Friday, 2 March 2018

ভুলোদা এবং ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ

শীতটা সবে গেছে। ইদানিং বিকেলের দিকে দিব্বি ফুরফুরে হাওয়া দিয়ে থাকে, আর আমি আর রাজু নিয়ম করে গড়ের মাঠে বসে ঘাস চিবিয়ে থাকি। বিয়ের পরে ভুলোদা আমাদের জন্যে বাড়ির বাইরে 'প্রবেশ নিষেধে'র প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে দিয়েছে। নাঃ, আসলে আমরাই ভুলোদাকে বয়কট করেছি!
দোষটা অবশ্য ভুলোদাকে ঠিক দেওয়া যায় না, বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন বৌদি ভালো ভালো রান্না করতো, আর আমাদের ভুরিভোজের ব্যবস্থা হতো কিন্তু ভুলোদার সেসব চোখে দেখাই সার ছিল, চেখে দেখতে গেলেই বৌদির কটাক্ষে ভুঁড়ি ভস্ম হওয়ার ছিল কিনা। কতদিন ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ রুটি খেতে খেতে দেখা যায় যে সামনে বসে অপোগণ্ডের দল প্রেমসে মুরগির ঠ্যাং সাঁটাচ্ছে! আমাদেরই কষ্ট হতো বেচারার জন্যে! গলা দিয়ে নামতেই চাইতো না! কিন্তু বৌদির রান্না এমন অমৃততুল্য যে ভুলোদার রান্নাকেও হার মানিয়ে দেয়, তাই বৌদির কথা ভেবেই কোনোরকমে গলাধঃকরণ করে নিতে হতো আর কি বিরিয়ানী বা মুরগি-রোস্ট।
 বেশিদিন চললো না ব্যাপারটা। একদিন এরকম নেমতন্ন খেতে গেছি এরকম, বৌদি ছখানা থালা দিয়ে গেলেন সাজিয়ে রোজের মতন, আমাদের তিন মক্কেলের, বকুলের, সুচিস্মিতাদির আর স্বয়ং ভুলোদার। তার পর সেই থালায় পড়লো খান চারেক করে রুটি, আর সবুজ, গলা পাঁকের মতো এক দলা করে ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ, এক্কেরে ছয় এক্কে ছয়টা থালায়!
 আমাদের অবাক, হতবাক, বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে, ভুলোদা অমায়িক মিহি হেসে বললেন, "ওরে, আমিই তোর বৌদিকে বললাম, যে তুমি শুধু আমার কথাই ভাবলে সোনাই, ওদের কথা ভাবলে না! ওরাও তো রোজ রোজ এত মুরগি মটন খেতে খেতে হাফিয়ে উঠছে, ওদের ও তো প্রাণ কাঁদে ঢ্যাঁড়শের জন্য! তাছাড়া, শৌনকটা এমনিতেই আমার অর্ধেক, চেহারার দিক  থেকে আর কি!এবার তো আমাকেও ছাপিয়ে  যাবে, শুচি আর হীরেনের বিয়ে, ওদের তো ডায়েট করাই উচিত। আর বকুলব্রত, রাজর্ষি দুটোই পেটরোগা! এবার থেকে আমায় যা দেবে, ওদেরও তাই দেবে।"
তার পর থেকে বৌদির হাজার ফোনেও আর ডিনার করিনি ওবাড়িতে।
সে যাক, কথা হচ্ছে যে ইদানিং আমি আর রাজু একদমই হতাশ, ভবঘুরে আর বেকার। কাজের মধ্যে দুই, খাই আর শুই। তাই ভুলোদার বাড়িতে আজ যাবো ভাবছি। ভুলোদা পার্টির অনেককে চেনে টেনে। তাদের মধ্যে একজন আছেন বিরাট শিবভক্ত, এবং তাঁর হাত প্রচুর লম্বা, মানে  যে হাতটা দেখা যায় না সেইটা আর কি।  ভদ্রলোকের নাম মিস্টার সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড।  দেখি যদি ভুলোদা ধরে কয়ে একটা হিল্লে করতে পারে!



Thursday, 1 March 2018

শুভবিবাহ

ভুলোদাকে দেখলে মায়া হয়। অতো বড়ো মাপের ও মনের মানুষটার সাথে এরকম হল, ভাবাই যায় না। যাই হোক, দেখা করতে গিয়েছিলাম ভুলোদার বাড়ি। ভুলোদার কান্নার সুর সানাইয়ের সুরের সাথে মিলে যাওয়ায় অনুনাদ তৈরি হয়েছে, যার ফলে বেশ অনেক দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া নাক থেকে টোয়েন্টি ফোর আওয়ার রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা তো আছেই। আমায় দেখে ভুলোদা হীরুদার গলায় বলে উঠলো, ‘রাজু, ওঠ শিগগির।‘ তারপরই মোষ-খাটালের মোষ ধোয়ার বালতি করে এক বালতি জল ঢেলে দিলো গায়ে। আমি ধড়মড় করে উঠতেই দেখি হীরুদা আর বুড়োদা চেঁচাচ্ছে, ‘কতক্ষণ ধরে ডাকছি। বিয়ে শুরু হলো বলে।‘
-বিয়ে! বিয়ে ভেঙ্গে গেছে না!
-আরেকবার বলে দেখ। ভুলোদা তোর ইয়ে ভেঙ্গে দেবে।
বুঝলাম বাবার দয়ায় স্বপ্ন দেখছিলাম। সেজেগুজে বেরোতে দেখি বিয়ে শুরু হব হব করছে।

সে ভুলোদা সুখে থাকুক বিয়ে করে। ছোটোবেলা থেকে পড়ে এসেছি ‘সেবা পরম ধর্ম।‘ আপাতত হেঁশেলের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় স্বস্কন্ধে তুলে নিলুম। আপাতত এই পর্যন্তই।।

ডেঞ্জারাস

ভুলোদা সাতদিন হল নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করেছে। সাতদিন ধরে ননস্টপ বিসমিল্লা খাঁর সানাইইয়ের করুন সুর বেজে যাচ্ছে। তার ভুঁড়িখানা স্থায়ীভাবে স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধন্ত নিয়েছে। কিন্তু তাঁর শরীর আর এই ধকল সহ্য করতে পারছে না। কাল রাত থেকে সানাইয়ের পরিবর্তে মাঝে মাঝে সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু তা যে শেষে এমন বিপদ ঘটাবে তা আর কেউ আশা করেনি। আজ সকাল থেকে তাঁর গলা থেকে আলট্রাসোনিক সাউন্ড বেরচ্ছে। দলে দলে বাদুড়েরা আসতে শুরু করেছে। খবর দেওয়া হয়েছে বনবিভাগে।
উপস্থিত অতিথিবর্গ হায় হায় করতে করতে বিয়েবাড়ি ত্যাগ করেছেন। বুড়োদা অবশ্য হায় হায় করছিল অন্য কারনে। সে রসগোল্লার কড়াইয়ের কাছে গিয়ে দেখে সবকটি রসগোল্লাই তাদের স্থায়ী আস্তানা ছেড়ে ঘাঁটি গেড়েছে বিভিন্ন জনার পেটে। একটিও আর নাই।

হীরুদার মোষ-খাটালে কাজ থাকায় বিয়েতে আসতে পারেনি। সব শুনে বলল, 'বাপরে! কী ডেঞ্জারাস!!'

ভুলোদার বিয়েভঙ্গ

--হ্যালো।
--ভুলোদা বলছ?
--বকুল তোর কোন আক্কেল নেই? আমি বিয়ে করব বলে চার ঘণ্টা বসে আছি। খিদের চোটে এই ভর শীতেও কোলাব্যাঙগুলো হাইবারনেশন থেকে বেরিয়ে এসে পেটের ভিতর ফড়িং খাই, ফড়িং খাই করে বেড়াচ্ছে। আর তুই এখনও বৌদিকে নিয়ে পৌঁছুলি না! নাহয় আমি প্রিয়তমার মুখ না দেখা পর্যন্ত নির্জলা উপোস করব ঠিক করেছি। কিন্তু তাই বলে আমাকে দিয়ে অনশন করানর প্ল্যান ছিল তোর! ফোনটা পর্যন্ত সুইচ অফ করে রেখেছিস। আর কতক্ষন এই ব্যাঙের নাচ সহ্য করতে হবে বল তো।
--জানিনা ভুলোদা। হয়ত সারাজীবন...
--মানে? কোথায় এখন তুই?
--হাসপাতালে। মাথাটা এখনও টনটন করছে।
--কী হয়েছে? কোন অ্যাক্সিডেন্ট নয়তো? ও ঠিক আছে তো?
--সে আর নেই ভুলোদা।
--মানে!!!
--হ্যাঁ ভুলোদা। সে চলে গেছে।
--কী বলছিস?? আমার...
--হ্যাঁ ভুলোদা। শেষে জোর করাতে যাবার সময় আমার মাথায় লাঠির বাড়ি মেরে গেছে।
--মানে! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার কিন্তু ইয়ার্কি সহ্য হচ্ছে না।
--রাস্তায় আসতে আসতে বৌদি আমায় গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। আমি গাড়ি দাঁড় করাতেই সে বলল, 'বকুল, ওই কুমড়োপটাশটাকে বলে দিস আমি চললুম।' তারপর চোখ খুলে দেখি হাসপাতালের বেডে শুয়ে ব্লাড নিচ্ছি। পাড়ার ছেলেরা চিনতে পেরে হাসপাতালে এনেছে। যাওয়ার সময় মাথা ফাটিয়ে দিয়ে গেছে আমার।
কিছুক্ষণ পর এক ভয়ানক আর্তনাদ শোনা গেল। কলাদার কানে তালা ধরে গেল। সুচিস্মিতাদি চেয়ার থেকে উলটে পড়ে গেল। কয়েকটা কাক ভয়ে উড়ে পালাতে গিয়ে বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হয়ে মারা গেল।।

ভুলোদার সন্ধ্যা-পর্ব

ভুলোদাকে নিশ্চয়ই ভুলে যান নি ? আর মিকি ভাই কে মনে আছে তো ? ওই যাঁর গর্দান থেকে পাছা সকলই ছেচল্লিশ আর যিনি  ভুলোদার  বিয়েতে অক্টোপাসের চাটনি রান্না করার প্ল্যান করেছিলেন ? না মনে থাকলে 'ভুলোদা এবং মিকিভাই' খানা একবার ঝালিয়ে নেবেন নাহয়! তা সেইবার ভুলোদার বাড়িতে মিকিভাইয়ের 'হরেনডাস হিমালয়' শুনে হরিবোল বলে পালিয়ে এসেছিলুম আর তিনজনে মিলে বকুলব্রত (ভুলোদার পাড়াতুতো শ্যালক) এবং ভুলোদাকে যথেচ্ছ ছিছিক্কার করেছিলাম, যা তা লোকের খপ্পরে পড়ে যায়, নিজেদের কোনো ভালোমন্দ বিচার বোধ নেই এই সব বলে টলে! কিন্তু পরবর্তী কালে দেখা গেলো মিকিভাই আদতে অত্যন্ত কাজের লোক মশাই! কিভাবে বুঝলাম? অরে রসুন, সেটাই তো গপ্পো!

হীরুদা প্রথম খবরখানা দেয়; হীরুদা আর আমাদের শুচিস্মিতাদিদি সেদিন গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে গেছিলো বোধয়, হীরুদা  মোষখাটালের ম্যানেজার হওয়ার পর থেকে ওরকম প্রায়ই যাচ্ছে ওরা ! বলে কিনা ভুলোদার সাধের সেকেন্ডহ্যান্ড মারুতিখানায় চড়ে ভুলোদার নতুন  ফিটনেস ট্রেনার মিস স্যান্ডা আর আমাদের মিকিভাইও গড়ের মাঠে চক্কর কাটছে!
আমি আর রাজু মিস স্যান্ডার কেসটা  জানতাম; মিকিভাইএর মতে, ভুলোদার  বিয়ের থিম, 'বিগ বং' যেহেতু  দাদার বিশাল বপুর কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে, ভুলোদা যাতে কিছুতেই রোগা না হয়ে যায়, তার জন্যে ভুলোদার উচিত বিয়ে পর্যন্ত ফিগার মেনটেন করা! অতঃপর তাঁরই সুপারিশে  মিস স্যান্ডার আগমন!

মিস স্যান্ডা সুন্দরী, তন্বি এবং বাপ্-মা প্রদত্ত সন্ধ্যা নামখানার পক্ষপাতী নন। কিন্তু স্রেফ এই বলে মিস স্যান্ডাকে বর্ণনা করা সম্ভব হবে না! বেশি জটিল না করে শুধু এইটুকু বলি, স্যান্ডার আগমনী গান বাজতেই আমি সুগন্ধার সৌরভ  প্রায় ভুলতে বসেছিলাম; রাজুর চাকরির প্রিপারেশনের জন্যে বার বার করে ভুলোদার হেল্প নেওয়ার দরকার পড়ছিলো, আর  সেটাও কিনা কাক-ভোরে আর বিকেলগুলোতে যখন ভুলোদার ডায়েট চার্ট ধরে ব্রেক -ফাস্ট আর ডিনার খাওয়া হচ্ছে কিনা দেখতে স্যান্ডা হাজির থাকতো!  আর হীরুদা বেচারা , লাইসেন্সের অভাবে  আড়চোখে চেয়ে চেয়ে প্রায় টেরা হয়ে যেতে বসেছিল !!

 যাই হোক, আমাদের এই বাঁদরামি বেশিদিন চলেনি, হীরুদার চোখ তো  শুচিস্মিতাদি দায়িত্ব নিয়ে সরিযে এবং সারিয়ে ফেলে দিন তিনেকের মধ্যেই, রাজুকে স্যান্ডা রাখির দিন রাখি পরিয়ে দিলো, আর আমার তো বিষে বিষক্ষয় হলো একদিন রাস্তায় সুগন্ধাকে পাড়ারই যাদবপুরিয়া এঞ্জিনিয়ার তন্ময়ের সঙ্গে ফুচকা খেতে দেখে ! দুঃখের চোটে স্যান্ডা সন্ধ্যার আলোর মতো ভ্যানিশ!

বকুল কিছুদিনের জন্যে বাড়ি গেছে, সে এই সান্ধ্য-রেসে অংশই নেয় নি!

কিন্তু তাই বলে অমন ৩৬-২৪-৩৬ মেয়ের সাথে ৪৬-৪৬-৪৬ মিকিভাইকে বারবার বহুবার দেখা যেতে দেখলে কিরীটি -ব্যোমকেশের চেলারা কদিন আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? চাকরির এই আকালে সময় কাটাতে  আমাদের মতো ফেল্টু গ্রাজুয়েটদের ফেলুদারাই তো ভরসা....    


তো দিনকতক একটু ঘুরঘুর শুরু করলাম, ভুলোদার পাড়ায় এবং ভুলোদার শ্বশুরবাড়ির পাড়ায়। বকুলের পিছনে টিউশনে গলার রক্ত মুখে আনা পয়সা খরচ হলো আমার এবং রাজুর দুইজনারই! কিন্তু কৌতূহল বড়ো দায়, বিশেষত বেকার জীবনে।
তিন দিন পর রাজুর ফোন, "বুড়োদা, খবর আছে, আজ সন্ধ্যাবেলা হীরুদার বাড়ি।" খবর আমারও ছিল, কাজেই সন্ধ্যেবেলা সন্ধ্যার রহস্য-উন্মোচনে হাজির হলাম হীরুদার বাড়ি।

হীরুদা একলা থাকে, ছোট্ট একখানা ফ্ল্যাটে। ভাড়া করে, সেই কলেজ আমল থেকে। ভুলোদার সাথে  আলাপ হওয়ার আগে এটাই ছিল আমাদের  'ডেন'! একদিকে ছড়ানো বই খাতা, একটা তার ছেঁড়া গিটার, একপাশে  খাটে ছড়ানো কলেজের টেক্সট বই থেকে ইদানিংয়ের 'তিনদিনে টেট পাশ'! তারই মধ্যে ধুলো টুলো ঝেড়ে বসা গেলো।

রাজুর উৎসাহ চরমে। হিয়ার(রাজুর 'প্রাক্তন চাপ') পরে ওর  হিয়াতেই  আঘাত বেশি করেছে কিনা  স্যান্ডা! হীরুদা চা বসিয়েছে কি বসায়নি , শুরু হয়ে গেলো! "আরে, বাবা রিসেন্টলি একটা চাকরির কোচিঙে ভর্তি করেছে, 'সরকারদার সরকারি চাকরির প্রশিক্ষণ ', সেইখানে যাচ্ছি সন্ধ্যেবেলা এই সপ্তা থেকে। একটা ছেলে আসে, বাইকে চেপে। ইয়া বডি মালটার !আকাশ নাম।  কাল কোচিং শেষ হয়েছে, দেখি স্যান্ডা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। নটা মতো হবে তখন! আমি কথা বলতে যাবো যাবো, এমনি সময় সে আকাশের বাইকে চেপে হুউস! একদম লিপ্টে বসে দুজনে, আর দুজনাতেই বিশাল খুশি....কেসটা জন্ডিস লাগছে হীরুদা!"

হীরুদা আমাদের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, "মিকিভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলুম,কিছু বললো না তেমনি, লাজুক লাজুক হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেলো"

আমার খবরটা ওদের দিলাম, সোর্স বকুল, মিকিভাইকে নাকি দিনকয়েক আগে জাভেদ হাবিব থেকে বেরোতে দেখা গেছে, স্পাইক ছেড়ে মিকিভাই নাকি আজকাল চুল রাখার চেষ্টায় আছেন, সঙ্গে হাফ-প্যান্ট ছেড়ে ডেনিম ধরেছেন! আর স্যান্ডা মিকিভাইয়ের টিমে নতুন আমদানি। আগে একটা ছেলে ছিল ফিটনেস ট্রেনার ! সে ছেড়ে দিয়েছে রিসেন্টলি!

রাজু খুব মাথা-টাথা নাড়িয়ে বললো, "ইস, মিকিভাইটাও আমাদের দলে নাম লিখতে চলেছে! আজকালকার দিনে কি অবস্থা! একটা সফল প্রেমও কি নামে  না!"

আসলে মনে মনে খুশি হয়েছি না দুঃখ পেয়েছি ঠিক বুঝলাম না! পাপী মন, নিজের সুখের চেয়েও অন্যের দুঃখ দেখতে বেশি ভালোলাগে! তবু, মিকিভাইয়ের ওপর কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে ! লোকটা প্রচুর বাজে বকে ঠিকই,  তবু লোকটার মন ভালো! আর হাজার হলেও ভুলোদা সূত্রে লোকটা দলের একজন হয়ে গেছিলো!

যাইহোক,সেদিন তো  হীরুদার রান্না ভাত -ডিমের ঝোল খেয়ে খানিকক্ষণ  -গুলতাপ্পি মেরে ফিরে এলাম!

বোম পড়লো দুদিন পর, ভুলোদার জরুরি তলবে! ভুলোদার বাড়িতে গিয়ে দেখি সক্কলে হাজির! বকুল, স্যান্ডা, শুচিস্মিতাদি সমেত হীরুদা, রাজু, মিকিভাই এবং একটি নতুন ছেলে, যাকে আমি চিনি না! রাজু দেখি 'থ' মেরে দাঁড়িয়ে আছে!

আমায় দেখে একপাশে ডেকে নিয়ে বললো,"ও বুড়োদা, এই তো সেই আকাশ!"

ভুলোদা সকলের জন্য আজ অনেকদিন পর নিজে হাতে লেগ-ফ্রাই বানিয়েছেন। নিয়ে এলেন! আজ ভুলোদা নিজের ওই বড়ো চাকা ওয়ালা চেয়ারটাতেই বসেছেন, আমরা সোফা টুল যে যা পেরেছি দখল করে বসে।

হীরুদা গলা সামান্য নামিয়ে বললো, "কেসটা কি হচ্ছে বলতো? সূচি সব জানে, তাও  বলছে না! ভুলোদা ওকে কাল ফোন করেছিল, আজ দুজনে মিলে সারাদিন ধরে প্রচুর রান্না টান্না  করেছে! রাতেও এখানেই খাবে সকলে ! বকুল ও কিস্সু জানে না!"

আমি আর রাজু ঘাড় নাড়লাম! জানি না! ভুলোদাকেই বলতে দেওয়া হোক!

ভুলোদা একটু গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন, " তোমরা যারা এখানে আছো, সকলেই আমার খুব প্রিয়, আমার একমাত্র আপনজন। আজ সেই আপনজনদের  মধ্যে দুজন নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে, আমি খুব খুশি! হীরেন, সৌনক, তোমাদের দায়িত্ব বেড়ে গেলো কিন্তু ! এবার একটা না, দুটো বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে! কল্পতরুবাবু আজ আমাদের সকলকে সাক্ষী রেখেছে স্যান্ডার সাথে রেজিস্ট্রিটা করে নেবেন! স্যান্ডার তরফ থেকে ওর ছেলেবেলার বন্ধু আকাশ আছে, আর স্যান্ডা চায়, ওর রাখি-ভাই রাজর্ষি সই করুক, কল্পতরুর তরফে আমি আর হীরেন সই করবো! একটু পরেই উকিলকাকা এসে যাবেন..."

আমি জানি না আমার মুখের মানচিত্র কেমন ছিল এতসব শুনে টুনে, হীরুদার মুখে একটা টারান্টুলা ঢুকে গেলেও অবাক হতাম না এত বড়ো  হাঁ হয়ে গেছিলো ওর মুখ! রাজুকে দেখে মনে হচ্ছিলো ও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না! মিকিভাই বিশাল গর্দানের মধ্যে মাথাটা প্রায় লুকিয়ে ফেলতে পারলে বেঁচে যান এত লজ্জা পেয়েছেন! স্যান্ডা আর শুচিস্মিতাদি পিকচার থেকেই আউট!

তারপর? তারপর আর কি! উকিলকাকা এলেন, স্যান্ডাকে শাড়ি পরিয়ে নিয়ে এলো শুচিস্মিতাদি, খাওয়া দাওয়া হলো, সই-টই ও! মিকিভাই চুপিচুপি জানিয়ে গেলেন তাঁর বিয়ের থিম-'শখের সকার'-"পুরো ফুটবল বেসড থিম, বুঝলে ভাই, একদম!"

বাড়ি ফেরার সময় রাজু আর আমি একসাথে বেরিয়েছিলাম, বাস-রাস্তায় এসে আলাদা হওয়ার আগে রাজু বললো,"বুঝলে বুড়োদা, খুব ভালো লাগছে, খুউব ভালো লাগছে...."









 

ভুলোদা এবং মিকিভাই

 হীরুদা মোষ খাটাল জয়েন করার কয়েকদিন পরের ঘটনা। হীরুদা তো যা হোক এখন তাও খাটালের খেয়ে খাটালেরই মোষ তাড়াচ্ছে, আমার আর রাজুর পকেট ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি। তা রাজুও দুদিন ধরে বেপাত্তা, ফোন করলে বলে,'বুড়োদা, ফালতু জ্বালিও না, চাকরির জন্যে পড়াশোনা করছি!' অগত্যা পাড়ার মোড়ে ক্লাবের রকে বসে একা একাই বিকেল কাটাচ্ছি আর বিড়ি টানছি; মনে আশা একটু পর সুগন্ধা যাবে সামনের রাস্তা দিয়ে পড়তে, তার পর উঠবোখন!
তা সুগন্ধাকে আসতে দেখে চটপট বিড়িটা ফেলে পকেট থেকে নোটবই বার করে একটা আঁতেল আঁতেল ভাবালু মুখ নিয়ে খুব গম্ভীর ভাবে সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে আছি আর আড়চোখে ঝাড়ি মারছি, ফোনটা তারস্বরে গান গেয়ে উঠলো-'বাবা আমার কি বিয়ে হবে না!'; সুগন্ধা তখন ঠিক সামনে দিয়ে যেতে যেতে আমার দিকে একটা 'এহেহে' মার্কা লুক দিয়ে গেলো! ব্যাস! প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন! রিংটোনখানা ইমিডিয়েট পাল্টাতে হবে! আর কোন হতভাগার ঠিক এই সময়ে আমাকে দরকার পড়লো! নিশ্চই অক্কমার  ঢেঁকি রাজুটার ! এইসব ভেবে টেবে চরম বিরক্তির সাথে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আমি অবাক!
ভুলোদা! ভুলোদা ফোন করেছে! আমায়! মাসদুয়েক পরে! বৌদির নাম আমার নামের কাছাকাছি; বৌদিকে ডায়াল করতে গিয়ে আমায় করেনিতো? এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা তুললাম,'ভুলোদা, বলো বলো, আদ্দিন পর মনে পড়েছে ভাইকে!'
ওপাশ থেকে ফাটা কাঁশির মতো গলায় আওয়াজ এলো,"ভুলোদা নোই, আমি বকুল বলছি। ভুলোদা বললো রাজুদা আর হিরুদাকে জুটিয়ে রাত্তিরে চলে আসতে, কাজ আছে। "

 আমি হ্যাঁ না কিছু বলার আগেই কট করে ফোন কেটে দিলো বকুলব্রত। ভুলোদার পেয়ারের পাড়াতুতো শালা। রাগে গজগজ করতে করতে উঠে পড়লাম রক থেকে। বকুলটার আস্পদ্দা বড্ডো বেড়েছে। ভুলোদাই বাড়িয়েছে ওকে! হতচ্ছাড়া বানর! মর্কট! কপি! অখাদ্য বাঁধাকপি একটা!

যতই যাই হোক. ভুলোদার ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা এখনো আমার, রাজুর, হীরুদা কারোর নেই। অতএব, আটটা বাজার আগেই তিনমূর্তি একজোট হয়ে ভুলোদার বৈঠকখানায় সোফাসীন হয়ে গুলতানি মারছি আজ অনেকদিন পর। সঙ্গে শুকনো চানাচুর। ভুলোদা, বকুল কেউ বাড়িতে নেই, আমাদের সক্কলের কাছে এবাড়ির একটা করে চাবি আছে, তাই নিজেরাই নিজেদের আতিথ্যে বরন করে নিয়েছি। রান্নাঘর আর ফ্রিজ ঘেটে দেখাও হয়ে গেছে, কিন্তু ওবেলার ডাল ছাড়া কিছু ছিল না।  অগত্যা চানাচুর এবং পিএনপিসি চলছে পুরোদমে।

ঠিক পিএনপিসি না, হীরুদা নিজের কথাই বলছিলো। শুচিস্মিতাদি নাকি খুব খুশি মোষ -খাটালে হীরুদা চাকরি পাওয়াতে । সে তো চাকরি পেয়ে গেছে আজ বছর দুয়েক হল , কোনোক্রমে বিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিলো। এইবার নাকি হীরুদার সাথে মা-বাবার দেখা করাবে। ভালো ভালো! সবার ভালো হোক , সবার বিয়ে হোক! রিং-টোনটা চেঞ্জ করবো না, ডিসিশন নিলাম। অতি সত্য কথা কৈছে ওটা!

আধঘন্টা ধরে হীরুদার ভ্যাজভ্যাজানি শুনে প্রায় বিরক্ত হবো হবো করছি, এমন সময় গ্রিল দরজা খোলার আওয়াজ!
আমরা তিন মক্কেল সচকিত! রাজু একটু আগেই বলছিলো,"ভুলোদার সাথে একটা বোঝাপড়ার দরকার আছে, প্রেম করছে বলে আমাদের এইরকম ইগনোর মারতে পারে না লোকটা!" কিন্তু বেড়ালের গলায় প্রর্থম ঘন্টাটা কে বাঁধবে, সেইটা এখনো ঠিক হয়ে ওঠেনি!

কিন্তু এরপর যা ঘটলো, তাতে ওসব বেমক্কা মাথা থেকে ধাঁ! এক্কেরে আবির্ভাব ঘটলো ধরাধামে ইয়ে থুড়ি ভুলোধামে, এক মহাপুরুষের!

প্রথমে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকেছিলো খ্যাংরাকাঠী বকুল, তার পিছনে শান্তিনিকেতনি ঝোলা কাঁধে বিপুল বপু আমাদের ভুলোদা। আর তার পর? তারপর যেজন প্রবেশিলো, তাহারে বর্ণনা করিবার ভাষা মোরে ঈশ্বর দেন নাই! উপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাহার সকলি ছেচল্লিশ! [হরিণঘাটা ফার্মে এক-প্রজাতির জীব সযত্নে লালিত-পালিত হয়, অনেকটা তাদের মতো গড়ন!] চুলে ফুটবলার ছাঁট, ঘাড় থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত সব লেপে-পুছে ছাটা, তার উপরে যেকটি রয়েছে, জেল-লেপিত হয়ে তারা স্পাইকের মতো উর্দ্ধগামী! চোখে অধুনালুপ্ত গোল চশমা, গায়ে হাফ-শার্ট, যার বোতাম গুলো ছিঁড়ে যেতে যেতেও যায়নি! পরনে টাইট হাফপ্যান্ট, তাতে লেখা 'ম্যান,ইউ!' হাতে একখানা লাল ফাইল, তার ভেতর থেকে কিছু কাগজ উঁকি মারছে!

আমি থ! হীরুদার চোখ সকেট থেকে বেরিয়ে আসি আসি! রাজুর মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে অট্টহাসি চেপে আছে!

ভুলোদা অমায়িক হাসি হেসে বললেন," এই তো, হীরেন, সৌনক, রাজর্ষি তোমরা এসে গেছো দেখছি! বসো, বসো!" আমরা উঠে দাঁড়িয়েছিলাম বোধহয় ওদের দেখে, ঠিক মনে নেই,"ইনি হলেন কল্পতরু বাগচি, ওরফে মিকিভাই; বকুলের পাড়ার মানে তোমাদের বৌদির পাড়ার স্বনামধন্য ডেকোরেটার! ভাবছি বিয়ের প্যান্ডেল ওইসব দায়িত্ব এঁনাকেই দেব-"

ভুলোদা আরও কিছু বলেছিলো হয়তো, কিন্তু কানে আসেনি আমার। আমি আর হীরুদা তখন রাজুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, বেচারা এত কাশছিলো যে প্রায় প্রাণ বেরিয়েই যায় এমন অবস্থা!

কল্পতরু বাগচি ওরফে মিকিভাই ততক্ষনে জাকিয়ে বসেছেন গদি  আঁটা বড়ো চাকা লাগানো চেয়ারটায়, যেটাতে  কেনা ইস্তক ভুলোদা ছাড়া কেউ বসেনি!


রাজুর মাথায় চড়চাপাটি মেরে ওকে তো কোনোক্রমে সামলালাম। বকুল ততক্ষনে গেস্ট-স্পেশাল চায়ের কাপ বের করে তাতে চা নিয়ে এসেছে; মিকিভাই পায়ের উপর পা তুলে বসে সুরুৎ সুরুৎ করে তাই পান করছেন। ভুলোদা খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক তাকিয়ে শেষে সোফার উল্টোদিকে রাখা একটা টুলের উপর বসেছেন। আমরা তিনজন সোফায় ; ঘরে কেমন একটা শ্মশানের শান্তি বিরাজ করছে। মিকিভাই তাঁর গোল চশমা সামান্য নামিয়ে সেই ফাঁক দিয়ে আমাদের তিনজনকে জরিপ করছেন। আমি দেখলুম হীরুদা নিজের একমনে ভুলোদার ঘরে ঝোলানো রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকিয়ে দাঁত  দিয়ে নখ কাটছে, আর রাজু ভুরু কুঁচকে দেখছে মিকিভাইকে। হঠাৎ উড়ে এসে এইরকম ভুলোদার চেয়ার  জুড়ে করে বসাটা ওর মোটেই পছন্দ হয়নি। ভুলোদা টুলে ঠিক স্বস্তি পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না, বারবার নড়েচড়ে বসছেন আর উসখুস করছেন, যেন কিছু একটা বলতে চান কিন্তু আমাদের তিনজনের  অবস্থা দেখে বলার সাহস পাচ্ছে না!

বকুল আমাদের জন্যেও চা নিয়ে এসেছে, শেষে নিজে এককাপ নিয়ে এসে দরজায় হেলান দাঁড়ালো;  তারপর ওই কথা শুরু করলো;" হুম, কলাদা, ভুলোদাকে দেখাও ডিজাইন গুলো!"
'কলাদা!' আমি হিরুদার দিকে তাকালাম, সে তখনও নখ খাচ্ছে।
রাজু আমার দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি  দিয়ে মিকিভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল 'হ্যাঁ ,কলাদা ,দেখান কি প্যান্ডেলের ডিজাইন হবে  টবে , আমরাও একটু দেখি ।'
ভুলোদা টুলের উপরেই নড়েচড়ে বসলেন আর একবার। তাঁর চোখে মুখে বেশ একটা লজ্জা লজ্জা আগ্রহ ফুটে উঠেছে, ঠোঁটে হালকা একটা উত্তমকুমারমার্কা লাখটাকার হাসি!

মিকিভাই এই প্রথম কথা বললেন,  অমন বরাহসুলভ চেহারা থেকে যে অমন মিহি মাখন আওয়াজ বেরোতে পারে, তা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল! "হাঁ, ইয়ে ভুলোবাবু, আমি আজ খান তিনেক ডিজাইন  এনেছি, একটা হলো গিয়ে 'অপূর্ব অতলান্তিক' ; মানে বুঝলেন কিনা, ওই সমুদ্র থিম....প্যান্ডেল হবে নীল...গায়ে থাকবে  অক্টোপাস, শার্ক ,নীল তিমি, চাই কি দুএকটা গোল্ড-ফিশ টিস্ ও  দিয়ে দেব। ফুল সব হবে ওয়াটার বেসড ,ওয়াটার লিলি, শালুক, পদ্ম ... কেটারিং ও আমাকেই দেবেন নিশ্চই, খাবার সব সামুদ্রিক খাবার, শার্কের পাখনার ঝাল, অক্টোপাসের চাটনি এই দুটো আমার স্পেশালিটি। একটা বিউটি পার্লারএর সাথে কন্টাক্ট তো আছেই , ওরা সোনাইকে মারমেইড আর আপনাকে পাইরেট সাজিয়ে দেবে, ব্যাস! দেখেবেন, লোকে একশো বছরেও ভুলবে না আপনাদের বিয়ের কথা!"

আমরা সবাই চুপ! রাজু একটা ঢোক গিলে বললো,"একশো কেন, হাজার বছরেও ভুলবে না! তা কলাদা, আপনার এই থিমটা আগে কোথাও করেছেন?"

কলাদা  অমায়িক হেসে বললেন "আরে, কি যে বলো! আমি তো সবে কালকে ডিসাইড করেছি যে এই ব্যাবসায় নামবো! এর আগে তো আমি ফুটবল কোচ ছিলাম। আমাদের ওখানকার স্কুল টিমের।"

আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, "ছেড়ে দিলেন কেন?"

"আর বলো কেন ভাই! এখনকার লোকেরা এক্সপেরিমেন্ট করা পছন্দ করে না! আমাদের স্কুল টীম আমি আসার  আগে পর পর দুবার ইন্টার-স্কুল জিতেছে, যে ছেলেটি গোল-কিপার সে নাকি একটি গোল ও খায়নি। কিন্তু আমি জানি ও খুব ভালো ডিফেন্ডার হতে পারতো যদি ওকে সুযোগ দেওয়া হতো! এদিকে আর  একটি ছেলে, যার মধ্যে গোল-কিপিং করার পোটেনশিয়াল রয়েছে, সে বসে আছে বেঞ্চে! তো আমি করলাম কি, একটা ম্যাচে গোল-কিপারকে মাঠে নামিয়ে ওই ছেলেটিকে কিপার করে দিলাম! ব্যাস! পরের ম্যাচে চাকরি গেলো! যাক যে, যা গেছে তা যাক! ভুলোবাবু  বলুন "অপূর্ব অতলান্তিক" কেমন লাগলো?"

রাজু হঠাৎ ফটাস করে জিজ্ঞেস করলো," ম্যাচের রেজাল্টটা বললেন না তো, কলাদা?"


কল্পতরু বাগচী কটমট করে রাজুর দিকে তাকিয়ে বললেন,"আমরা এখানে কি নিয়ে আলোচনা করছি হে ছোকরা? ভুলোবাবু মাফ করবেন, এইসব সিরিয়াস আলোচনা এইসব চ্যাংড়া ছোঁড়াদের নিয়ে হয় না!" অপূর্ব অতলান্তিক ছাড়াও আরো দুটো প্ল্যান আছে, একটা হলো 'হরেনডাস হিমালয়' আর একটা 'ডেলিসিয়াস ডেসার্ট'! যদি বলেন যে আলোচনা সিরিয়াসলি করবেন তো বলেন, আমি ডেসক্রাইব করবো। নাহলে আমি উঠছি!"

আমার পাপী চোখ বকুলের দিকে চলে গেলো হঠাৎই! দেখি ও পিছনদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে , কিন্তু ওকে দেখে মনে হচ্ছে ছেলে প্রবল হাসছে!

ভুলোদা তড়িঘড়ি বললেন , "অরে খামোখা চটেন কেন মশাই! বাচ্চা ছেলে, ছেড়ে দিন! আর ঐসব বিদেশী থিম টিম না, আমি মশাই খেটে  খাওয়া আম-আদমি, যদি একদম সাবেকি বাঙালি থিম কিছু থেকে থাকে তো বলুন। আর খরচটাও!"

 কল্পতরু বাগচী খানিক্ষন চোখ বুজে ভাবলেন দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে, তারপর বললেন, "একটা প্ল্যান আসছে মাথায় কিন্তু ফর্মুলেট করতে দুদিন লাগবে, দুদিন পরেই নাহয় আসবো  তাহলে?"

সেদিন অবশ্য ভুলোদা সবাইকেই রাতে খাইয়ে ছেড়েছিলেন। আর যাওয়ার আগে আমি আর রাজু বকুলকে সাইড করে ডেকে হাতে একটা সিগারেট গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কল্পতরুর কোচিং জীবনের কালান্তক ম্যাচের পরিনাম কি ছিল!

 '৭-০', বকুল হাসতে হাসতে  জবাব দিয়েছিলো," কলাদার কোচিং লাইফের  প্রথম এব্বং শেষ ম্যাচ!'

'এইবার বোঝা গেলো বুড়োদা", রাজু আমাকে বললো, "টাইটেল ডিফেন্ডাররা প্রথম ম্যাচে ৭ গোল খেলে কোচের অপূর্ব অতলান্তিক' ছাড়া আর লুকোনোর জায়গাই  বা কোথায় বলো!"

নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য