১
লকডাউন, বাজারে আগুন, আর মনে ফাগুন নিয়ে ২০২০ টা কাটিয়েই ফেললাম। ২০২০'রই শুরুর দিকে চাকরিখানা জুটিয়েছিলাম আমি আর রাজু , সে গপ্পো তো আপনারা জানেনই। দুজনে মিলে প্ল্যান বানিয়েছিলাম সুন্দরবন যাব প্রথম মাসের মাইনে পেলে। রাজু তো ভুলোদার থেকে টাকা ধার করে আমাজন থেকে একখানা রিফারবিশড ডিএসএলআরও কিনে ফেললো, "খেঁদি, বাঘের ছবি তুলবোই বুঝলে তো! দরকার হলে তোমাকে টোপ দিয়ে বাঘ ডেকে আনবো সামনে।"
কি অসভ্য ছেলে ভাবুন দিকি! সবে হাতটা মুঠো করেছি ওর পিঠে একটা রদ্দা বসানোর জন্যে, আমার মতলব বুঝে তিড়িং করে দুপা সরে গেল, তার পর বললো, " আহা চটছ কেন! তোমাকে কি খেতে পারবে নাকি বাঘ এক সিটিং-এ! বাঘ শুনেছি খুব অলস প্রাণী, তোমার একটা ঠ্যাং শেষ করতেই ওর ল্যাদ লেগে যাবে!"
সেইটা ছিল ফেব্রুয়ারী মাস। তারপর বাকিটা ইতিহাস। সুন্দরবনের বাঘের আর আমাকে খেতে হল না, কোন হতভাগা চীনদেশে বাদুড় খেয়ে পৃথিবী জুড়ে লকডাউন আনলো, আর আমার আর রাজুর নতুন চাকরির মাইনের অর্ধেক বেরিয়ে গেলো শুধু ৫০ টাকার ফ্লেক ব্ল্যাকে ১৫০ টাকাতে কিনে কিনে। অবশ্য তারই মধ্যে আমার একটু গতি হয়েছে বটে অন্যদিকে, হেঁ হেঁ, ঐজন্যেই মনে ফাগুন বলছিলুম, কিন্তু সেই গপ্পো রাজু বলবেখন। আমি বরং ২০২০ টা স্কিপ করে ২০২১-এর জানুয়ারিতে এনে ফেলি আপনাদের।
আনলক ৭ বা ৮ কিছু একটা চলছে তখন দেশে। সক্কালবেলা উঠে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, আর মনটা করছে লুচি লুচি। ভুলোদার বাড়ি যাব কিনা ভাবছি, বৌদিকে বললে খান দশেক কি আর করে দেবে না! কিন্তু লকডাউন শুরু হয়ে অবধি ভুলোদার বাড়িতে ঢোকার জন্যে স্ট্রিক্ট প্রোটোকল মেনে চলতে হচ্ছে। যাওয়ার অন্তত এক ঘন্টা আগে ফোন করে জানাতে হবে। আমাদের সকলের একসেট করে জামা ভুলোদা আগেই জমা করে নিয়েছে। যে বা যারা আসবে, তারা ফোন করলে বৌদি তাদের জামা ওয়াশিং মেশিনে ফেলবে। তারপর পৌঁছালে প্রথমে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভুলোদা ফেস শিল্ড আর পি পি ই কীট পরে স্যানিটাইজার স্প্রে করবে আপাদমস্তক। তারপর সোজা গেস্ট বাথরুম। স্নান করে কাচা জামা পরলে তবে আসল বাড়িতে ঢুকতে পাওয়া যাবে। জানুয়ারির শীতে সক্কালবেলা এত ফাসাদ পোহাবো কিনা কটা লুচির জন্যে সেইটা ভাবছি, মোবাইলটা বেজে উঠল। ভৌস্তকদা। আমার আর রাজুর বস। ওনার সাপ্তাহিক নিউজ ওয়েবসাইট "সর্বভারতীয় নিরপেক্ষ সংবাদ"-এর আমরা দুজন একাধারে রিপোর্টার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এবং এডিটর। যদিও নামে সর্বভারতীয়, এক বছরে হাজার খানেকের বেশি ওর ফলোয়ার হয় নি। যদিও ভৌস্তকদা তাতে বিচলিত নন। ওনার বক্তব্য, "এক লক্ষ জালিয়াতের আমার দরকার নেই, একশো সৎ মানুষই বিপ্লবের জন্য যথেষ্ট। যতদিন আমাদের তিনজনের বাইরে একজনও পাঠক থাকবে, ততদিন আমি ওয়েবসাইটটা চালিয়ে যাব।"
ফোনটা রিসিভ করলাম। ওদিক থেকে ভৌস্তকদার গম্ভীর গলা ভেসে এলো, "খেয়া, আগের সপ্তাহের কন্টেন্ট-এর ওপর পাঠকদের রিভিউ ইমেল গুলো পড়ছিলাম বুঝলে। এই আনলক ৭-এর প্রাক্কালে সবাই জানতে চাইছে এই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে কোন কোন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া যায়। মানুষ এই এত দিন ঘরবন্দি থেকে পাগল হয়ে উঠেছে, এটা নিয়ে কিছু করার দরকার। একটা ভ্রমণ স্পেশাল এডিশন বার করি চলো।"
-"হ্যাঁ ভৌস্তকদা, আইডিয়াটা ভালোই। ঠিক আছে, আমি নর্থ বেঙ্গলের দিকের জায়গা গুলো নিয়ে আজই ইন্টারনেটে একটু ঘেঁটে দেখে নিচ্ছি..রাজুকে বলছি সাউথের দিকটা দেখে নিতে.."
আমার কথা শেষ হলো না, ভৌস্তকদা প্রায় আঁতকে উঠলেন, "ইন্টারনেটে দেখে লিখবে! না না একদম নয়। মনে রেখো, আমরা পাঠকদের খাঁটি জিনিস পরিবেশন করি, এটাই আমাদের মোটো। আর এই মারণ রোগের সময় লোককে চেনা জানা টুরিস্ট স্পটে না পাঠিয়ে আমাদের উচিত কোনো অচেনা নির্জন জায়গায় পাঠানো। সবথেকে ভালো হল জঙ্গলের দিকে কিছু জায়গার সন্ধান দেওয়া। খোলা বাতাস আর বিশুদ্ধ অক্সিজেনে মানুষের করোনাকালো ফুসফুস ভরে উঠবে। তোমাদের আমার এক বন্ধুর বাড়ি পাঠাবো ভাবছি। সে থাকে নর্থ বেঙ্গলেই, বক্সার জঙ্গলে। ইন্ডিয়ার জঙ্গল নিয়ে ওর থেকে ভালো কেউ জানে না। নামটা লিখে রাখো। বনংশুর নট্যাচার্য্য। জানো, ওদের কোন পূর্বপুরুষ গিরিশ ঘোষের থেকে নট্যাচার্য্য উপাধি পেয়েছিলেন। অবশ্য আমরা বন্ধুরা ওকে বুনো বলেই ডাকি। আমি ওকে বলে রাখবো। তুমি রাজর্ষিকে ফোন করে নাও। আজ বৃহস্পতি, শনিবারের গুয়াহাটি এক্সপ্রেসে সিট আছে দেখেছি। টিকেট করে নাও, অফিসের খরচ সব, তোমরা শুধু বিলটা রাখবে।"
আমি কোনো কথা বলার আগেই ফোনটা কেটে দিলেন ভৌস্তকদা। ভদ্রলোককে যে বলবো ওনার বন্ধুর একটা কন্টাক্ট নম্বর দিতে, সেই সুযোগও হলো না। যাইহোক, রাজুকে ফোন করলাম। সে তো শুনে মহা খুশি, "খেঁদি, ডিএসএলআর টা কিনে কটা কাক আর কুকুরের ছবি ছাড়া কিছু তোলা হয় নি। ফ্রীতে জঙ্গল ভ্রমণ হয়ে যাবে গো, তুমি ব্যাগ গোছাও, আমি টিকিট কাটছি। বক্সা তো, আলিপুরদুয়ার হয়ে যেতে হবে মনে হয়। শোনো, তুমি ওই বুনোশুরকে একটা ফোন করে নাও, ওর বাড়ি কিভাবে যাব আলিপুরদুয়ার থেকে সেটা জেনে নাও। "
"বুনোশুর না, বনংশুর। আরে ভৌস্তকদা নম্বরটাই দেননি। ঠিক আছে, তুই টিকিট কাট, আমি জেনে নিচ্ছি ভৌস্তকদাকে ফোন করে। "
কিন্তু এরপরে একটা রীতিমতো মুশকিলে পড়লাম। টিকিট তো রাজু পেয়ে গেল, কিন্তু ভৌস্তকদার ফোন বার বার সুইচড অফ আসতে লাগল। এই বনংশুরকে ভুলোদাও চেনে না, তাই ওদিক থেকেও কোন সুবিধা হল না। শনিবার সকালে রাজু ফোন করে বললো, "খেঁদি, যা থাকে কপালে, ট্রেনে উঠে যাই চলো। ট্রেন আলিপুরদুয়ার পৌঁছনো অবধি ভৌস্তকদাকে ফোন করে যাব। তার পর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।"
সেটাই করা ঠিক হবে ডিসাইড করলাম।
সেইমতো একটা ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে যাচ্ছি, একটা ফোন এলো। অচেনা নম্বর। ধরলাম। ওপার থেকে এক মহিলাকণ্ঠ ভেসে এলো, গলায় সুমিষ্ট আন্তরিকতা, "ভাই তুমি কি খেয়া কথা বলছো? আমার নাম সুছন্দা। আমি বনংশুর নট্যাচার্য্যের স্ত্রী। আমাদের বন্ধু ভৌস্তক পরশু বলেছিল তোমাদের আগামীকাল আমাদের এখানে আসার কথা। কিন্তু তারপর আর তার কোনো পাত্তা নেই। ওকে ফোন করে পাচ্ছি না। আমি তোমাদের ওয়েবসাইটের কন্টাক্ট থেকে তোমার নম্বরটা পেলাম। তা তোমরা কি আসছো?"
হাতে চাঁদ পেলাম যেন। সুছন্দাদিকে বলে দিলাম যে আমরা আসছি। উনি বললেন যে আমাদের নিতে স্টেশনে নিতে আসবেন, কারন কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ওঁদের বাড়ি অবধি যায় না। রাজুকে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়ে রওনা দিলাম হাওড়া স্টেশনের দিকে।
২
ট্রেন চলছে ঢিকির ঢিকির করে। সবে সে এখন মালদা টাউন ছাড়িয়েছে। আমি আর রাজু কপালক্রমে একটা সাইড আপার-সাইড লোয়ার পেয়েছি, এবং গুছিয়ে বসে মোবাইলে মাল্টিপ্লেয়ার সাপ-লুডো খেলছি। রাজুর একটা ঘুঁটি সাপের মুখে পড়ে ৯১ থেকে সদ্য ৩-এ নেমেছে, তার বন্য আনন্দে আমি ভাবছি বারসোই'তে নেমে একটা চা খাব কিনা। এমনসময়, কক্কর কোঁ করে একটা মুরগি ডেকে উঠলো। আমি চমকে উঠে এদিক ওদিক মুরগীটাকে খুঁজছি, রাজু বেজার মুখে বলে উঠলো, "খেঁদি, ওটা আমার মেসেজ টোন"। আমারও ফোনটা ভাইব্রেট করছিলো, নোটিফিকেশন চেক করে দেখলাম, 'ভুলোদার পালিত পোষ্য' হোয়াটস্যাপ গ্রুপে মেসেজ এসেছে একটা। শুচিস্মিতাদির মেসেজ।
আমি হোয়াটস্যাপটা খুলতে খুলতে রাজু পড়ে ফেলেছে মেসেজটা, তার মুখটা বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে, "খেঁদি, কেস জন্ডিস তো গো!"
আমিও দেখলাম। শুচিস্মিতাদি লিখেছে, "আজ ভোর থেকে হীরুর কোন খবর নেই। ভোর ৫ টায় উঠে মোষ খাটালে মোষগুলোকে ব্রেকফাস্ট-এর যাবনা দিতে যাবে বলে বেরিয়েছিল, সঙ্গে বাজারের থলি নিয়ে, একেবারে বাজার করে ফিরবে। সকাল নয়টায় এই এস এম এস টা করেছে। তোমরা কেউ কিছু জানো কি?" এর সাথে একটা স্ক্রিনশট, হীরুদার এস এম এস টা। সেটা এই রকম, " বিশেষ কারণে দার্জিলিং যেতে বাধ্য হচ্ছি। সুযোগ বুঝে কারণ জানাবো। নিজে থেকে আমাকে কন্টাক্ট করিস না, বিপদ আছে।"
আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। রাজু আমার থেকে বেশি উপস্থিত বুদ্ধি রাখে, সে হীরুদাকে কল করেছে ততক্ষনে। কল বেজে বেজে কেটে গেল, কেউ ধরলো না। রাজু বেশ উদ্বিগ্ন মুখে আমার দিকে তাকালো, "ব্যাপার কি বলো তো খেঁদি? হীরুদা তো এরকম ছেলে নয়, বেশ আঁটঘাট বেঁধে কাজ করার ছেলে। আমাদের মতো উঠলো বাই তো দার্জিলিং যাই করবে না। আবার বলছে যে বিপদ আছে?"
আমিও বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। রাজুর কথাটা ঠিক। এদিকে ভৌস্তকদাকে কল-এ পাচ্ছি না, ওদিকে হীরুদাও বেপাত্তা। গ্রুপে ততক্ষনে মিকিভাই, বকুল মেসেজ করেছে তারা কিছু জানে না বলে। রাজুকে বললাম যে " গ্রুপে লেখ, আমরাও কিছু জানি না, আমরা একটা আসাইনমেন্ট-এ ডুয়ার্স যাচ্ছি, এখন ট্রেনে। "
রাজু তাই লিখলো। শুচিস্মিতাদি সবার উত্তর দেখে টেখে মেসেজ করলো, "আচ্ছা, কিছু জানতে পারলে জানাস। "
এর পরে আর লুডোটা ঠিক জমলো না; দুজনে পালা করে হীরুদাকে কল করতে থাকলাম বারবার। সেই একই ফলাফল, বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে।
ঘন্টা খানেক কেটে গেল এমনি ভাবেই, ট্রেন বারসোই ঢুকবে এবার। রাজুকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছি, ও চা খাবে কিনা স্টেশনে নেমে, আমার ফোনটা বেজে উঠলো। আননোন নাম্বার থেকে ফোন। রাজুর দিকে একবার তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করলাম ।
ওপার থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এলো, "অ মোটাবুইন, তা কেমন আসেন? তা কোন কম্পার্টমেন্ট বুইন আপনাদের?"
দেশলাইদার গলা। বহুদিন দেশলাইদার সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই, আমাদের চাকরি জুটিয়ে দিয়ে উনি আবার আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেছিলেন, বছর খানেক কোনো পাত্তা ছিল না। সেই দেশলাইদা ফোন করে কম্পার্টমেন্ট জানতে চাইছেন। কিসের কম্পার্টমেন্ট?
সেই প্রশ্নটাই গলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
"ট্রেনের, খেঁদি, ট্রেনের। কোন কম্পার্টমেন্টে আছিস তোরা? বল, আমরা আসছি।" এবারের গলাটা হীরুদার।
"-হীরুদা?" অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম আমি , রাজুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, সেও উৎসুক হয়ে শুনছে আমার কথা।
-"হুম, বেশি না হেজিয়ে কোন কম্পার্টমেন্ট বল। ফোন টোন করা মোটেই সেফ নয় এখন।"
গলা দিয়ে ভসভসিয়ে বেরিয়ে আসা প্রশ্ন গুলোকে দমিয়ে কোনোক্রমে বললাম, "ইয়ে, মানে, এস- সিক্স, ৩১-৩২।"
ওপার থেকে কট করে ফোনটা কেটে গেল। রাজুর সপ্রশ্ন দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ওকে বললাম, "প্রথমে ফোন করেছিলেন দেশলাইদা, তারপর হীরুদা কম্পার্টমেন্ট জানতে চাইল। ওরা এদিকে আসছে।"
রাজুর ভ্রুদুটো এমনিই কুঁচকে থাকে সারাক্ষন। শুনে একদম জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়ে গেলো দেখলাম।
ট্রেনটা ঘটঘট করতে করতে বারসোই ঢুকছে ততক্ষনে। গতি কমতে কমতে একেবারে থেমে যাওয়ার আগে আমার মাথায় কেউ একটা কটাস করে চাঁটি মারলো। ঘুরে দেখি হীরুদা দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে চিরাচরিত বিগলিত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেশলাইদা, ওরফে সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড।
৩
হীরুদার থেকে বিশেষ কোনো কথা বেরোলো না। বারসোই তে আমরা সকলেই চা খেতে নেমেছি, সেইসময় সে শুধু এইটুকু বললো, "তোদের এখন আলিপুরদুয়ার-টুয়ার যেতে হবে না , আমার সাথে কালিম্পঙ চল। ঘোর বিপদ। "
আমি একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বলতে যাচ্ছিলাম, "ইয়ে কিন্তু আমাদের আসাইনমেন্ট...", কথা কেটে দেশলাইদা বলে উঠলেন, "হ:, ঘর বিপদ, ওরা ভৌস্তক দাদারে ধইরা ফেলাসে, হেইবার ভুলা দাদারে ধইরা ফ্যাল্লাই আর দেখিতে হইব না"..
রাজু চা শেষ করে ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে বললো, "ওরাটা কারা দাদা?"
দেশলাইদা জবাব না দিয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হীরুদা বললো, "বলবো, সব বলবো। কালিম্পঙ-এ পৌঁছে সেফ লোকেশনে গিয়ে সব বলবো। ভালোই হলো তোরা জুটে গেলি, আমরা দুজনে সামলাতে পারতাম না হয়তো। প্রতিপক্ষ বেশ ক্ষমতাবান কিন্তু, ম্যাজিক ট্যাজিক জানে যা শুনছি। "
দেশলাইদা খ্যাঁকখ্যাঁক করে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন, "যথেষ্ট হৈসে, আর নয় হেইখানে, পরে হইবো। আপনারা বুনোদারে ফোন কইরা মানা করে দিয়েন, আর আমাদের সঙ্গে চলেন খেঁদিদিদি, ভয় পাবেন না, ভৌস্তকদা কিসু কইবেন না। আর সইত্য বলতে কি, ভৌস্তকদারে উদ্ধার করতে হইবো, তবে না চাকরি থাকুম আপনাদের। "
ওরা দুজন আর আমাদের সাথে উঠলো না, বলল নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে দেখা করে নেবে। হীরুদা আবার আমাদের বিশেষ করে বলে দিল শুচিস্মিতাদি বা অন্য কাউকে এখন ওর সাথে দেখা হওয়ার কথা না জানাতে। আর ঘুণাক্ষরেও কাউকে না বলতে যে আমরা কালিম্পঙ যাচ্ছি। আমি আর রাজু ফিরে এসে বসলাম নিজেদের সিটে। রাজু বলল, "ও খেঁদি, তাহলে কি কেউ কিডন্যাপ করেছে ভৌস্তকদাকে ? আমরা কি তাহলে দেশলাই আর হীরুদার সাথেই যাচ্ছি ?"
-"কিডন্যাপের কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না রে ভাই। কিন্তু হ্যাঁ, আমারও মনে হচ্ছে ওদের সাথেই যাওয়া উচিত। কিছু একটা সিরিয়াস কেস হয়েছে রে। আচ্ছা তুই আগে জানতিস হীরুদা আর দেশলাইদা দুজন দুজনকে চেনে?"
রাজু মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে দিলো। ট্রেনটা নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছবে রাত দশটার দিকে। আমরা আর শোওয়ার চেষ্টা করলাম না। রাজু ওর ক্যামেরাটা বার করে খুটখুট করতে শুরু করলো, আর আমি ফোন করলাম বনংশুর নট্যাচার্য্যের স্ত্রী সুছন্দাদিকে । ভদ্রমহিলাকে আসবো না বলায় তিনি বেজায় মনোক্ষুণ্ণ হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "কেন ভাই? আমি যে তোমাদের জন্য বনমুরগী আনিয়ে রাখলাম, সঙ্গে আলুবোখরা? বনমুরগিটা তো ম্যারিনেটও করা হয়ে গেছে রোস্ট-এর জন্যে। বনমুরগীর রোস্ট আর আলুবোখরার চাটনির কি হবে এবার? "
বনমুরগীর ঝোল আর আলুবোখরার চাটনি! পোল্ট্রি খেয়ে খেয়ে কষা পড়ে যাওয়া জিভের জল টেনে মনে মনে হীরুদা আর দেশলাইদাকে দুটো বশিষ্ঠমুনি লেভেলের অভিশাপ দিলাম, তার পর মিনমিনে গলায় বললাম, "ইয়ে দিদি, মানে কাজ পড়ে গেছে একটু, বুঝছেনই তো। আর ওখান থেকে কালিম্পঙ টা অনেক দূরে, যাওয়ার কোনো ডাইরেক্ট ব্যবস্থাও তো নেই, থাকলে আগে ওখানে গিয়ে বনমুরগিটা খেয়েই তারপর যেতাম নাহয়। "
আমার কথাটা শেষ হওয়ার সাথে তিনটে জিনিস হলো। প্রথমে রাজু দেখলাম ক্যামেরা রেখে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কেন সেটা বুঝলাম না, কিন্তু ওর ওরকম তাকানোতে আমার কেমন যেন পেটের ভিতরে একটা পাখি উড়তে শুরু করেছে মনে হলো, কোনো কাজ পন্ড হয়ে গেছে বোঝার ঠিক আগের মুহূর্তে যেমন হয়। তখনও অবশ্য আমি বুঝিনি, ঠিক কি কেস কেঁচিয়েছি। সেটা বুঝলাম সুছন্দাদির পরের প্রশ্নটা শুনে,
ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করলেন, "ও তোমরা বুঝি কালিম্পঙ যাচ্ছ?"
নিজে তো দেখিনি, রাজু পরে বর্ণনা দিয়েছিল, "খেঁদি, দেখলাম তোমার মুখটা এক মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল। যাক, তোমার বুদ্ধি না থাকলেও লজ্জা ঘেন্নাটা এখনো আছে দেখে ভালোই লেগেছিল। "