চারদিকে লালচে ধোঁয়া, ভূতের মতো লোকজন হিম্বি-ডুম্বি বলতে বলতে আমায় ঘিরে নাচছে। তাদের মুখগুলো দেখে কোষের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। নাকের জায়গায় ইয়া বড়ো থ্যাবড়া নিউক্লিয়াস। চোখগুলো আর চোখ নেই, মাইটোকন্ড্রিয়া হয়ে জ্বলছে। আর এন্ডোপ্লাসমিক রেটিকিউলিয়ামটা কেমন যেন কুটিল হাসি হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায়। ভয়ে চোখ বন্ধ করতে যাব এমন সময় শুনতে পেলাম কে যেন চেঁচিয়ে বলছে, 'স্যার, তেল গরম হয়ে গেছে।'
তেল গরম! শুনেছি নরকে নাকি পাপী-তাপীদের শাস্তিস্বরূপ গরম তেলে কড়কড়ে করে ভাজা হয়। সাথেসাথেই মনে পড়ল আজ বুড়োদার সাথে থানায় যাওয়ার কথা ছিল। তাহলে কি থানায় আমাদের এমন পিটিয়েছে যে সোজা নরকে এসে পৌঁছেছি!
যাক এসে যখন পড়েছি তখন আর কী করা যাবে। একটা কথা ভেবে তাও খুশি হলাম যে কিডনিটা বেঁচে গেছে। এমন দুর্মুল্যের বাজারে যেখানে মরা কুকুরদেরও ছাড় দিচ্ছে না সেখানে কিডনি সমেত মরাটা কি চাট্টিখানি কথা!
এমনসময় ঠুং ঠাং শব্দ শুনে চোখ খুললাম। দেখি হাতে কাঁটাচামচ নিয়ে কয়েকজন আমায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বুঝতে পারলাম ওরাই আমার খাদক আর নরকে ভাগারকান্ড রমরমিয়েই চলছে। খদ্দেরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, আরে, এদের তো চিনি। আর ডি পি, এস আর আর অর্জুন স্যার! যাদের কথা মনে পড়লেই আমার ভোরবেলায় ইয়ে পেয়ে যেত। রাজর্ষিভাজা হবে শুনে এরা স্কুল কামাই করে এতোদূর এসেছে! ডেডিকেশন মাইরি!
এরপর ওঁরা তিনজন আমায় টিপেটুপে পরীক্ষা করতে লাগলেন। নজর আমার পেটের দুই পাশে। সাহস করে শেষমেশ কিডনির কথাটা জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। শুনে ওঁনারা এমন হাসতে লাগলেন যে আমার পিলে চমকে উঠল। সর্বনাশ! ওঁরা কি আমার কিডনির লোভেই এসেছেন। আজকাল কি ভূতেদেরও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি হয় নাকি!
এরপর ওঁরা তিনজন আমায় টিপেটুপে পরীক্ষা করতে লাগলেন। নজর আমার পেটের দুই পাশে। সাহস করে শেষমেশ কিডনির কথাটা জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। শুনে ওঁনারা এমন হাসতে লাগলেন যে আমার পিলে চমকে উঠল। সর্বনাশ! ওঁরা কি আমার কিডনির লোভেই এসেছেন। আজকাল কি ভূতেদেরও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি হয় নাকি!
এমন সময় শুনি বুড়োদার গলা, 'ওঠ রাজু ওঠ।' এতক্ষণ তো বুড়োদার কথা মনেই ছিল না। গর্ব হল বুড়োদার জন্য। নিশ্চয় পালিয়েছে, আর এখন এসেছে আমায় বাঁচাতে। কিন্তু উঠতে গিয়ে টের পেলাম উঠতে আর পারছি না। কে যেন সর্বশক্তি দিয়ে টেনে রেখেছে। তাও শেষমেশ উঠে পড়লাম। উঠে দেখি বুড়োদা মুখের উপর চেঁচাচ্ছে, 'ওরে এমন ঘুমালে দেখবি কোনওদিন লোকজন শ্মশানে গিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। চল, থানায় যেতে হবে তো।'
বুঝলাম স্বপ্ন ছিল। জামাকাপড় পরে বেরুলাম। একে ভোরের স্বপ্ন, তায় বেরোতে না বেরোতে একশালিখ দেখেছি। কিডনিটাকে আমার একটা গান ডেডিকেট করতে ইচ্ছা হল, 'এ চলাই শেষ চলা হয়তো...'
যারা আমাদের আগের পর্ব 'মারে হরি রাখ কে' পড়েছেন, তারা অলরেডি জেনে গেছেন যে বুড়োদার কারণে আমার একখানি কিডনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যদিও আজ যে দেখলাম, তাতে এখন কন্ডিশান অনেকটাই ভালো। এমনকি কিডনিটা আমার বদলে বুড়োদার থেকে নেওয়াই যায়।
যাইহোক থানায় পৌঁছালাম। আমাদের দেখে বড়সাহেব প্রথমে এমনভাবে তাকালেন যে আমরা ওঁনার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছি। কিন্তু নাম বলতেই উনি বসতে বলে আমাদের জন্য জলখাবারের অর্ডার দিলেন। একটু পরেই বলি চড়বে কীনা, তাই এমন জামাই আদর।
কিন্তু তারপর যেটা হলো, সেটার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। উনি আমাদের সামনে একটা কুড়ি হাজার টাকার নোটের বান্ডিল এনে বললেন, 'এই নাও। সরকার থেকে তোমাদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সাহসিকতার জন্য।' শুনে আমরা যেন মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো থেকে পড়লাম। বলে কী!
তারপর যেটা জানতে পারলাম, ইদানীং এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি খুব বেড়ে গিয়েছিল। অম্বল আর কম্বল এই দুই ভাই রাতের বেলা নাকে গামছা বেঁধে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করতে বেরোত। যথারীতি এ ব্যাপারে পৌরসভার কোন হেলদোল ছিল না। অন্যদিকে ম্যানহোলের ঢাকনা খোয়া গেলে দুর্গন্ধে পাড়ায় টিকতে পারা যেত না। তাই বাসিন্দারা নিজেরাই চাঁদা তুলে কিনে নিত। একেকটি ঢাকনা পাঁচ'শ থেকে আট'শ টাকায় বিক্রি হতো। লোকজনের খরচও বেশী হতো না আর একেকটি ঢাকনা মাসে একবার চুরি করেই চলে যেত চোরেদের।
তা ওই কুয়োটা ছিল চোরাই ঢাকনা লুকিয়ে রাখার জায়গা। সেদিন রাতেও নাকি তারা চুরি করতে বেরিয়েছিল। কিন্তু বুড়োদার গান শুনে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কুয়োতেই লুকিয়ে পড়ে। আর পরে বুড়োদা গিয়ে পড়ে ওদের ঘাড়ে।
চোরেরা নাকি এখনও আইসিইউতে, কথা বলার অবস্থায় আসেনি। ঢাকনা সাপ্লাইয়ার নাকি দেখা করতে এসে চোরেদের অবস্থা দেখে ভয়ে নিজমুখে সব দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। ক'দিন আগেই নাকি পাড়ার মোড়ের মোড়েকালি স্বপ্নে ওকে ভয় দেখিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এতেই শেষ নয়। বুড়োদার নাম সাহসিকতার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। তাছাড়া আমাদের নিয়ে নাকি একটা বিজয় মিছিলেরও ব্যবস্থা হয়েছে। শুনে তো আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না!
যাইহোক, টাকা ক'টায় বেশ কয়েকদিন ভালোই চলবে। হোটেলের মাটন-চিকেনে এখন আর ভরসা নেই। ভাবছি একটা নধর পাঁঠা নিয়ে ভুলোদার বাড়িতে হানা দেব। অনেকদিনই যাওয়া হয়নি।
আর হ্যাঁ, যারা এতোদিন আমাদের একঘরে করে রেখেছিলেন, ট্রিট চাইলে এলে ঘাড়ে বুড়োদা ছুঁড়ে মারব বলে রাখলুম।।
