Wednesday, 28 February 2018

ডি ফর দেবদূত


বাবার দয়াই হোক আর মা কালি/কালীর দয়াই হোক, সেদিন ভুলোদার বাড়িতে মুখ ঝামটা খাবার পর থেকে আমার লেখাপড়া কিন্তু হেব্বি চলছে। এখন পড়তে পড়তে রাতে হাল্কা ঘুমিয়ে পড়লেই তো স্বপ্নে আরডিপি, এসআর আর অর্জুন স্যারের মুখ একসাথে ভেসে ওঠে আর ভয়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়তেও শুরু করে দিই। কাউকে বলবেন না, একদিন তো আবার ভয় পেয়ে...
যাইহোক, গ্ৰুপ ডির পরীক্ষার ফর্ম তুলতে গিয়েছিলাম সেদিন। এমনিতে তো চিরকাল ডি পেয়েই পাশ করেছি। এককালে তো ভুলোদার কাছে ডি ফর ডানহিলে সুখটান দিতে দিতে ডি ফর 'পিসির' আলোচনা চলতো। ভাগ্য ভালো থাকলে মানুষ যেমন মাঝে মাঝে সি বা বি পেয়ে যায় আমাদেরও তেমনি মাঝে মধ্যে চিকেন, বাটারনান জুটে যেত। সেই আমি গ্রূপ ডির ফর্ম তুলবো এ তো ভবিতব্য।
কিন্তু ওই কথায় আছে না, অভাগা যেখানে যায়, হিরোশিমা হয়ে যায়। আমারো হল তাই। দিব্যি দাঁড়িয়ে ছিলাম স্কোয়াডে, হঠাৎ উলটে গেলাম। চোখ খুলে দেখি হাসপাতাল। একে তো ক'দিন ভুলোদার হাতের অমৃত খাওয়া হয়নি, তারপর পড়াশুনা করেছি ঢের। অভ্যাস না থাকলে যা হয়।
হাসপাতালের খাবার দিয়ে গেছে। সে খাবার এত সুস্বাদু যে অজ্ঞান মানুষও আরেকবার জ্ঞান হারাবে। কিন্তু কী আর করা যাবে। ভুলোদা তো আমায় ভুলেই গেছে, এখন জীবনধারণের জন্য এই খাবারই খেতে হবে।
কিন্তু ওই যে বলেছি, ভাগ্য ভালো থাকলে মানুষ যেমন মাঝে মাঝে সি বা বি পেয়ে যায়। হঠাৎ দেখলাম  একটা রোগামত আলমারী, যার মাথায় একটা উলটানো বিরিয়ানির হাঁড়ি, তার উপর একটা পেল্লায় ঢাউস সাইজের হেডফোন আর হাতে আনন্দবাজার পত্রিকার সাইজের একটা ট্যাবলেট; এ যে আমাদের ভুলোদা ছাড়া কেউ হতেই পারে না তা আমি একটা ডানহিলের বাজি রেখে লিখে দিতে পারি।
আমি পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুঝলাম। ভুলোদা আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, 'ভালো আছ?'
একটু অবাক হলাম বই ভুলোদার আমায় 'তুমি' সম্বোধনে। কিন্তু মানুষ মারা গেলে যদি তার সম্মান আকাশচুম্বী হয় তবে শরীর খারাপ হলে একটু তো বাড়তে পারেই। চোখ বন্ধ করেই বললাম, 'হ্যাঁ'
-সকালে ব্রেকফাস্ট করেছ?
-আর ব্রেকফাস্ট। দেখছ তো কী দিয়েছে।
-রেস্ট নাও। যা ধকল গেল তোমার।
-হ্যাঁ
-তোমার সাথে পরে কথা বলব। রাখি তাহলে?
কানের কাছে কে যেন বলে উঠলো, 'ওরে পামর, চেয়ে দেখ। তুই কোথাকার কে! ভুলোদা ভুলোবৌদির সাথে কথা বলছে, তোর সাথে নয়।' বুকের ভিতর নাগাসাকি এসে পড়লো।
চোখ খুললাম। ভুলোদার মুখে সেই আদি অকৃত্রিম হাসি। যে হাসি কয়েক হপ্তা আগে মা কালির স্থানান্তরণের আগে পর্যন্ত দেখেছিলাম। ভুলোদা বলল, তাড়াতাড়ি সেরে ওঠ। আমার বাড়িতে তোর নেমন্তন্ন আছে।

ডি ফর ডেঞ্জারই হবে কে বলেছে? ডি ফর দেবদূতও হয় মাঝেমধ্যে।।

ভুলোদার প্রেম -২

ভুলোদাকে নিশ্চয়ই সক্কলের মনে আছে? আমার, রাজুর আর হীরুদার লোকাল গার্জেন ভুলোদা? যার হাতের লেগ-ফ্রাই খেয়ে পিসিমনির মাথায়  লেগ-ফ্রাই শিল্পের পরিকল্পনা এসেছিলো? তা এই ভুলোদা এতদিন ধরে আমাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবার আগামী ফাল্গুনে সরকারিভাবে হোম-মিনিস্টার ঘরে আনতে চলেছেন।

ভুল বুঝবেন না, আমরা তিনজন খুবই খুশি গোটা ব্যাপারটায়, কিন্তু কথা হোলো গিয়ে, একটু একটু করে নিজেদের দায়ভার নিজেদের বুঝে নিতে হচ্ছে। তার মধ্যে আমাদের হবু বৌদিমণির পাড়ার ছেলে বকুলব্রত বিশ্বাস ভুলোদার বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেছে। বকুলের একটা চাকরির দরকার, কলকাতায় থাকলে চাকরি-বাকরির সুবিধা,বৌদির সুপারিশে বকুল এসে ঢুকে পড়েছে একেবারে ভুলোদার রান্নাঘরে। ভুলোদার গোল্ড-ফ্লেক লাইট থেকে বিরিয়ানির লেগ-পিস্ এখন ওই পায়, আমাদের কপালে চা আর ব্রিটানিয়া মারি!

ভুলোদার বাড়িতে আজকাল আর যাওয়াও  যায় না! ভুলোদাকে আজকাল গান পেয়েছে! আর সে কি ভয়াবহ গান! ভুতের রাজা ছাড়া সে গান নেওয়ার ক্ষমতা এই দুনিয়ায় কারো নেই! প্রেমে পড়লে মানুষ একটু আধটু গান -টান গে, তাই বলে ক্রমাগত নাকি সুরে চিঁচিঁ ডাক ছেড়ে 'সখি ভাবনা কাহারে বলে!' উফফ ! হীরুদা তো বলেই দিয়েছে, সুর না, অসুর ভর করেছে ভুলোদাতে!


রাগ হওয়ার আরেক খান কারণ আছে আমার আর রাজুর! হীরুদা এর মধ্যে পাশের পাড়ার মোষ-খাটালে ম্যানেজারের চাকরি জুটিয়েছে, সামনের হপ্তায় জয়েনিং! সব্বার কিছু না কিছু ভালো হচ্ছেই! শুধু  আমাদেরি ফাটা কপাল! আমার একখান টুইশানি ছিলো, অনেক ধরে করে এবং ভুলোদার সুপারিশ কাজে লাগিয়ে পাড়ার সুন্দরী মামনি সুগন্ধাকে অঙ্ক কষাতে যেতাম। তা কবি মানুষ তো, চার বাই চার ম্যাট্রিক্স কষাতে গিয়ে সুগন্ধাকে নিয়ে চার বাই চার ছন্দে কবিতা লিখে ফেলেছিলাম ওরই খাতায়! পরের দিন সযত্নে বিদায়; চাকরি তো গেলোই.যে মাসটা পড়াতে গেছিলাম টাকাও পেলাম না!

রাজুটার হালও সমানভাবে খারাপ, বেচারা কাল বলছিলো প্রাইমারি স্কুলে চাকরির ফর্ম তুলতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে, ডাক্তার বেড-রেস্ট দিয়েছে! আগে হলে এইসব দিনে ভুলোদার বাড়ি গিয়ে পিসিমনির ভার্চুয়াল শ্রাদ্ধ করা যেত.... কিন্তু থাক, যা গেছে তা যাক!

আপাতত আমি আর রাজু গড়ের মাঠে বসে ঘাস ছিড়ছি, আর চিবুচ্ছি, আর গান গাইছি,'we shall overcome.." ওই যাঃ, গলায় ঘাস আটকে গেলো নাকি এই রে..এ যে কোথাও শান্তি নেই!


Sunday, 25 February 2018

ভক্তির বিপত্তি

নমস্কার, আমি হলাম শ্রীমান রাজর্ষি সরকার ওরফে রাজু। হীরুদা, সৌনকদা ওরফে বুড়োদা এবং আমি বস্তুতপক্ষে সেম খোঁয়াড়ের প্রোডাক্ট। বয়সে আমিই কনিষ্ঠ, তাই আদরে-যত্নে-সিনিয়রগিরির ঠ্যালায় গরু-কাম-বাঁদরের সংকরে পরিণত হয়েছি।

ভুলোদা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। বুড়োদার থেকে আপনারা ইতিমধ্যেই আমাদের প্রিয় ভুলোদার পরিচয় পেয়ে গেছেন। এটাও নিশ্চিত জেনে গেছেন যে আসছে শীতে ভুলোদার আর ভুলোবউদির (ভুলোবউদি বললাম বলে ক্ষেপচুনিয়াস হয়ে যাবেন না প্লিজ) চারহাত, চারপা, আটচোখ (বউদির চশমা আছে কি ছাই মনে পড়ছে না, না থাকলে না হয় একটা গগলস পরে নেবেন খন) সব এক হওয়ার দিন।

তা যাই হোক, ভুলোদার বাড়ি শেষ গিয়েছিলাম তা বেশ হপ্তাখানেক আগে। দেখলাম ভুলোদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধুচ্ছে। আমার দেখে-শুনে বেশ ভাল লাগলো। আগে ভুলোদা ঘরের ভেতরে একটা দেচকিতে হাত ধুত এখন অন্তত বাইরে এসে হাত ধুচ্ছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, 'ভুলোদা, হতে একটু জল দাও তো, মুখটা ধুয়ে নিই।' ভুলোদা কীসব আকাশ-পাতাল ভেবে ঘর থেকে অন্য একটা বোতল এনে বললে, 'এই নে, মুখ-টুখ ধুয়ে জুতো বাইরে রেখে ভিতরে আয়।' পরে জানতে পারলাম ওটা নাকি 'স্পেশাল গোমূত্র', আমাজন থেকে অর্ডার দিয়ে ভুলোদা আনিয়েছে। সেটাই দুয়ারের সামনে ছড়াচ্ছিল। শুনে আমার মাথায় লোডশেডিং হয়ে গেল। আমাদের লিডার, আমাদের  আদর্শ, কম্যুনিস্ট ভুলোদা শেষে গোমুনিস্ট হয়ে গেল!

কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো বসে রইলাম। ঘোর কাটতে দেখলাম ভুলোদা একটা সুন্দর আঁক কষা খাতায় কিসব লিখছে। আমি দেখতে গেলাম, ভুলোদা মানা করলো। বলল, 'স্নান করে আয় রাজু। পবিত্র মনে এসব দেখবি।' আমার তখনও হ্যাংওভার কাটেনি, স্নান করে আসাটাই বিধেয় মনে হল।

স্নান-টান করে এলাম। ভুলোদা তৈরি হয়েই ছিল। আমি বাবু হয়ে সামনে গিয়ে বসতেই আমার হাতে খাতাটা তুলে দিয়ে ভুলোদা বললে, 'যত্ন করে নে রাজু।' আমি হিয়ার (আমার প্রাক্তন চাপ) হাতের কথা মনে করে খাতাটা নিলাম, কোলে বসালাম, হাত বোলালাম বার কয়েক। তারপর খাতার দিকে তাকাতেই আমার চোখ মাউন্ট এভারেস্ট। সেই মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বসে দেখতে পেলাম ভুলোদা নামক সূর্যের থেকে সম্ভূত 'শ্রী শ্রী কালী মাতা সহায়' নামক রৌদ্রকিরণে বিগলিত হয়ে যাচ্ছে ধরার সব পাপ-তাপ-গ্লানি, ঝকমক করে উঠছে ভুলোদার ড্রয়িংরুমখানা!

'কী করেছো কি ভুলোদা!' আমি আঁতকে উঠলাম। ভুলোদা হাসিমুখে বলল, 'প্রতি লাইনে তিনবার, প্রতি পৃষ্ঠায় সাতাশ লাইন, দু'পাতায় একশ আটবার কালীনাম জপ! নে নে। দেরী করিস না। উচ্চারণ করে পড়া শুরু কর, দেখবি মন শুদ্ধ হয়ে যাবে।'

কি আর করা যাবে। পাল্লায় পড়েছি যখন, করতে তো হবেই। জোরে জোরে পড়তে শুরু করলাম। এতো মন দিয়ে সেমেস্টারের পড়া করলে এতদিনে একটা হিল্লে হয়ে যেত। যাইহোক, দ্বিতীয় পাতায় পৌঁছিয়েই আমি যেন ভক্তিরসের আধিক্য অনুভব করতে শুরু করলাম। প্রথম পাতার হ্রস্ব'ই' কালি দ্বিতীয় পাতায় দীর্ঘ'ঈ' কালীতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে ব্যাপারটাকে বানান ভুল ভেবে পাত্তা দিলুম না কিন্তু পরে দেখলাম ঐ পাতার প্রত্যেক কালী-ই দীর্ঘ'ঈ'। ব্রহ্মতালুতে কে যেন টং করে আঘাত করলো, আমিও আমার আধ্যত্ম চেতনার গভীরতম স্তরে উপলব্ধি করলাম অমোঘ সত্য। কে যেন কানের কাছে বলে গেল, 'ওরে পামর, চেয়ে দেখ। শ্রী শ্রী কালি মাতা সহায় ক্রমশ শ্রী শ্রী কালীইইইই মাতা সহায় তে পরিণত হয়েছে।' আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম ভক্তির ডাক যেন ট্রোপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, আয়োনোস্ফিয়ার ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কিন্তু কেন জানিনা আমার মনে হল ভক্তির ডাকটা ঠিক দেবলোকোস্ফিয়ারে পৌঁছচ্ছে না।

ভুলোদা যেন বুঝতে পেরেছিল ব্যাপারটা। তাই জিজ্ঞেস করল, 'লিখবি?'

আমিও যেন এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিলাম। বললাম, 'দাও।'

খাতা নিয়ে ভক্তিভরে লেখা শুরু করলাম। আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম কি করব। ভক্তিতরঙ্গকে আরও দুরত্ব অতিক্রম করতে হবে। তার মানে তরঙ্গের এনার্জি আরও বেশী হতে হবে। অর্থাৎ আরও উচ্চ স্বরের তথা উচ্চ স্বরবর্ণের সাহায্য নিতে হবে। তাই ঠিক পরবর্তী স্বরবর্ণ দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। ট্রায়াল এন্ড এরর মেথডে ঠিক করতে হবে।

ভক্তিরসে বিভোর হয়ে কতক্ষন লিখেছিলাম জানিনা। হঠাৎ ভুলোদা উঠে এসে বলল, 'দেখি কি লিখলি।' আমিও গদগদ চিত্তে খাতাটা এগিয়ে দিলাম, নিশ্চয়ই ভুলোদা আমার এক্সপেরিমেন্টে খুশি হবে এই বিশ্বাস রেখে।

ভুলোদা আর্কিমিডিসিয়ান 'ইউরেকা' আর্তনাদে চিৎকার করে উঠল, 'কী করেছিস!' আমিও ভুলোদার ভক্তিবাণী স্বর্গদুয়ারোস্ফিয়ারে পৌঁছানোর পন্থা আবিষ্কার করেছি ভেবে লাজুক 'ডারউইনিয়ান' হাসি হাসতে যাব এমন সময় চোখে পড়লো আরডিপি, এসআর আর অর্জুন স্যারের মুখ; কুটিল, বীভৎস, নৃশংস। যেন সেদিনের মতো আমায় বলছে, 'কি ভাবছো, পাশ করে যাবে!' বুঝতে পারলাম এক্সপেরিমেন্টটা এবারেও কেঁচিয়েছি।

-কী লিখেছিস!

-শ্রী শ্রী কালু মাতা সহায়। আমি মিনমিন করে বললাম। বস্তুতঃ স্বরবর্ণে, দীর্ঘ'ঈ'এর পর হ্রস্ব'উ'ই আসে।


পরমুহুর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম ভুলোদার বাড়ির বাইরে এবং দরজা সপাটে বন্ধ। হীরুদা তো পাড়ার মোষ-খাটালে মোষ নিয়ে বেজায় ব্যস্ত। তাই তাকে আর ঘাঁটাইনি। বুড়োদাকে বলতে গেলাম শুনলই না উলটে বললে আমি নাকি সেদিন বাবার দয়ায় হাই হয়ে ভুলোদার বাড়ি গিয়েছিলাম।


আমার দুঃখের কথা কেউই শুনলে না। এখন আপনাদের কোর্টেই বল রাখলাম। আপনারাই দেখুন।।

ভুলোদার প্রেম

ভুলোদার সাথে প্রথম আলাপ হয় কলেজের ইউনিয়ন অফিসে। হীরেনদা মানে হীরুদা বারদুয়েক আর আমি একবার টেস্টে ফেল করার পর পরের বছরও যখন পরীক্ষায় দায়িত্ব নিয়ে ধেড়িয়েছি,আমাদের তিননম্বর মক্কেল রাজু অর্থাৎ রাজর্ষি প্ল্যানটা দিয়েছিলো। রাজুটা এমনিতে ছেলে ভালো, পাস-টাস করে, তাও বেশিরভাগ সময়েই না টুকে! ওই বললো,"বুড়োদা, যা পরীক্ষা হয়েছে বলছো, পাস করবে বলে তো মনে হয় না, হীরুদাকে নিয়ে একবার ইউনিয়ন অফিসটা ঘুরে এসো, তোমরা কলেজে রয়ে গেলে আমার ডিগ্রী নিতে লজ্জা করবে,মাইরি বলছি!"

ভুলোদা তখন পার্টি করে।  কলেজ ছেড়ে বেরিয়েছে বহুদিন, তাও মায়া কাটেনি। এমনিতেও ভুলোদার মায়া একটু বেশি! আমার আর হীরুদার দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছিলো সেইদিনই! তারপর কলেজ শেষ হতে আমাদের চক্করে রাজুরও যখন কিস্যু চাকরি-বাকরি জুটলো না, আমাদের তিন বাপে খেদানো-মায়ে তাড়ানো বন্ধুর চা-সিগারেট থেকে মুরগি-মটন জোটানোর দায়িত্বটাও সযত্নে নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলো। আমরাও, সুবোধ ছেলের মতো কলেজ ক্যান্টিন থেকে ভুলোদার ড্রয়িং রুমে শিফট করে গেলাম!

কিন্তু এইবার মনে হচ্ছে সেই পাট চুকলো! তাই দুঃখের কাহিনী বলতে আসা, যদি সমব্যাথী পাওয়া যায়!

ভুলোদার তিনকূলে একটা খ্যাঁকখ্যাকে নেড়ি কুত্তা ছাড়া কেউ নেই; বিশাল মাইনের চাকরি করে, টাকা খরচের জায়গা পায় না, অসাধারণ রান্নার হাত! সময়কালে ভুলোদা মেয়েদের জায়গায় পার্টিকে বেশি সময় দিয়ে ফেলায় প্রেম-ট্রেমের অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে!

এহেন ভুলোদা কিছুদিন আগে তেত্রিশ বছর বয়সে প্রথম প্রেমে পড়েছেন ! আর পড়েছেন মানে কি! এক্কেরে পপাত চ এবং মমার চ! আমাদের মধ্যে হীরুদা অভিজ্ঞতা এবং লাল্টু চেহারার দৌলতে একখান প্রেম নামিয়েছে সফল ভাবে, আমার আর রাজুর কেবল দাগাই সার! সেই আমাদের ধরে বসিয়ে 'এক পলকে একটু দেখা' থেকে শুরু করে 'না না তুমি বলো' পর্যন্ত সঅঅব গল্প শোনানো দিয়ে ভুলোদার 'সস্নেহ' অত্যাচার শুরু হয়েছিল! এতদিনকার চিকেন-কষা আর ডানহিলের ঋণ শোধ করছি ভেবে ওগুলোকে হজম করছিলাম কোনোরকমে; হঠাৎ করে একদিন শুরু হলো ফোনাফুনি!

 আগে ভুলোদার ড্রয়িং রুমে কাশ্মীর সমস্যা থেকে শুরু করে পাড়ার কোন মেয়েকে কার সাথে কোথায়দ দেখা গেছে এইসব রসালো আলোচনার সাথে ভুলোদার হাতে তৈরি অমৃত সমান লেগ-ফ্রাইতে কামড় বসাতাম! এখন ভুলোদা আমরা গেলে পাড়ার মোড়ের দোকান থেকে আলুর চপ আনিয়ে দেয়, আর তারপর নিজে ছাতে উঠে যায় ফোন কানে দিয়ে! অপমান! অপমান!

তার মধ্যে ভুলোদা সিগারেট ছাড়বে বলে কথা দিয়েছে বৌদিকে,আপাতত 'রোজ খাওয়ার পরে একটা!' যার দৌলতে কোনোদিন সিগারেটের জন্যে এক পয়সা খরচ হয় নি, তাকে আজকাল গাঁটের কড়ি খসিয়ে কেনা সিগারেট খাওয়াতে হচ্ছে! যতক্ষণ ভুলোদা ফোন করে না, হোয়াটসআপ বাজতে থাকে টিং টিং! ভুলোদা নিজের নাম সার্থক করে আমাদের ভুলেই গেছে!

তার উপর ভুলোদার মাথায় চেপেছেন সাক্ষাৎ সরস্বতী! কাব্য-সরস্বতী ! আমি একটু লিখি-টিখি বলে আবার সেসব আমাকেই শুনতে হয়! 'বুইলে কিনা সৌনক,(আমার ভালো নাম; ভুলোদা আবার রাজনীতি করা মানুষ কিনা, সবাইকে তুমি করে কথা বলে আর ভালো নামে ডাকে!)আজ আরেক-খান ভাব মাথায় এলো; লোডশেডিং,ভ্যাপসা গরম.কিন্তু ও কথা বলছে বলে একদম ফুরফুরে বসন্ত লাগছে! নামিয়ে ফেলি কি বলো? ভ্যাপসা গরমটার ইম্পোর্ট্যান্স খানা বুঝছো তো?..'

আর ইম্পোর্ট্যান্স! বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে পাঁচ মিনিট ধরে ভুলোদার সাথে বাংলা সাহিত্যে উপেক্ষিত ভ্যাপসা গরমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার পর আমি তখন নিজের নামের ইম্পোর্ট্যান্স খানাই ভুলে মেরে দিয়েছি!

যাইহোক! এইসব কথা যেন ভুলোদার কানে তুলবেন না কেউ! বড়ো দুঃখে বলা এসব! আগামী ফাল্গুনে ভুলোদার শুভ-বিবাহ! কব্জি ডুব্বে সাঁটাতে হবে সেইসময়!                            

নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য