Sunday, 15 May 2022

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য

লকডাউন, বাজারে আগুন, আর মনে ফাগুন নিয়ে ২০২০ টা কাটিয়েই  ফেললাম। ২০২০'রই শুরুর দিকে চাকরিখানা জুটিয়েছিলাম আমি আর রাজু , সে গপ্পো তো আপনারা জানেনই। দুজনে মিলে প্ল্যান বানিয়েছিলাম সুন্দরবন যাব প্রথম মাসের মাইনে পেলে। রাজু তো ভুলোদার থেকে টাকা ধার করে আমাজন থেকে একখানা রিফারবিশড ডিএসএলআরও কিনে ফেললো, "খেঁদি, বাঘের ছবি তুলবোই বুঝলে তো! দরকার হলে তোমাকে টোপ দিয়ে বাঘ ডেকে আনবো সামনে।"

কি অসভ্য ছেলে ভাবুন দিকি! সবে হাতটা মুঠো করেছি ওর পিঠে একটা রদ্দা বসানোর জন্যে, আমার মতলব বুঝে তিড়িং করে দুপা সরে গেল, তার পর বললো, " আহা চটছ কেন! তোমাকে কি খেতে পারবে নাকি বাঘ এক সিটিং-এ! বাঘ শুনেছি খুব অলস প্রাণী, তোমার একটা ঠ্যাং শেষ করতেই ওর ল্যাদ লেগে যাবে!"

সেইটা ছিল ফেব্রুয়ারী মাস।  তারপর বাকিটা ইতিহাস। সুন্দরবনের বাঘের আর আমাকে খেতে হল না, কোন হতভাগা চীনদেশে বাদুড় খেয়ে পৃথিবী জুড়ে লকডাউন আনলো, আর আমার আর রাজুর নতুন চাকরির মাইনের অর্ধেক বেরিয়ে গেলো শুধু ৫০ টাকার ফ্লেক ব্ল্যাকে ১৫০ টাকাতে কিনে কিনে। অবশ্য তারই মধ্যে আমার একটু গতি হয়েছে বটে অন্যদিকে, হেঁ হেঁ, ঐজন্যেই মনে ফাগুন বলছিলুম, কিন্তু সেই গপ্পো রাজু বলবেখন। আমি বরং ২০২০ টা স্কিপ করে ২০২১-এর জানুয়ারিতে এনে ফেলি আপনাদের। 

আনলক ৭ বা ৮ কিছু একটা চলছে তখন দেশে। সক্কালবেলা উঠে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, আর মনটা করছে লুচি লুচি। ভুলোদার বাড়ি যাব কিনা ভাবছি, বৌদিকে বললে খান দশেক কি আর করে দেবে না! কিন্তু লকডাউন শুরু হয়ে অবধি ভুলোদার বাড়িতে ঢোকার জন্যে স্ট্রিক্ট প্রোটোকল মেনে চলতে হচ্ছে। যাওয়ার অন্তত এক ঘন্টা আগে ফোন করে জানাতে হবে। আমাদের সকলের একসেট করে জামা ভুলোদা আগেই জমা করে নিয়েছে। যে বা যারা আসবে, তারা ফোন করলে বৌদি তাদের জামা ওয়াশিং মেশিনে ফেলবে। তারপর পৌঁছালে প্রথমে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভুলোদা ফেস শিল্ড আর পি পি ই কীট পরে স্যানিটাইজার স্প্রে করবে আপাদমস্তক। তারপর সোজা গেস্ট বাথরুম। স্নান করে কাচা জামা পরলে তবে আসল বাড়িতে ঢুকতে পাওয়া যাবে।  জানুয়ারির শীতে সক্কালবেলা এত ফাসাদ পোহাবো কিনা কটা লুচির জন্যে সেইটা ভাবছি, মোবাইলটা বেজে উঠল।  ভৌস্তকদা। আমার আর রাজুর বস। ওনার সাপ্তাহিক নিউজ ওয়েবসাইট "সর্বভারতীয় নিরপেক্ষ সংবাদ"-এর আমরা দুজন একাধারে রিপোর্টার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এবং এডিটর। যদিও নামে সর্বভারতীয়,  এক বছরে হাজার খানেকের বেশি ওর ফলোয়ার হয় নি।  যদিও ভৌস্তকদা তাতে বিচলিত নন।  ওনার বক্তব্য, "এক লক্ষ জালিয়াতের আমার দরকার নেই, একশো সৎ মানুষই বিপ্লবের জন্য যথেষ্ট। যতদিন আমাদের তিনজনের বাইরে একজনও পাঠক থাকবে, ততদিন আমি ওয়েবসাইটটা চালিয়ে যাব।" 

ফোনটা রিসিভ করলাম।  ওদিক থেকে ভৌস্তকদার গম্ভীর গলা ভেসে এলো, "খেয়া, আগের সপ্তাহের কন্টেন্ট-এর ওপর পাঠকদের রিভিউ ইমেল গুলো পড়ছিলাম বুঝলে। এই আনলক ৭-এর প্রাক্কালে সবাই জানতে চাইছে এই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে কোন কোন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া যায়। মানুষ এই এত দিন ঘরবন্দি থেকে পাগল হয়ে উঠেছে, এটা নিয়ে কিছু করার দরকার। একটা ভ্রমণ স্পেশাল এডিশন বার করি চলো।"

-"হ্যাঁ ভৌস্তকদা, আইডিয়াটা ভালোই। ঠিক আছে, আমি নর্থ বেঙ্গলের দিকের জায়গা গুলো নিয়ে আজই ইন্টারনেটে একটু ঘেঁটে দেখে নিচ্ছি..রাজুকে বলছি সাউথের দিকটা দেখে নিতে.."

আমার কথা শেষ হলো না, ভৌস্তকদা প্রায় আঁতকে উঠলেন, "ইন্টারনেটে দেখে লিখবে! না না একদম নয়।  মনে রেখো, আমরা পাঠকদের খাঁটি জিনিস পরিবেশন করি, এটাই আমাদের মোটো। আর এই মারণ রোগের সময় লোককে চেনা জানা টুরিস্ট স্পটে না পাঠিয়ে আমাদের উচিত কোনো অচেনা নির্জন  জায়গায় পাঠানো। সবথেকে ভালো হল জঙ্গলের দিকে কিছু জায়গার সন্ধান দেওয়া। খোলা বাতাস আর বিশুদ্ধ অক্সিজেনে মানুষের করোনাকালো ফুসফুস ভরে উঠবে। তোমাদের আমার এক বন্ধুর বাড়ি পাঠাবো ভাবছি। সে থাকে নর্থ বেঙ্গলেই, বক্সার জঙ্গলে। ইন্ডিয়ার জঙ্গল নিয়ে ওর থেকে ভালো কেউ জানে না।  নামটা লিখে রাখো। বনংশুর নট্যাচার্য্য। জানো, ওদের কোন পূর্বপুরুষ গিরিশ ঘোষের থেকে নট্যাচার্য্য উপাধি পেয়েছিলেন। অবশ্য আমরা বন্ধুরা ওকে বুনো বলেই ডাকি। আমি ওকে বলে রাখবো। তুমি রাজর্ষিকে ফোন করে নাও।  আজ বৃহস্পতি, শনিবারের গুয়াহাটি এক্সপ্রেসে সিট আছে দেখেছি। টিকেট করে নাও, অফিসের খরচ সব, তোমরা শুধু বিলটা রাখবে।"

আমি কোনো কথা বলার আগেই ফোনটা কেটে দিলেন ভৌস্তকদা। ভদ্রলোককে যে বলবো ওনার বন্ধুর একটা কন্টাক্ট নম্বর দিতে, সেই সুযোগও হলো না।  যাইহোক, রাজুকে ফোন করলাম। সে তো শুনে মহা খুশি, "খেঁদি, ডিএসএলআর টা কিনে কটা কাক আর কুকুরের ছবি ছাড়া কিছু তোলা হয় নি।  ফ্রীতে জঙ্গল ভ্রমণ হয়ে যাবে গো, তুমি ব্যাগ গোছাও, আমি টিকিট কাটছি। বক্সা তো, আলিপুরদুয়ার হয়ে যেতে হবে মনে হয়। শোনো, তুমি ওই বুনোশুরকে একটা ফোন করে নাও, ওর বাড়ি কিভাবে যাব আলিপুরদুয়ার থেকে সেটা জেনে নাও। "

"বুনোশুর না, বনংশুর। আরে ভৌস্তকদা নম্বরটাই দেননি। ঠিক আছে, তুই টিকিট কাট, আমি জেনে নিচ্ছি ভৌস্তকদাকে ফোন করে। "

কিন্তু এরপরে একটা রীতিমতো মুশকিলে পড়লাম। টিকিট তো রাজু পেয়ে গেল, কিন্তু ভৌস্তকদার ফোন বার বার সুইচড অফ আসতে লাগল। এই বনংশুরকে ভুলোদাও চেনে না, তাই ওদিক থেকেও কোন সুবিধা হল না।  শনিবার সকালে রাজু ফোন করে বললো, "খেঁদি, যা থাকে কপালে, ট্রেনে উঠে যাই চলো। ট্রেন আলিপুরদুয়ার পৌঁছনো অবধি ভৌস্তকদাকে ফোন করে যাব। তার পর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।"

সেটাই করা ঠিক হবে ডিসাইড করলাম। 

সেইমতো একটা ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে যাচ্ছি, একটা ফোন এলো। অচেনা নম্বর। ধরলাম।  ওপার থেকে এক মহিলাকণ্ঠ ভেসে এলো, গলায় সুমিষ্ট আন্তরিকতা, "ভাই তুমি কি খেয়া কথা বলছো? আমার নাম সুছন্দা। আমি বনংশুর নট্যাচার্য্যের স্ত্রী। আমাদের বন্ধু ভৌস্তক পরশু বলেছিল তোমাদের আগামীকাল আমাদের এখানে আসার কথা।  কিন্তু তারপর আর তার কোনো পাত্তা নেই। ওকে ফোন করে পাচ্ছি না।  আমি তোমাদের ওয়েবসাইটের কন্টাক্ট থেকে তোমার নম্বরটা পেলাম।  তা তোমরা কি আসছো?"

হাতে চাঁদ পেলাম যেন। সুছন্দাদিকে বলে দিলাম যে আমরা আসছি। উনি বললেন যে আমাদের নিতে স্টেশনে নিতে আসবেন, কারন কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ওঁদের বাড়ি অবধি যায় না। রাজুকে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়ে রওনা দিলাম হাওড়া স্টেশনের দিকে। 


ট্রেন চলছে ঢিকির ঢিকির করে। সবে সে এখন মালদা টাউন ছাড়িয়েছে। আমি আর রাজু কপালক্রমে একটা সাইড আপার-সাইড লোয়ার পেয়েছি, এবং গুছিয়ে বসে মোবাইলে মাল্টিপ্লেয়ার সাপ-লুডো খেলছি। রাজুর একটা ঘুঁটি সাপের মুখে পড়ে ৯১ থেকে সদ্য ৩-এ নেমেছে, তার বন্য আনন্দে আমি  ভাবছি  বারসোই'তে নেমে একটা চা খাব কিনা। এমনসময়, কক্কর কোঁ করে একটা মুরগি ডেকে উঠলো। আমি চমকে উঠে এদিক ওদিক মুরগীটাকে খুঁজছি, রাজু বেজার মুখে বলে উঠলো, "খেঁদি, ওটা আমার মেসেজ টোন"। আমারও ফোনটা ভাইব্রেট করছিলো, নোটিফিকেশন চেক করে দেখলাম,  'ভুলোদার পালিত পোষ্য' হোয়াটস্যাপ গ্রুপে মেসেজ এসেছে একটা। শুচিস্মিতাদির মেসেজ। 

আমি হোয়াটস্যাপটা খুলতে খুলতে রাজু পড়ে ফেলেছে মেসেজটা, তার মুখটা বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে, "খেঁদি, কেস জন্ডিস তো গো!"

আমিও দেখলাম। শুচিস্মিতাদি লিখেছে, "আজ  ভোর থেকে হীরুর কোন খবর নেই।  ভোর ৫ টায় উঠে মোষ খাটালে মোষগুলোকে ব্রেকফাস্ট-এর যাবনা দিতে যাবে বলে বেরিয়েছিল, সঙ্গে বাজারের থলি নিয়ে, একেবারে বাজার করে ফিরবে। সকাল নয়টায় এই  এস এম এস টা  করেছে। তোমরা কেউ কিছু জানো কি?" এর সাথে একটা স্ক্রিনশট, হীরুদার এস এম এস টা।  সেটা এই রকম, " বিশেষ কারণে দার্জিলিং যেতে বাধ্য হচ্ছি। সুযোগ বুঝে কারণ জানাবো। নিজে থেকে আমাকে কন্টাক্ট করিস না, বিপদ আছে।"

আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। রাজু আমার থেকে বেশি উপস্থিত বুদ্ধি রাখে, সে হীরুদাকে কল করেছে ততক্ষনে। কল বেজে বেজে কেটে গেল, কেউ ধরলো না। রাজু বেশ উদ্বিগ্ন মুখে আমার দিকে তাকালো, "ব্যাপার কি বলো তো খেঁদি? হীরুদা তো এরকম ছেলে নয়, বেশ আঁটঘাট বেঁধে কাজ করার ছেলে। আমাদের মতো উঠলো বাই তো দার্জিলিং যাই করবে না।  আবার বলছে যে বিপদ আছে?"

আমিও বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। রাজুর কথাটা ঠিক।  এদিকে ভৌস্তকদাকে কল-এ পাচ্ছি না, ওদিকে হীরুদাও বেপাত্তা। গ্রুপে ততক্ষনে মিকিভাই, বকুল মেসেজ করেছে তারা কিছু জানে না বলে।  রাজুকে বললাম যে " গ্রুপে লেখ,  আমরাও কিছু জানি না, আমরা একটা আসাইনমেন্ট-এ ডুয়ার্স যাচ্ছি, এখন ট্রেনে। "

রাজু তাই লিখলো। শুচিস্মিতাদি সবার উত্তর দেখে টেখে মেসেজ করলো, "আচ্ছা, কিছু জানতে পারলে জানাস। "

এর পরে আর লুডোটা ঠিক জমলো না; দুজনে পালা করে হীরুদাকে কল করতে থাকলাম বারবার। সেই একই ফলাফল, বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে।

ঘন্টা খানেক কেটে গেল এমনি ভাবেই, ট্রেন বারসোই ঢুকবে এবার। রাজুকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছি, ও চা খাবে কিনা স্টেশনে নেমে, আমার ফোনটা  বেজে উঠলো। আননোন নাম্বার থেকে ফোন। রাজুর দিকে একবার তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করলাম ।  

ওপার থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এলো, "অ মোটাবুইন, তা কেমন আসেন? তা কোন কম্পার্টমেন্ট বুইন আপনাদের?" 

দেশলাইদার গলা।  বহুদিন দেশলাইদার সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই, আমাদের চাকরি জুটিয়ে দিয়ে উনি আবার আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেছিলেন, বছর খানেক কোনো পাত্তা ছিল না। সেই দেশলাইদা ফোন করে কম্পার্টমেন্ট জানতে চাইছেন। কিসের কম্পার্টমেন্ট?

সেই প্রশ্নটাই গলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।  

"ট্রেনের, খেঁদি, ট্রেনের।  কোন কম্পার্টমেন্টে আছিস তোরা? বল, আমরা আসছি।" এবারের  গলাটা হীরুদার। 

"-হীরুদা?" অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম আমি , রাজুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, সেও উৎসুক হয়ে শুনছে আমার কথা।  

-"হুম, বেশি না হেজিয়ে কোন কম্পার্টমেন্ট বল।  ফোন টোন করা মোটেই সেফ নয় এখন।"

গলা দিয়ে ভসভসিয়ে বেরিয়ে আসা প্রশ্ন গুলোকে দমিয়ে কোনোক্রমে বললাম, "ইয়ে, মানে, এস- সিক্স, ৩১-৩২।"

ওপার  থেকে কট করে ফোনটা কেটে গেল। রাজুর সপ্রশ্ন দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ওকে বললাম, "প্রথমে ফোন করেছিলেন দেশলাইদা, তারপর হীরুদা কম্পার্টমেন্ট জানতে চাইল। ওরা এদিকে আসছে।"

রাজুর ভ্রুদুটো এমনিই কুঁচকে থাকে সারাক্ষন। শুনে একদম জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়ে গেলো দেখলাম। 

ট্রেনটা ঘটঘট করতে করতে বারসোই ঢুকছে ততক্ষনে। গতি কমতে কমতে একেবারে থেমে যাওয়ার আগে আমার মাথায় কেউ একটা কটাস করে চাঁটি মারলো। ঘুরে দেখি হীরুদা দাঁড়িয়ে আছে।  সঙ্গে চিরাচরিত বিগলিত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেশলাইদা, ওরফে সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড।     

হীরুদার থেকে বিশেষ কোনো কথা বেরোলো না।  বারসোই তে আমরা সকলেই চা খেতে নেমেছি, সেইসময় সে শুধু এইটুকু বললো, "তোদের এখন আলিপুরদুয়ার-টুয়ার যেতে হবে না , আমার সাথে কালিম্পঙ চল। ঘোর বিপদ। "

আমি একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বলতে যাচ্ছিলাম, "ইয়ে কিন্তু আমাদের আসাইনমেন্ট...", কথা কেটে দেশলাইদা বলে উঠলেন, "হ:, ঘর বিপদ, ওরা ভৌস্তক দাদারে ধইরা ফেলাসে, হেইবার ভুলা দাদারে ধইরা ফ্যাল্লাই আর দেখিতে হইব না"..

রাজু চা শেষ করে ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে বললো, "ওরাটা কারা দাদা?"

দেশলাইদা জবাব না দিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হীরুদা বললো, "বলবো, সব বলবো। কালিম্পঙ-এ পৌঁছে সেফ লোকেশনে গিয়ে সব বলবো। ভালোই হলো তোরা জুটে গেলি, আমরা দুজনে সামলাতে পারতাম না হয়তো। প্রতিপক্ষ বেশ ক্ষমতাবান কিন্তু, ম্যাজিক ট্যাজিক জানে যা শুনছি। "

দেশলাইদা  খ্যাঁকখ্যাঁক করে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন, "যথেষ্ট হৈসে, আর নয় হেইখানে, পরে হইবো। আপনারা বুনোদারে ফোন কইরা মানা করে দিয়েন, আর আমাদের সঙ্গে চলেন খেঁদিদিদি, ভয় পাবেন না, ভৌস্তকদা কিসু কইবেন না।  আর সইত্য বলতে কি, ভৌস্তকদারে উদ্ধার করতে হইবো, তবে না চাকরি থাকুম আপনাদের। "

ওরা দুজন আর আমাদের সাথে উঠলো না, বলল নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে দেখা করে নেবে। হীরুদা আবার আমাদের বিশেষ করে বলে দিল শুচিস্মিতাদি বা অন্য কাউকে এখন ওর সাথে দেখা হওয়ার কথা না জানাতে।  আর ঘুণাক্ষরেও কাউকে না বলতে যে আমরা কালিম্পঙ যাচ্ছি। আমি আর রাজু ফিরে এসে বসলাম নিজেদের সিটে। রাজু বলল, "ও খেঁদি, তাহলে কি কেউ কিডন্যাপ করেছে ভৌস্তকদাকে ? আমরা কি তাহলে দেশলাই আর হীরুদার সাথেই যাচ্ছি ?"

-"কিডন্যাপের কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না রে ভাই।  কিন্তু হ্যাঁ, আমারও মনে হচ্ছে ওদের সাথেই যাওয়া উচিত। কিছু একটা সিরিয়াস কেস হয়েছে রে।  আচ্ছা তুই আগে জানতিস হীরুদা আর দেশলাইদা দুজন দুজনকে চেনে?"

রাজু মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে দিলো। ট্রেনটা নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছবে রাত দশটার দিকে। আমরা আর শোওয়ার চেষ্টা করলাম না। রাজু ওর ক্যামেরাটা বার করে খুটখুট করতে শুরু করলো, আর আমি ফোন করলাম বনংশুর নট্যাচার্য্যের স্ত্রী সুছন্দাদিকে । ভদ্রমহিলাকে আসবো না বলায় তিনি বেজায় মনোক্ষুণ্ণ হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "কেন ভাই? আমি যে তোমাদের জন্য বনমুরগী আনিয়ে রাখলাম, সঙ্গে আলুবোখরা? বনমুরগিটা তো ম্যারিনেটও করা হয়ে গেছে রোস্ট-এর জন্যে। বনমুরগীর রোস্ট আর আলুবোখরার চাটনির কি হবে এবার? "

বনমুরগীর ঝোল আর আলুবোখরার চাটনি! পোল্ট্রি খেয়ে খেয়ে কষা পড়ে যাওয়া জিভের জল টেনে মনে মনে হীরুদা আর দেশলাইদাকে দুটো বশিষ্ঠমুনি লেভেলের অভিশাপ দিলাম, তার পর মিনমিনে গলায় বললাম, "ইয়ে দিদি, মানে কাজ পড়ে গেছে একটু, বুঝছেনই তো।  আর ওখান থেকে কালিম্পঙ টা অনেক দূরে,  যাওয়ার কোনো ডাইরেক্ট ব্যবস্থাও তো নেই, থাকলে আগে ওখানে গিয়ে বনমুরগিটা খেয়েই তারপর যেতাম নাহয়। "

আমার কথাটা শেষ হওয়ার সাথে তিনটে জিনিস হলো। প্রথমে  রাজু দেখলাম ক্যামেরা রেখে  আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কেন সেটা বুঝলাম না, কিন্তু ওর ওরকম তাকানোতে আমার কেমন যেন পেটের ভিতরে একটা পাখি উড়তে শুরু  করেছে মনে হলো, কোনো কাজ পন্ড হয়ে গেছে বোঝার ঠিক  আগের মুহূর্তে যেমন হয়। তখনও অবশ্য আমি বুঝিনি, ঠিক কি কেস কেঁচিয়েছি। সেটা বুঝলাম সুছন্দাদির পরের প্রশ্নটা শুনে, 

ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করলেন, "ও তোমরা বুঝি কালিম্পঙ যাচ্ছ?"

নিজে তো দেখিনি, রাজু পরে বর্ণনা দিয়েছিল,  "খেঁদি, দেখলাম তোমার মুখটা এক মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল। যাক, তোমার বুদ্ধি না থাকলেও  লজ্জা ঘেন্নাটা এখনো আছে  দেখে ভালোই লেগেছিল।  " 











Monday, 2 May 2022

হিস্টেরিক্যাল হানিমুন

যাঁরা আমাদের আগের পর্ব পড়েছেন তাঁরা জানেন মিকিভাইকে পুলিশি হেফাজত থেকে বের করে আমরা চলেছি বেইজিংএর পথে, থুড়ি বেইজিং রেস্টুরেন্টের পথে।

পথে যেতে যেতে মুখ খুললো মিকিভাইয়ের। থিম-বিয়ের ব্যবসা ভালোই চলছিল মিকিভাইয়ের। গোল বাঁধলো এপ্রিলে। পুরুলিয়ার আযোধ্যা পাহাড়ে একটা বিয়ের বরাত পেয়েছিল মিকিভাই। থিম ছিল ভয়ঙ্কর ভিসুভিয়াস। তাঁবুর আকারে প্যান্ডেলটা ঠিকঠাকই নামিয়েছিল মিকিভাই। দুর্ভাগ্যবশতঃ বিয়ের দিন শর্টসার্কিট থেকে নাকি আগুন লেগে যায়। তাতেও বিপদ হওয়ার চান্স কমই ছিল। কিন্তু 'ভয়ঙ্কর ভিসুভিয়াস' থিমের বিয়েতে আগুন লেগেছে দেখে লোকে ভেবে নেয় প্র্যাঙ্ক হচ্ছে। তাই লোকজন আগুন নেভানোর জায়গায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে লুকোনো ক্যামেরা খুঁজতে। আর তাতেই ঘটে যায় বিপত্তি। বেশ কয়েকজন জখম হয়। ভয় পেয়ে মিকিভাই পুলিশ আসার আগেই পালিয়ে আসে দীঘায়। পরে অবশ্য জানতে পারে পুলিশ মিকিভাইয়ের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই দায়ের করেনি!

কিন্তু কথায় বলে না, অভাগা যেখানে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। মিকিভাইয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য দীঘা শুকিয়ে যায়নি। দু'দিন পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল দেশব্যাপী লকডাউন। মিকিভাই আটকা পড়ে যায় দীঘার হোটেলে।

তাড়াহুড়োয় ফোনটাও ভিসুভিয়াসেই ফেলে এসেছিল মিকিভাই। চেনা পরিচিত কিছু লোকের নাম্বার জোগাড় করে হোটেল মালিকের ফোন থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু অজানা নাম্বারে ফোনে কথা বললে করোনা ছড়ায় কিনা জানা না থাকায় ফোন তোলেনি কেউই। দীর্ঘ একমাস পরে মিকিভাই যখন কপর্দকশূন্য অবস্থায় বাড়ি ফেরে তখন ভুলোদাই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেয় পাশের ফ্ল্যাটে।

ইতিমধ্যে মিকিভাইয়ের তোলা মিস স্যান্ডার কিছু ছবি ইন্সটাগ্রামে ভাইরাল হয়ে যায়। মিস স্যান্ডা হয়ে ওঠে একজন ইনফ্লুয়েন্সার আর মিকিভাইয়ের অভিষেক হয় ফ্যাশান ও ডিজাইনের দুনিয়াতে। স্বামী-স্ত্রী জুটি অচিরেই স্যামি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে স্থানীয় ফ্যাশান জগতে। আর আজকেই ছিল মিকিভাইয়ের বানানো পোষাকে মিস স্যান্ডার প্রথম লোকসম্মুক্ষে আত্মপ্রকাশ।

সুনাম-পরিচিতি-খ্যাতির বাইরে একটা ব্যাপারে খচখচানি রয়েই গিয়েছিল মিস স্যান্ডার। বিয়ের দেড়বছর পরেও হানিমুনে যাওয়া হয়নি তাদের। বারবার প্ল্যান করার পরও দীঘার স্মৃতি ত্রাস হয়ে তাড়া করত মিকিভাইকে। শেষমেশ মিস স্যান্ডা কোলকাতাতেই হানিমুন সারার কথা জানায়।

প্রস্তাবটি লুফে নেয় মিকিভাই। মিস স্যান্ডার ফ্যাশান ওয়াকের থিম ছিল 'অতীত ও বর্তমান।' সেই অনুযায়ী মিকিভাই তার হানিমুনের থিম বানায় 'হিস্টোরিক্যাল হানিমুন।' ফ্যাশান শোতে মিকিভাই মিস স্যান্ডার জন্যে বানিয়েছিল স্পেশ্যাল 'নেফারতিতি কস্টিউম'। তার সাথে যোগ হয় কলকাতার ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে ঘোরা। নেই-মামার চেয়ে কানা-মামা ভালো। রাজিও হয়ে যায় মিস স্যান্ডা।

কিন্তু আজ সকালে ড্রেস খুঁজতে গিয়ে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায় স্যামির। এক রাতের মধ্যে ইঁদুরে কুঁচিকুঁচি করে কেটে রেখেছে সেটা। মিস স্যান্ডার আজই ফ্যাশান শোতে প্রথম আত্মপ্রকাশ। অনেক কষ্ট করে পাওয়া ডেট ক্যান্সেলও করা সম্ভব নয়। মাথায় হাত পরে দু'জনের। কিন্তু অতলান্ত-আটলান্টিক, হরান্ডাস-হিমালয়, ভয়ঙ্কর-ভিসুসিয়াস যার মস্তিষ্কপ্রসূত, তার কাছে এটা তো তুচ্ছই। মিকিভাই মিস স্যান্ডার পুরো শরীরে টিস্যুপেপার জড়িয়ে মিস স্যান্ডাকে বানিয়ে তোলে দ্য মমি স্যান্ডা, ফ্রম দ্য ডাইন্যাস্টি অব স্যান্ড। শীতকাল বলে আরোই কোন অসুবিধা হয়নি। মিস স্যান্ডা মমি-শরীরে জড়িয়ে নেয় জ্যাকেট ও ট্রাউজার। দু'জনে বেড়িয়ে পরে 'হিস্টোরিক্যাল হানিমুনে'।

এতদূর পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। সমস্যার সূত্রপাত হয় ময়দানে ফুচকা খেয়ে মিস স্যান্ডার পেট খারাপ শুরু হলে। মাঝ-ময়দানে সুলভ শৌচালয় খুব একটা সুলভ তো নয়ই বরং বেশ দুর্লভই। দুর্ভাগ্যবশতঃ তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে শৌচালয়ে পৌঁছে টিস্যুপেপারের জট খোলার আগেই ঘটে যায় অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা। 

শেষমেশ মানসম্মান বাঁচাতে কোমরে জ্যাকেট জড়িয়ে বেড়িয়ে আসে মিস স্যান্ডা। পরিস্থিতি বেহাল হতে পারে ভেবে মিকিভাই আগেই উবার ট্যাক্সি বলে রেখেছিল। কিন্তু উর্ধাঙ্গে টিস্যু-আবৃত জ্যান্ত তন্বী-মমি দেখতে ভীড় করা জনগণকে পেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠতে পারলে তো! 

কিছুক্ষণ পরে অচিরেই পৌঁছে যায় সাংবাদিকদের দল। খোদ কলকাতার বুকে চলমান সুন্দরী মমির মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার দিকেই তাকিয়ে থাকে তাবৎ সাংবাদিককুল। নেটদুনিয়ায় প্রচারের অন্য মাধ্যম পেয়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার ছাড়েনি স্যামি। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অনুকূল বানাতে তাদের যা জুড়ি নেই। খটাখট পোজ দিতে শুরু করে মিস স্যান্ডা। ওদিকে করোনাকালীন সময়ে লোকজমায়েতে প্ররোচনার অভিযোগ দায়ের করে কোন এক সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। পুলিশ বাধ্য হয় পৌঁছাতে। জেরা করার সময় আই-ডি কার্ড দেখতে চাইলে আধার কার্ডের ছবির সাথে মিকি-স্যান্ডা কারুর সাথেই মুখের মিল না থাকায় থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। 

ইতিমধ্যে লালবাজার থেকে দু'টি আলাদা আলাদা ডিটেকটিভের দল পৌঁছায় থানায়। একদল পৌঁছায় পাঁচবছর আগে মিউজিয়াম থেকে চুরি যাওয়া একটি মমির ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুলের কাপড়ের সন্ধানে। অন্য একটি দল পৌঁছায় নতুন প্রকারের কোন এক ভাইরাসের ব্যাপারে তদন্ত করতে।

সৌভাগ্যবশতঃ এদের মধ্যেই একজন ছিল মিস স্যান্ডার ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ার। স্বপ্নের মিস স্যান্ডাকে স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে সেই যবনিকা পতন ঘটায় সব রহস্যের। সে নিজের দায়িত্বে মিস স্যান্ডাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থাও করে। আর আমাদের অভাগা মিকিভাইয়ের নাম্বার অনেক ফোন ঘুরে উপস্থিত হয় আমার দরবারে।

"ভাই, আর যাই করিস, বউকে ফুচকা খাওয়াস না!", বেইজিং থেকে বেরিয়ে আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়ার আগে এটাই ছিল মিকিভাইয়ের শেষ কথা। 

ট্যাক্সি ছুটছে যানজটহীন রাস্তায়। হাল্কা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে ডিসেম্বরের। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার চোখের সামনে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছে মিস স্যান্ডায় ভেজা ঢেউখেলানো চুল আর একটা 'হিস্টোরিক্যাল হানিমুনের' 'হিস্টেরিক্যাল হানিমুন' হয়ে যাওয়ার কাহিনী।।

মিকিভাইয়ের মহাফ্যাসাদ

দিনকাল আর মোটেই ভালো যাচ্ছে না। চাকরিটা পেলুম আর কোথাকার কে বাদুর খেয়ে না কি, দুনিয়াটারই লকডাউন করে দিল! খবর ঠিক না ভুল বের করার চক্করে নিজেরাই এখন খবর হয়ে যাওয়ার জোগার। আগে যেখানে আমি আর খেঁদি রোজ আড্ডা দিতুম সেখানে এখন সপ্তাহে একটা করে ভিডিওকল। কাজ বলতে অমুক পার্টির তমুক লোকের স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা কথার সত্যি-মিথ্যে দেখা আর দিনরাত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মিম পাঠানো। কাল থেকে আবার তরজা লেগেছে। কে নাকি পোস্টারে 'অমুকবাবু জিন্দাবাদ' এর জায়গায় 'অমর রহে' লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে আর তাইই নাকি ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র।

পয়সাকড়ি মন্দ দিচ্ছে না। ঘরে বসে টাকা কামাও। কিন্তু তাতে কি আর আমাদের মতো বাউন্ডুলে লোকেদের মন ভরে? লকডাউন বন্ধ হতে ক'দিন আগে গিয়েছিলুম কলেজে। যে মাঠে বসে আমি, খেঁদি আর হীরুদা ঘাস ছিঁড়তুম সেখানে এখন আমাদের অনুপস্থিতিতে সাভানা জঙ্গল তৈরী হয়ে গেছে। কোনদিন হাতি কি জাগুয়ার বেড়িয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

হীরুদার পদোন্নতি হয়েছে। ছোট কালো মোষ ছেড়ে বড়ো মিশ-কালো মোষ ধোয়ার দায়িত্ব পেয়েছে। এবার ম্যানেজারের পদে গেলেই আর কাজে যেতে হবে না। অনলাইনে জুনিয়রদের মোষ ধোয়ানো শেখাবে। কথা হয়, যেটুকু ফোনে ফোনে। বকুলব্রত মাঝখানে লকডাউনের সুযোগে ক'দিন দোকানের কাজ ছেড়ে বড়ো বড়ো আবাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ডাবল দামে বাজার করে দিচ্ছিল আবাসনের লোকেদের। তাতে দু'পয়সা পেয়ে আর যোগাযোগ রাখেনি তেমন। কল্পতরু মিস স্যান্ডাকে নিয়ে ভুলোদার পাড়ায় চলে গিয়েছিল শুনেছিলাম। আর কোন খবর রাখা হয়নি।

এইসব নিয়েই কথা হচ্ছিল খেঁদির সাথে। এই লকডাউনের বাজারে খেঁদি একটা প্রেম নামিয়েছে। সেকথা আরেকদিন হবে নাহয়। এই ডিসেম্বরে বিয়ে, দিন দশেক পরে। তো সে তার সাথেই একটু বাইক-বিহারে সন্ধ্যার হাওয়া খেতে যাবে। সন্ধ্যার কথায় মিস স্যান্ডাকে মনে পড়লো। বুকের বামদিকটায় মোচড় দিয়ে উঠল খানিক। খেঁদিকে বিদায় জানিয়ে আমি পাড়ি জমালাম একলাই।

এমন সময় ফোনে বেজে উঠল মিকিভাইয়ের নাম্বার। বিয়ের পর মিকিভাইয়ের বাড়িতে কার্তিক ফেলার প্ল্যানটা প্ল্যানই থেকে গিয়েছিল। লকডাউনে পুলিশ টস জিতে এমন ব্যাটিং শুরু করেছিল কেউ আর কার্তিক নিয়ে ফিল্ডিং দেওয়ার সাহসই পায়নি। তবে এতদিন পরে ফোন করছে যখন সুসংবাদই হবে।

কিন্তু ফোন ধরে যা বুঝলাম তাতে সুসংবাদ তো মনেই হলো না। বরং গভীর দুঃসংবাদই বোঝা গেল। আমাকে এখনই ছুটতে হবে পুলিশ স্টেশনে। সাথে খেঁদি থাকলে বরং কাজে দিতো, ম্যানহোলের ঢাকনা চোর ধরার পর ভালোই ওঠাবসা হয়ে গিয়েছিল পুলিশের সাথে। সব হতচ্ছাড়া নচ্ছরগুলো বিপদে পড়লে কি আমারই ফোনে শুধু নেটওয়ার্ক থাকে!

থানায় ঢোকার মুখেই দেখা হয়ে গেল মিস স্যান্ডার সাথে। ওর বাবার সাথে বেড়িয়ে আসছে থানা থেকে। পিছনে গুচ্ছের পুলিশ। যেন আসে পাশের সব থানার পুলিশ ভীড় করেছে এই থানায়। আমার মনটা কেমন মাতাল-চিংড়ি মাতাল-চিংড়ি হয়ে গেল। আমাদের সেই মিস স্যান্ডা, দু'বছর আগের মিস স্যান্ডা এখন আরও তন্বী হয়েছে। কোঁকড়ান ভেজা চুলে তাকে আরও মোহময়ী লাগছে। পুলিশ স্টেশনেও স্নানের এরকম ব্যবস্থা থাকে! আমার বাথরুমে কলটা খারাপ হয়ে গেছে। টয়লেটের জেট-স্প্রে দিয়ে স্নান করছি বিগত সাতদিন। মিস স্যান্ডা কি রোজ এখানে স্নান করতে আসে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল মিকিভাইয়ের কথা। মিস স্যান্ডা বেড়িয়ে আসছে তো মিকিভাই কোথায়! সব ভুলে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলাম থানার ভেতরে। 

থানায় ঢুকে দেখলাম একটা চেয়ার অতিকষ্টে মিকিভাইয়ের পাহাড়প্রমাণ ভার ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। দু'বছর আগের কল্পতরু বাগচী লকডাউনের বাজারে কল্পবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সারাদিনের ধকলের ছাপ চোখে-মুখে। ভেটকি পাতুরিতে কেলিয়ে যাওয়া ভেটকির মতোই গা এলিয়ে দিয়েছে চেয়ারে। 

পুলিশি কাজকর্ম সেরে বেরুতে বেরুতে সন্ধ্যে সাতটা। এতক্ষণ মিকিভাই একটাও কথা বলেনি। কী হয়েছিল জিজ্ঞেস করতে যাবো এমন সময় মিকিভাই নিজেই জিজ্ঞেস করল, "বেইজিং যাবি?" বুঝলাম পুলিশের প্যাঁদানি খেয়ে নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়েছে মিকিভাইয়ের।

-বেইজিং! তোর কী মাথা খারাপ হয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভ চলছে আর থানা থেকে ছাড়া পেতে না পেতেই তোকে বেইজিং যেতে হবে!

-আরে যাবি কিনা বল। আমি যাচ্ছি। 

বলাবাহুল্য, আমার কেন জানিনা মনে হলো মিকিভাই সিরিয়াস। তাই মিনমিন করে বললাম, "কিন্তু আমার তো পাসপোর্ট নেই!"

-বেইজিং রেস্টুরেন্ট। তোপসিয়ায়। 

আমার আশায় নিমপাতা বেঁটে দিল একবারে! হায়রে, ল্যাম্পপোস্টকে আমি লাইটহাউস ভেবে নিয়েছিলাম! যাইহোক, মিকিভাইয়ের ঘাড় ভেঙ্গে খাওয়াটা বেশ ভালই হবে ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। একটা উবার ট্যাক্সি ডেকে রওনা দিলুম বেইজিংএর পথে।

(ক্রমশ)


পুনশ্চঃ খেঁদি কোন নতুন চরিত্র নয়, বরং পুরানো একটি মুখ্য চরিত্রই। বাংলা সাহিত্যে বিড়ম্বনাময়-উৎপটাং ছেলেদের ভীড়ে মেয়ে চরিত্র যথেষ্ট দুর্লভ। অথচ আজকালকার সমানাধিকারের যুগে যেখানে ছেলে-মেয়েরা সাবলীলভাবে মেলামেশা করতে পারে সেখানে একদল চ্যাংড়ার ভীড়ে একটা চিংড়ী থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আর যখন পুরো সিরিজটার অন্য সৃষ্টিকর্তা নিজে একজন মেয়ে, তখন গল্পের মুখ্য চরিত্রে একজন চিংড়ী থাকাটা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই প্রয়াসেই 'বুড়োদা' চরিত্রটির নাম পরিবর্তন করে খেঁদি রাখা হয়েছে। বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিল খেয়া। কিন্তু আমাদের মতো অকালকুষ্মন্ড জুনিয়রের দয়ায় খেয়াদি>খেঁদি হয়ে গেছে।

নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য