বসেনি!
রাজুর মাথায় চড়চাপাটি মেরে ওকে তো কোনোক্রমে সামলালাম। বকুল ততক্ষনে
গেস্ট-স্পেশাল চায়ের কাপ বের করে তাতে চা নিয়ে এসেছে; মিকিভাই পায়ের উপর পা
তুলে বসে সুরুৎ সুরুৎ করে তাই পান করছেন। ভুলোদা খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক
তাকিয়ে শেষে সোফার উল্টোদিকে রাখা একটা টুলের উপর বসেছেন। আমরা তিনজন সোফায়
; ঘরে কেমন একটা শ্মশানের শান্তি বিরাজ করছে। মিকিভাই তাঁর গোল চশমা
সামান্য নামিয়ে সেই ফাঁক দিয়ে আমাদের তিনজনকে জরিপ করছেন। আমি দেখলুম
হীরুদা নিজের একমনে ভুলোদার ঘরে ঝোলানো রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে
দাঁত দিয়ে নখ কাটছে, আর রাজু ভুরু কুঁচকে দেখছে মিকিভাইকে। হঠাৎ উড়ে এসে
এইরকম ভুলোদার চেয়ার জুড়ে করে বসাটা ওর মোটেই পছন্দ হয়নি। ভুলোদা টুলে ঠিক
স্বস্তি পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না, বারবার নড়েচড়ে বসছেন আর উসখুস করছেন,
যেন কিছু একটা বলতে চান কিন্তু আমাদের তিনজনের অবস্থা দেখে বলার সাহস
পাচ্ছে না!
বকুল আমাদের জন্যেও চা নিয়ে এসেছে, শেষে নিজে
এককাপ নিয়ে এসে দরজায় হেলান দাঁড়ালো; তারপর ওই কথা শুরু করলো;" হুম,
কলাদা, ভুলোদাকে দেখাও ডিজাইন গুলো!"
'কলাদা!' আমি হিরুদার দিকে তাকালাম, সে তখনও নখ খাচ্ছে।
রাজু
আমার দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে মিকিভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল 'হ্যাঁ
,কলাদা ,দেখান কি প্যান্ডেলের ডিজাইন হবে টবে , আমরাও একটু দেখি ।'
ভুলোদা
টুলের উপরেই নড়েচড়ে বসলেন আর একবার। তাঁর চোখে মুখে বেশ একটা লজ্জা লজ্জা
আগ্রহ ফুটে উঠেছে, ঠোঁটে হালকা একটা উত্তমকুমারমার্কা লাখটাকার হাসি!
মিকিভাই
এই প্রথম কথা বললেন, অমন বরাহসুলভ চেহারা থেকে যে অমন মিহি মাখন আওয়াজ
বেরোতে পারে, তা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল! "হাঁ, ইয়ে ভুলোবাবু, আমি আজ খান
তিনেক ডিজাইন এনেছি, একটা হলো গিয়ে 'অপূর্ব অতলান্তিক' ; মানে বুঝলেন
কিনা, ওই সমুদ্র থিম....প্যান্ডেল হবে নীল...গায়ে থাকবে অক্টোপাস, শার্ক
,নীল তিমি, চাই কি দুএকটা গোল্ড-ফিশ টিস্ ও দিয়ে দেব। ফুল সব হবে ওয়াটার
বেসড ,ওয়াটার লিলি, শালুক, পদ্ম ... কেটারিং ও আমাকেই দেবেন নিশ্চই, খাবার
সব সামুদ্রিক খাবার, শার্কের পাখনার ঝাল, অক্টোপাসের চাটনি এই দুটো আমার
স্পেশালিটি। একটা বিউটি পার্লারএর সাথে কন্টাক্ট তো আছেই , ওরা সোনাইকে
মারমেইড আর আপনাকে পাইরেট সাজিয়ে দেবে, ব্যাস! দেখেবেন, লোকে একশো বছরেও
ভুলবে না আপনাদের বিয়ের কথা!"
আমরা সবাই চুপ! রাজু একটা ঢোক গিলে বললো,"একশো কেন, হাজার বছরেও ভুলবে না! তা কলাদা, আপনার এই থিমটা আগে কোথাও করেছেন?"
কলাদা
অমায়িক হেসে বললেন "আরে, কি যে বলো! আমি তো সবে কালকে ডিসাইড করেছি যে এই
ব্যাবসায় নামবো! এর আগে তো আমি ফুটবল কোচ ছিলাম। আমাদের ওখানকার স্কুল
টিমের।"
আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, "ছেড়ে দিলেন কেন?"
"আর
বলো কেন ভাই! এখনকার লোকেরা এক্সপেরিমেন্ট করা পছন্দ করে না! আমাদের স্কুল
টীম আমি আসার আগে পর পর দুবার ইন্টার-স্কুল জিতেছে, যে ছেলেটি গোল-কিপার
সে নাকি একটি গোল ও খায়নি। কিন্তু আমি জানি ও খুব ভালো ডিফেন্ডার হতে পারতো
যদি ওকে সুযোগ দেওয়া হতো! এদিকে আর একটি ছেলে, যার মধ্যে গোল-কিপিং করার
পোটেনশিয়াল রয়েছে, সে বসে আছে বেঞ্চে! তো আমি করলাম কি, একটা ম্যাচে
গোল-কিপারকে মাঠে নামিয়ে ওই ছেলেটিকে কিপার করে দিলাম! ব্যাস! পরের ম্যাচে
চাকরি গেলো! যাক যে, যা গেছে তা যাক! ভুলোবাবু বলুন "অপূর্ব অতলান্তিক"
কেমন লাগলো?"
রাজু হঠাৎ ফটাস করে জিজ্ঞেস করলো," ম্যাচের রেজাল্টটা বললেন না তো, কলাদা?"
কল্পতরু
বাগচী কটমট করে রাজুর দিকে তাকিয়ে বললেন,"আমরা এখানে কি নিয়ে আলোচনা করছি
হে ছোকরা? ভুলোবাবু মাফ করবেন, এইসব সিরিয়াস আলোচনা এইসব চ্যাংড়া ছোঁড়াদের
নিয়ে হয় না!" অপূর্ব অতলান্তিক ছাড়াও আরো দুটো প্ল্যান আছে, একটা হলো
'হরেনডাস হিমালয়' আর একটা 'ডেলিসিয়াস ডেসার্ট'! যদি বলেন যে আলোচনা
সিরিয়াসলি করবেন তো বলেন, আমি ডেসক্রাইব করবো। নাহলে আমি উঠছি!"
আমার পাপী চোখ বকুলের দিকে চলে গেলো হঠাৎই! দেখি ও পিছনদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে , কিন্তু ওকে দেখে মনে হচ্ছে ছেলে প্রবল হাসছে!
ভুলোদা
তড়িঘড়ি বললেন , "অরে খামোখা চটেন কেন মশাই! বাচ্চা ছেলে, ছেড়ে দিন! আর ঐসব
বিদেশী থিম টিম না, আমি মশাই খেটে খাওয়া আম-আদমি, যদি একদম সাবেকি
বাঙালি থিম কিছু থেকে থাকে তো বলুন। আর খরচটাও!"
কল্পতরু
বাগচী খানিক্ষন চোখ বুজে ভাবলেন দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে, তারপর বললেন,
"একটা প্ল্যান আসছে মাথায় কিন্তু ফর্মুলেট করতে দুদিন লাগবে, দুদিন পরেই
নাহয় আসবো তাহলে?"
সেদিন অবশ্য ভুলোদা সবাইকেই রাতে
খাইয়ে ছেড়েছিলেন। আর যাওয়ার আগে আমি আর রাজু বকুলকে সাইড করে ডেকে হাতে
একটা সিগারেট গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কল্পতরুর কোচিং জীবনের কালান্তক
ম্যাচের পরিনাম কি ছিল!
'৭-০', বকুল হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলো," কলাদার কোচিং লাইফের প্রথম এব্বং শেষ ম্যাচ!'
'এইবার
বোঝা গেলো বুড়োদা", রাজু আমাকে বললো, "টাইটেল ডিফেন্ডাররা প্রথম ম্যাচে ৭
গোল খেলে কোচের অপূর্ব অতলান্তিক' ছাড়া আর লুকোনোর জায়গাই বা কোথায় বলো!"