বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা।
ভোর তখন সাড়ে পাঁচটা। আমি সবে ঘুমের ফার্স্ট হাফ শেষ করে টয়লেট ব্রেকটা স্কিপ করে স্ট্রেট সেকেন্ডহাফে ঢুকব, এমন সময় ঘরের দেওয়াল-ছাদ বিদীর্ণ করে আওয়াজ এলো 'সেলফি ম্যাঁয়নে লে লিয়া...' রিংটোন এরকম রাখার একটাই কারণ, রাস্তাঘাটে ফোন বাজলে আমি শুনতে না পেলেও পাশের লোকটা ঠিকই বলবে, 'দাদা, হয় ফোনটা ধরুন আর নাহলে কালীঘাটের গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসুন।' ঘুরিয়ে ফোন করবার টাকাটা বেঁচে যায় তাতে। কিন্তু এমন অসময়ে!
ফোন নিয়ে দেখি বুড়োদার ফোন। বুড়োদার তো এখন স্বপ্নে তাঁর ভার্চুয়াল গার্লফ্রেন্ড অভিষিক্তাদির সাথে স্বপ্নে প্যারিসে যাওয়ার কথা। তাহলে কি স্বপ্নেও আজকাল বুড়োদাকে লোকজন ফ্রেন্ডজোন করতে শুরু করল!
যাইহোক, ফোন তুললাম। ফোন তুলেই শুনলাম বুড়োদা রাগসঙ্গীত গাইছে। সাথে একটু আধটু কান্নাও আছে, অনেকটা হিমেশ রেশমিয়া 'নাম তেরা তেরা' ছেড়ে ভৈরবী রাগ গাইলে যেমন শোনায়। বুঝলাম সিওর লেঙ্গি কেস। জিজ্ঞেস করলাম, 'কে লেঙ্গি মারলো?'
-আর লেঙ্গি মারবে না রে! আমার তো আর লেগ-ই ঠিক নেই।
তারপর পাঁচমিনিট যা বলল তাতে বুঝলাম বুড়োদাকে হরি তুলে নেওয়ার আগে আমাকে শ্রীহরি হাসপাতালে ছুটতে হবে।
হাসপাতাল পৌঁছালাম। বুড়োদার এরকম না হলে জানতেই পারতাম না এটা হাঁস-মুরগীর খামার না হাসপাতাল! বুড়োদার ঘরে ঢুকে দেখলাম বুড়োদার পায়ে মোটা করে সাদা ন্যাকড়া জড়ানো। পায়ে বাঁধা একটা দড়ি উপরে ফ্যান থেকে নেমে বুড়োদার হাতে ধরা। ওটা ধরে টানতেই বুড়োদার ডান ঠ্যাং উঠছে আর ছেড়ে দিলে নামছে। হাসপাতালে এক্সরে না থাকায় নার্স মোবাইলে অনলাইন এক্সরে দিয়ে দেখেছে পা ভাঙেনি। তাই পায়ে কাপড় জড়িয়ে কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে গেছে ডেটিংএ।
রুগীর সাথে দেখা করতে গেলে ফল নিয়ে যেতে হয়। আমিও আসার সময় কয়েকটা কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে এসেছিলাম। বুড়োদা আমায় দেখেই দড়ি ধরিয়ে বলল, 'নে, টানা শুরু কর। আমার হাত ব্যথা হয়ে গেছে।' কাঁচা আম খেতে খেতে আর দড়ি টানতে টানতে ভাবলাম আমাদেরই আর কিছু হলো না!
বুড়োদাকে নাকি কালরাত্রে দেশাত্মবোধক গানে পেয়েছিল। মাঝরাতে পাড়ার কুকুরদের ঘুম চটকে মার্চ করতে করতে 'চলরে চলরে চল/ উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/ নিম্নে উতলা ধরণীতল/ চলরে চলরে চল' গাইছিল। পথে একটি পরিত্যক্ত কুয়ো করকেটের ছাউনি দিয়ে ঢাকা ছিল। ছোটবেলায় পড়েছিলাম ব্রিজ পার করার সময় মার্চ করতে নেই। কিন্তু বুড়োদা সেটা বুঝলে তো! অভিকর্ষের টানে 'নিম্নে উতলা ধরণীতলে পৌঁছাতে বেশী সময় লাগেনি।
কিন্তু আমাদের বুড়োদা ফাইটারের জাত। ইদানীং মাউন্টেনিয়ারিং শিখছে। যেখানে সেখানে তরতর করে এমন অবলীলায় উঠে পরে যে মনে হয় ডারউইন দাদুই ঠিক। শুধু গাছে চড়াটাই বাকি রেখেছে কারণ গাছের অপঘাতে মৃত্যুও তো প্রাণ হত্যারই সামিল। আমাদের লেজেন্ড বুড়োদা সেই পঙ্গু অবস্থায় কুয়ো চড়ে উড়োদা হয়ে হাসপাতাল পৌছেছে। বুড়োদা আমাদের গর্ব, আমাদের অহঙ্কার, আমাদের দলের মাসদুর রহমান বৈদ্য। যাইহোক, আমার একটা কিন্তু খটকা লাগছিল। একেই বৃষ্টি-বাদলার দিন, মাটি নরম। বুড়োদা গর্তে পড়েছিল নাকি বুড়োদা পড়ে যাওয়ায় গর্ত তৈরী হয়েছিল। মানে বুড়োদার যা ওজন, উল্কাপতনের চেয়ে এফেক্ট কম কিছু হওয়ার নয়।
যাইহোক, বুড়োদাকে যতটা সিরিয়াস অবস্থায় দেখবো ভেবেছিলাম ততটা মোটেও নয়। বরং দু'তিন দিন পরেই ছাড়া পেয়ে যাবে। এমন সময় শুনি কে একজন গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করছে, 'সৌণক ব্যানার্জী, আপনি?'
-হ্যাঁ।
-আর আপনি?
-রাজর্ষি। রাজর্ষি সরকার। ওর বন্ধু, কী দরকার? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলাম।
-থানা থেকে আসছি। সুস্থ হয়ে থানায় আসবেন একবার।
বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে একশ আট। বুড়োদা আমার দিকে তাকাল। আমি মনে মনে ভগবান কে অশেষ ধন্যবাদ দিলাম একজোড়া কিডনি দিয়ে জন্ম দেওয়ার জন্য। হাজার হোক, অসুস্থ মানুষের থেকে তো আর কিডনি চাওয়া যায় না।
শ্রীহরিতে আসাটাই আমার কাল হলো। মারে হরি, রাখে কে!!
শ্রীহরিতে আসাটাই আমার কাল হলো। মারে হরি, রাখে কে!!
No comments:
Post a Comment