Sunday, 25 February 2018

ভক্তির বিপত্তি

নমস্কার, আমি হলাম শ্রীমান রাজর্ষি সরকার ওরফে রাজু। হীরুদা, সৌনকদা ওরফে বুড়োদা এবং আমি বস্তুতপক্ষে সেম খোঁয়াড়ের প্রোডাক্ট। বয়সে আমিই কনিষ্ঠ, তাই আদরে-যত্নে-সিনিয়রগিরির ঠ্যালায় গরু-কাম-বাঁদরের সংকরে পরিণত হয়েছি।

ভুলোদা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। বুড়োদার থেকে আপনারা ইতিমধ্যেই আমাদের প্রিয় ভুলোদার পরিচয় পেয়ে গেছেন। এটাও নিশ্চিত জেনে গেছেন যে আসছে শীতে ভুলোদার আর ভুলোবউদির (ভুলোবউদি বললাম বলে ক্ষেপচুনিয়াস হয়ে যাবেন না প্লিজ) চারহাত, চারপা, আটচোখ (বউদির চশমা আছে কি ছাই মনে পড়ছে না, না থাকলে না হয় একটা গগলস পরে নেবেন খন) সব এক হওয়ার দিন।

তা যাই হোক, ভুলোদার বাড়ি শেষ গিয়েছিলাম তা বেশ হপ্তাখানেক আগে। দেখলাম ভুলোদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধুচ্ছে। আমার দেখে-শুনে বেশ ভাল লাগলো। আগে ভুলোদা ঘরের ভেতরে একটা দেচকিতে হাত ধুত এখন অন্তত বাইরে এসে হাত ধুচ্ছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, 'ভুলোদা, হতে একটু জল দাও তো, মুখটা ধুয়ে নিই।' ভুলোদা কীসব আকাশ-পাতাল ভেবে ঘর থেকে অন্য একটা বোতল এনে বললে, 'এই নে, মুখ-টুখ ধুয়ে জুতো বাইরে রেখে ভিতরে আয়।' পরে জানতে পারলাম ওটা নাকি 'স্পেশাল গোমূত্র', আমাজন থেকে অর্ডার দিয়ে ভুলোদা আনিয়েছে। সেটাই দুয়ারের সামনে ছড়াচ্ছিল। শুনে আমার মাথায় লোডশেডিং হয়ে গেল। আমাদের লিডার, আমাদের  আদর্শ, কম্যুনিস্ট ভুলোদা শেষে গোমুনিস্ট হয়ে গেল!

কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো বসে রইলাম। ঘোর কাটতে দেখলাম ভুলোদা একটা সুন্দর আঁক কষা খাতায় কিসব লিখছে। আমি দেখতে গেলাম, ভুলোদা মানা করলো। বলল, 'স্নান করে আয় রাজু। পবিত্র মনে এসব দেখবি।' আমার তখনও হ্যাংওভার কাটেনি, স্নান করে আসাটাই বিধেয় মনে হল।

স্নান-টান করে এলাম। ভুলোদা তৈরি হয়েই ছিল। আমি বাবু হয়ে সামনে গিয়ে বসতেই আমার হাতে খাতাটা তুলে দিয়ে ভুলোদা বললে, 'যত্ন করে নে রাজু।' আমি হিয়ার (আমার প্রাক্তন চাপ) হাতের কথা মনে করে খাতাটা নিলাম, কোলে বসালাম, হাত বোলালাম বার কয়েক। তারপর খাতার দিকে তাকাতেই আমার চোখ মাউন্ট এভারেস্ট। সেই মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বসে দেখতে পেলাম ভুলোদা নামক সূর্যের থেকে সম্ভূত 'শ্রী শ্রী কালী মাতা সহায়' নামক রৌদ্রকিরণে বিগলিত হয়ে যাচ্ছে ধরার সব পাপ-তাপ-গ্লানি, ঝকমক করে উঠছে ভুলোদার ড্রয়িংরুমখানা!

'কী করেছো কি ভুলোদা!' আমি আঁতকে উঠলাম। ভুলোদা হাসিমুখে বলল, 'প্রতি লাইনে তিনবার, প্রতি পৃষ্ঠায় সাতাশ লাইন, দু'পাতায় একশ আটবার কালীনাম জপ! নে নে। দেরী করিস না। উচ্চারণ করে পড়া শুরু কর, দেখবি মন শুদ্ধ হয়ে যাবে।'

কি আর করা যাবে। পাল্লায় পড়েছি যখন, করতে তো হবেই। জোরে জোরে পড়তে শুরু করলাম। এতো মন দিয়ে সেমেস্টারের পড়া করলে এতদিনে একটা হিল্লে হয়ে যেত। যাইহোক, দ্বিতীয় পাতায় পৌঁছিয়েই আমি যেন ভক্তিরসের আধিক্য অনুভব করতে শুরু করলাম। প্রথম পাতার হ্রস্ব'ই' কালি দ্বিতীয় পাতায় দীর্ঘ'ঈ' কালীতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে ব্যাপারটাকে বানান ভুল ভেবে পাত্তা দিলুম না কিন্তু পরে দেখলাম ঐ পাতার প্রত্যেক কালী-ই দীর্ঘ'ঈ'। ব্রহ্মতালুতে কে যেন টং করে আঘাত করলো, আমিও আমার আধ্যত্ম চেতনার গভীরতম স্তরে উপলব্ধি করলাম অমোঘ সত্য। কে যেন কানের কাছে বলে গেল, 'ওরে পামর, চেয়ে দেখ। শ্রী শ্রী কালি মাতা সহায় ক্রমশ শ্রী শ্রী কালীইইইই মাতা সহায় তে পরিণত হয়েছে।' আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম ভক্তির ডাক যেন ট্রোপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, আয়োনোস্ফিয়ার ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কিন্তু কেন জানিনা আমার মনে হল ভক্তির ডাকটা ঠিক দেবলোকোস্ফিয়ারে পৌঁছচ্ছে না।

ভুলোদা যেন বুঝতে পেরেছিল ব্যাপারটা। তাই জিজ্ঞেস করল, 'লিখবি?'

আমিও যেন এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিলাম। বললাম, 'দাও।'

খাতা নিয়ে ভক্তিভরে লেখা শুরু করলাম। আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম কি করব। ভক্তিতরঙ্গকে আরও দুরত্ব অতিক্রম করতে হবে। তার মানে তরঙ্গের এনার্জি আরও বেশী হতে হবে। অর্থাৎ আরও উচ্চ স্বরের তথা উচ্চ স্বরবর্ণের সাহায্য নিতে হবে। তাই ঠিক পরবর্তী স্বরবর্ণ দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। ট্রায়াল এন্ড এরর মেথডে ঠিক করতে হবে।

ভক্তিরসে বিভোর হয়ে কতক্ষন লিখেছিলাম জানিনা। হঠাৎ ভুলোদা উঠে এসে বলল, 'দেখি কি লিখলি।' আমিও গদগদ চিত্তে খাতাটা এগিয়ে দিলাম, নিশ্চয়ই ভুলোদা আমার এক্সপেরিমেন্টে খুশি হবে এই বিশ্বাস রেখে।

ভুলোদা আর্কিমিডিসিয়ান 'ইউরেকা' আর্তনাদে চিৎকার করে উঠল, 'কী করেছিস!' আমিও ভুলোদার ভক্তিবাণী স্বর্গদুয়ারোস্ফিয়ারে পৌঁছানোর পন্থা আবিষ্কার করেছি ভেবে লাজুক 'ডারউইনিয়ান' হাসি হাসতে যাব এমন সময় চোখে পড়লো আরডিপি, এসআর আর অর্জুন স্যারের মুখ; কুটিল, বীভৎস, নৃশংস। যেন সেদিনের মতো আমায় বলছে, 'কি ভাবছো, পাশ করে যাবে!' বুঝতে পারলাম এক্সপেরিমেন্টটা এবারেও কেঁচিয়েছি।

-কী লিখেছিস!

-শ্রী শ্রী কালু মাতা সহায়। আমি মিনমিন করে বললাম। বস্তুতঃ স্বরবর্ণে, দীর্ঘ'ঈ'এর পর হ্রস্ব'উ'ই আসে।


পরমুহুর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম ভুলোদার বাড়ির বাইরে এবং দরজা সপাটে বন্ধ। হীরুদা তো পাড়ার মোষ-খাটালে মোষ নিয়ে বেজায় ব্যস্ত। তাই তাকে আর ঘাঁটাইনি। বুড়োদাকে বলতে গেলাম শুনলই না উলটে বললে আমি নাকি সেদিন বাবার দয়ায় হাই হয়ে ভুলোদার বাড়ি গিয়েছিলাম।


আমার দুঃখের কথা কেউই শুনলে না। এখন আপনাদের কোর্টেই বল রাখলাম। আপনারাই দেখুন।।

No comments:

Post a Comment

নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য