বিকেল চারটে কি সাড়ে চারটে হবে, রোজকার মতো আমি আর রাজু গড়ের মাঠে বসে ঘাস চিবুচ্ছি। ভুলোদা ফাইনালি আজ কথা দিয়েছে আমাদের জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ডের বাড়ি নিয়ে যাবে, একটু সন্ধ্যে হলে। বেকার জীবনের অবসান ঘটছে ভেবে আনন্দটা খুব চেষ্টা করেও ঠিক ফিল করে উঠতে পারছিনে। বার বার মনে হচ্ছে, কাল থেকে এই ঘাস গুলো শুধু ঘোড়াতেই খাবে...
"গোরুতে, বুড়োদা, গোরুতে" রাজু ভুল শুধরে দেয়, "ঘাস, পাতা, মাধ্যমিকের খাতা সব গোরুতেই খাবে এর পর!"
কটাং করে একটা চাঁটি মারলাম ওকে। ইমোশনের মধ্যে গোরুর ডাক না ডাকলেই হচ্ছিলো না যেন ওর! পকেট থেকে পিসিমনি বিড়ির প্যাকেটটা সবে বের করেছি, রাজু বলে, "মালটা রেডি রাখো, দেশলাইদা আসছে!"
দেশলাইদার সাথে অনেকদিনের আলাপ। উনি আমাদের ঘাস চিবুনোর সিনিয়র। মানে আমাদেরও আগে থেকে গড়ের মাঠে আসেন, একলাই; একটু দূরে বসে আপন মনে লম্বা ঘাস, বেঁটে ঘাস, মোটা ঘাস এসব বিভিন্ন রকম ঘাস চিবিয়ে থাকেন, আর উদাস দৃষ্টিতে আকাশ দেখেন। উঠে যাওয়ার ঠিক চার মিনিট পনেরো সেকেন্ড আগে এসে আমাদের পাশে বসেন। একটা হাত বাড়িয়ে দেন, আমি বা রাজু দেশলাইয়ের বাক্স খুলে একখানা বার করে ভদ্রলোকের হাতে দিই, উনি নির্লিপ্ত ভাবে সেটা নিয়ে কান খোঁচাতে শুরু করেন। ঠিক পৌনে তিন মিনিট পরে "আঃ" বলে একটা স্বস্তির নিঃস্বাস ছেড়ে বলেন, "কাইল ওইদিগেরে ঘাসডা এট্টু ট্যাস্ট কইরা দেখেন মোটাভাই, ভালো রস হইসে!" তার পর উঠে চলে যান। উনি আমাকে মোটাভাই আর রাজুকে শুঁটোভাই বলেন, আর আমরা ওনাকে বলি দেশলাইদা।
দেশলাইদাকে দেখে মনটা ফের খারাপ হয়ে গেলো। আজ ওনার বাড়ানো হাতে গোটা বাক্সখানা তুলে দিয়ে বললুম, "রাখুন দেশলাইদা, আর হয়তো দেখা হবে না কোনোদিন"
দেশলাইদা চোখে একটা চশমা পড়েন, পরনে লুঙ্গি আর হাফহাতা ফতুয়া। আমার কথাটা শুনে আমার দিকে তাকালেন। তারপর তাকিয়েই রইলেন। খানিক্ষন পর বুঝলাম, জানতে চাইছেন কেন দেখা হবে না। রাজুও বুঝেছিল ব্যাপারটা, সেই বললো, "একটা চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে বুঝলেন দেশলাইদা, আর হয়তো আসতে পারবো না এদিকপানে!"
আমি বললুম, "ছুটিছাটার দিনে এসে দেখা করে যাবো নাহয় আপনার সাথে। ভালো থাকবেন। "
দেশলাইদার চশমা নেমে এসেছে প্রায় নাকের ডগায়, "আরে কও কি শুঁটোভাই, তুমাদের চাকরি হোতাসে ? ও শুঁটোভাই, আমারেও একখান জুটায়ে দাও না, ও মোটাভাই"...
পাক্কা পনেরো মিনিট। পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে এই এককথা বিভিন্ন সুরে ও কথায় বার বার বলে গেলেন দেশলাইদা। শেষকালে খানিকটা বিরক্ত হয়েই উঠে পড়লাম মাঠ থেকে। এমনিতেও সাইকেল স্কোফিল্ডের বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিলো।
অতঃপর বাস ধরে ঝুলে ঝুলে ভুলোদার বলে দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে গমন। ভুলোদা আমাদের যেরকম বিবরণ দিয়েছে ভদ্রলোকের, তাতে কনফিডেন্স পাওয়ার বদলে আমি খানিকটা বোমকে গেছি। 'করে খাও' পার্টির মস্ত লিডার ছিলেন সাইকেল, কিন্তু 'করে খাও' গিয়ে রাজ্যে এখন 'পাল্টি খাও' পার্টির শাসন। 'পাল্টি খাও'-এর পিসিমনি শপথ নিয়েছিলেন দেশ থেকে বহিরাগতদের তাড়াবেন। সেই শুনে আমাদের সাইকেলদাদা 'বসে খাও' পার্টির সাথে জোট বাঁধার মিটিং করতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা। সেখানেই ভদ্রলোককে ধরে 'লুটে খাও' পার্টির কিছু লোক। তারপর ? "সাইকেল স্কোফিল্ড নাম হ্যায় তো জেল মে তো জানা হ্যায়" স্লোগান দিতে দিতে ওনাকে সিধে নিয়ে যায় কোর্টে। সেখানে ৫ টাকার স্ট্যাম্প পেপার কিনে ওনার নামের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় 'জয়শ্রীরাম"। তারপর থেকেই সাইকেলদা আন্ডারগ্রাউন্ড। তবে ওনার এখনো কিছু বন্ধু আছে, যারা 'করে খাও' থেকে পাল্টি খেয়ে 'পাল্টি খাও' এর মেম্বার এখন। তারা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার চপোন্নতিতে মন দিয়েছে, মানে চপের ফুডচেন খুলেছে। সেইসব দোকানেই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবেন হয়তো উনি, সেরকমই আমাদের বলেছে ভুলোদা।
তা এত বড়ো বিপ্লবীর সাথে একলা একলা দেখা করাটা ঠিক মানায় না, তাই ভুলোদাকে ধরে কয়ে আসতে রাজি করিয়েছি আমাদের সাথে। সে বলেছে সে আলাদা করে ওলায় আসবে, তার আবার বাসের ভিড় পোষায় না! অগত্যা, এই ভর সন্ধ্যেবেলা একখানা নোংরা এঁদো গলির মধ্যে ঢুকে তিন নম্বর বাড়ির গোয়ালের পাশ দিয়ে গিয়ে আশশ্যাওড়া গাছের পাশে একটা ক্লাবঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রাজু। ভুলোদা কিংবা স্কোফিল্ড, কারুরই টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না!
-"আই রাজু, ঠিক এলুম তো রে?"
-"হ্যাঁ গো বুড়োদা, এক্কেরে ঠিক! এই তো আকাশবাণী স্পোর্টিং ক্লাব, এখানেই আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে সাইকেলদাদা!"
-"কিন্তু দরজায় তো তালা! কই তিনি? ভুলোদাই বা কই? এটা আন্ডারগ্রাউন্ড না রে, ব্লান্ডারগ্রাউন্ড, আমাদের। ভর সন্ধ্যেবেলা, আশশ্যাওড়া গাছ. জয়শ্রীরাম!"
রাজুর একটু সাহস বেশি। সে একবার গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে, "দাঁড়াও ফোন করি ভুলোদাকে।"
কিন্তু ফোন লাগে না. ব্যস্ত। একবার, দুবার, তিনবার, ব্যস্ত। "দুত্তেরি ছাই" বলে ফোনটা পকেটস্থ করে ও। আমি নিজের ফোন থেকে ফোন করি ভুলোদাকে, এবং, ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং এর সাথে সাথেই কান ফাটানো চিৎকার করে ওঠে কেউ একজন "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...." ঠিক আমার মাথার উপর আশশ্যাওড়া গাছের মগডালে। আমি আঁতকে উঠি, হাত থেকে ফোন পড়ে কেটে যায় ফোন খানা, এবং চিৎকারও বন্ধ! পরক্ষনেই দেখি রাজু ভূপতিত। মাথা চেপে ধরে উঃ আঃ করছে। ওকে তুলে দৌড়াবো নাকি আগেই দৌড়াবো ভাবতে গিয়ে চোখ পড়ে রাজুর পাশে পড়ে থাকা প্রমান সাইজের ট্যাবখানায়। এটাই মাথায় পড়েছে তবে ওর! কিন্তু আশশ্যাওড়ার পেত্নীর কাছে লেনোভোর ট্যাব কি করছে! ভাবতে ভাবতে দেখি আশশ্যাওড়ার মগডাল থেকে দুইখান গোদা সাদা পা ঝুলছে, আসতে আসতে নিচু হচ্ছে সে দুটো। তারপর প্রকটিত হলো একখানা বারমুডা, তারপর ব্র্যান্ডেড হাফশার্ট আর সবশেষে ভুলোদার অমায়িক বদন খানি! হাতে ভর দিয়ে সে ঝুলছে মগডাল থেকে, আর চিঁচিঁ করে কি একটা বলছে।
রাজু উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষনে, "তুমি গাছে উঠে কি করছিলে ভুলোদা? আর ওই চিৎকারটা কার ছিল ?"
"আগে নামাও আমাকে তোমরা... ও সৌনক, একটু ধরো!"
রাজুর ব্রহ্মতালুতে চোট লেগে মেজাজ গরম, "আগে বলো"!
ঝুলায়মান ভুলোদার চিঁচিঁর মর্মার্থ ছিল এই যে, সে অনেক আগে এসে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমরা বা সাইকেল কেউই না থাকায় সে ভাবে বৌদিকে একটা ফোন করবে। টাওয়ার না পেয়ে রোখের মাথায় গাছে চড়ে যায়। এতক্ষন কথা বলছিলো, কিন্তু ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমার ফোনটা ঢোকে। ভুলোদার রিংটোন হলো এই কিছুদিন আগেই কোলাঘাটের চা দোকানি টার্নড প্লেব্যাক সিঙ্গার কালুদির গাওয়া নতুন গান 'মেরি তেরি'র প্রিলুড। সেটাই বাজাতে ভুলোদাও আমাদের মতো চমকে গিয়ে ট্যাব ফেলে দেয় রাজুর মাথায়। তার পরেই নামার চেষ্টা করতে এই বিপত্তি। নামতে পারছে না।
আমার একটু মায়া হলো। রাজুকে বললাম, "চ, তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা, তার পর হেই সামালো হাইয়া বলে যত জোরে পারিস টান মারবি। ভুলোদা, তুমি হাত ছেড়ে দিও" বলে আমি জামার হাতা গোটানো শুরু করলাম! রাজুর এখনো রাগ যায় নি, সে, "হুঁহ যত্তসব! গাছে উঠে বসে আছে! তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা! একি মুরগি নাকি যে তুমি একটা ঠ্যাং আর আমি একটা! আস্ত জলহস্তী!"- এইসব গজ গজ করতে করতেই জামার হাতা গোটাচ্ছিলো, হঠাৎ পিছন থেকে খুব পরিচিতি গলায় কেউ বলে উঠলো, "আরে মোটাভাই-শুঁটোভাই! আপনারা হেইখানডায় কি করতাসেন ?"
আমরা ভুলোদার কথা বেমালুম ভুলে পিছন ফিরলাম, "আরে দেশলাইদা ! আপনি!"
কিন্তু ভুলোদা ভুলতে দিলে তো! "ওরে ওই স্কোফিল্ড রে! ওরে আমাকে নামা রে কেউ! ওরে ডালটায় কাঠপিঁপড়ের বাসা আছে রে! আঙুলে কামড়াচ্ছে!"
আর তখন ভুলোদার আঙ্গুল! সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড হলো আমাদের দেশলাইদা ! 'করে খাও' পার্টির নেতা! পনের মিনিট ধরে আমাদের থেকে চাকরি চেয়ে গেছে আজ বিকেলে, আর ভুলোদা এত ঘটা করে তার কাছে এনেছে আমাদের চাকরির জন্যে! আমি রাজুর মুখের দিকে, রাজু আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম! দেশলাইদা ভুলোদার চিৎকারে লক্ষ্য করেছেন ভুলোদাকে, "ভুলাদাদা! আপনে ! গাসের উপর কি করতাসেন?"
ভুলোদার উত্তর দেওয়ার পরিস্থিতি নেই , আমিই বললুম, "আপনার কাছে এনেছিল দেশলাইদা, চাকরির জন্যে! কোনোদিন বলেন নি তো আপনি 'করে খাও' -এর এতবড়ো লিডার!"
দেশলাইদা ওরফে সাইকেলদা অমায়িক হেসে বললেন, "সে দিন হ্যাক্কালে সিলো, বুইলেন! এক্ষন আর কইরা খাওনের দিন নাই! এখন সব লুইট্যা খাও!
"কিন্তু আপনার বন্ধুরা? পাল্টি খাও পার্টির? চপ চেনের মালিকরা?" রাজুর ব্যাকুল জিজ্ঞাসা!
-"তারা হক্কলে ফের পাল্টি খাইয়াসে! লুইট্যা খাইতাসে এহন। আমারেও সিনতে পারে না আর!" দুঃখী মুখ করে বললেন সাইকেলদা!
হঠাৎ ধপাস করে আওয়াজ এবং গগনবিদারী আর্তনাদ! ভুলোদা পিঁপড়েভয় এবং মৃত্যুভয়ের মধ্যে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। না, মরেনি, তবে তিন চারটে হাড় না গেলে খুশি হবো না। এত্তদিন ধরে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে শেষে দেশলাইদা প্রসব করলো লোকটা! কিন্তু যন্ত্রনা এখানে শেষ হলে তো! আমাদের সব্বাইকে চমকে দিয়ে ফের একবার কালুদি আর্তনাদ ছাড়লেন, "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...."! ভুলোদার ট্যাব! বৌদির নামখানা জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে!
যন্ত্রনা ভুলে একলাফে খাড়া ভুলোদা, এবং ফোন কানে দিয়ে "হালুউউ, বলুউউউ " বলে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালো আমাদের দিকে, "এই একটু ধরো তো" বলে আমাদের ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে জানি না, তবে বলে গেলো, "তোমরা তো দেখছি চেনো সবাই সবাইকে, কথা টথা বলে নাও তবে"। বলে সিধা গোয়ালের পাশ দিয়ে ধাঁ !
সাইকেলদা সেইদিন চা খাইছিলেন আমাদের। তারপর চশমাটা একটু নামিয়ে বলেছিলেন, "হ্যাকডা কাম আসে। ভৌস্তকদা ফিরাসে রাশিয়া হইতে। ও লোক খুঁইজতাসিলো, হিন্দি জানা লোক। বঙ্কিমসন্দ্রের হিন্দি অনুবাদ করনের তরে । 'লুইট্যা খাও' পার্টির লোকসনেরা কিনতাসে না নইলে! ওরা বড্ডো বাইড়া গিয়াসে! হিন্দি বই না সাপাইলা ব্যবসা চলতাসে না ভৌস্তকদাদার। আমি তো হিন্দি সিখুম না, মইরা গেলেও না। আপনারা করেন তো কন, কথা কই!"
রাজু বললো, "ভৌস্তকদা মানে ভৌস্তক গাঙ্গুলি ? 'করে খাও' পার্টির আমলের তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী? করে খাও কোমায় যাওয়ার পর এখন উনি বই চাপানোর ব্যবসা শুরু করেছেন?"
রাজি হয়ে গেলাম সাইকেলদার কথায়। শারুক খানের স্কুলে পড়ে বড়ো হয়েছি, হিন্দি জানিনা মানে ? একশো বার জানতা হ্যায়, হাজার বার জানতা হ্যায়! ঠিক করলাম যাবো একদিন সাইকেলদার সাথে ভৌস্তকদার বাড়ি।
"গোরুতে, বুড়োদা, গোরুতে" রাজু ভুল শুধরে দেয়, "ঘাস, পাতা, মাধ্যমিকের খাতা সব গোরুতেই খাবে এর পর!"
কটাং করে একটা চাঁটি মারলাম ওকে। ইমোশনের মধ্যে গোরুর ডাক না ডাকলেই হচ্ছিলো না যেন ওর! পকেট থেকে পিসিমনি বিড়ির প্যাকেটটা সবে বের করেছি, রাজু বলে, "মালটা রেডি রাখো, দেশলাইদা আসছে!"
দেশলাইদার সাথে অনেকদিনের আলাপ। উনি আমাদের ঘাস চিবুনোর সিনিয়র। মানে আমাদেরও আগে থেকে গড়ের মাঠে আসেন, একলাই; একটু দূরে বসে আপন মনে লম্বা ঘাস, বেঁটে ঘাস, মোটা ঘাস এসব বিভিন্ন রকম ঘাস চিবিয়ে থাকেন, আর উদাস দৃষ্টিতে আকাশ দেখেন। উঠে যাওয়ার ঠিক চার মিনিট পনেরো সেকেন্ড আগে এসে আমাদের পাশে বসেন। একটা হাত বাড়িয়ে দেন, আমি বা রাজু দেশলাইয়ের বাক্স খুলে একখানা বার করে ভদ্রলোকের হাতে দিই, উনি নির্লিপ্ত ভাবে সেটা নিয়ে কান খোঁচাতে শুরু করেন। ঠিক পৌনে তিন মিনিট পরে "আঃ" বলে একটা স্বস্তির নিঃস্বাস ছেড়ে বলেন, "কাইল ওইদিগেরে ঘাসডা এট্টু ট্যাস্ট কইরা দেখেন মোটাভাই, ভালো রস হইসে!" তার পর উঠে চলে যান। উনি আমাকে মোটাভাই আর রাজুকে শুঁটোভাই বলেন, আর আমরা ওনাকে বলি দেশলাইদা।
দেশলাইদাকে দেখে মনটা ফের খারাপ হয়ে গেলো। আজ ওনার বাড়ানো হাতে গোটা বাক্সখানা তুলে দিয়ে বললুম, "রাখুন দেশলাইদা, আর হয়তো দেখা হবে না কোনোদিন"
দেশলাইদা চোখে একটা চশমা পড়েন, পরনে লুঙ্গি আর হাফহাতা ফতুয়া। আমার কথাটা শুনে আমার দিকে তাকালেন। তারপর তাকিয়েই রইলেন। খানিক্ষন পর বুঝলাম, জানতে চাইছেন কেন দেখা হবে না। রাজুও বুঝেছিল ব্যাপারটা, সেই বললো, "একটা চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে বুঝলেন দেশলাইদা, আর হয়তো আসতে পারবো না এদিকপানে!"
আমি বললুম, "ছুটিছাটার দিনে এসে দেখা করে যাবো নাহয় আপনার সাথে। ভালো থাকবেন। "
দেশলাইদার চশমা নেমে এসেছে প্রায় নাকের ডগায়, "আরে কও কি শুঁটোভাই, তুমাদের চাকরি হোতাসে ? ও শুঁটোভাই, আমারেও একখান জুটায়ে দাও না, ও মোটাভাই"...
পাক্কা পনেরো মিনিট। পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে এই এককথা বিভিন্ন সুরে ও কথায় বার বার বলে গেলেন দেশলাইদা। শেষকালে খানিকটা বিরক্ত হয়েই উঠে পড়লাম মাঠ থেকে। এমনিতেও সাইকেল স্কোফিল্ডের বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিলো।
অতঃপর বাস ধরে ঝুলে ঝুলে ভুলোদার বলে দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে গমন। ভুলোদা আমাদের যেরকম বিবরণ দিয়েছে ভদ্রলোকের, তাতে কনফিডেন্স পাওয়ার বদলে আমি খানিকটা বোমকে গেছি। 'করে খাও' পার্টির মস্ত লিডার ছিলেন সাইকেল, কিন্তু 'করে খাও' গিয়ে রাজ্যে এখন 'পাল্টি খাও' পার্টির শাসন। 'পাল্টি খাও'-এর পিসিমনি শপথ নিয়েছিলেন দেশ থেকে বহিরাগতদের তাড়াবেন। সেই শুনে আমাদের সাইকেলদাদা 'বসে খাও' পার্টির সাথে জোট বাঁধার মিটিং করতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা। সেখানেই ভদ্রলোককে ধরে 'লুটে খাও' পার্টির কিছু লোক। তারপর ? "সাইকেল স্কোফিল্ড নাম হ্যায় তো জেল মে তো জানা হ্যায়" স্লোগান দিতে দিতে ওনাকে সিধে নিয়ে যায় কোর্টে। সেখানে ৫ টাকার স্ট্যাম্প পেপার কিনে ওনার নামের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় 'জয়শ্রীরাম"। তারপর থেকেই সাইকেলদা আন্ডারগ্রাউন্ড। তবে ওনার এখনো কিছু বন্ধু আছে, যারা 'করে খাও' থেকে পাল্টি খেয়ে 'পাল্টি খাও' এর মেম্বার এখন। তারা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার চপোন্নতিতে মন দিয়েছে, মানে চপের ফুডচেন খুলেছে। সেইসব দোকানেই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবেন হয়তো উনি, সেরকমই আমাদের বলেছে ভুলোদা।
তা এত বড়ো বিপ্লবীর সাথে একলা একলা দেখা করাটা ঠিক মানায় না, তাই ভুলোদাকে ধরে কয়ে আসতে রাজি করিয়েছি আমাদের সাথে। সে বলেছে সে আলাদা করে ওলায় আসবে, তার আবার বাসের ভিড় পোষায় না! অগত্যা, এই ভর সন্ধ্যেবেলা একখানা নোংরা এঁদো গলির মধ্যে ঢুকে তিন নম্বর বাড়ির গোয়ালের পাশ দিয়ে গিয়ে আশশ্যাওড়া গাছের পাশে একটা ক্লাবঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রাজু। ভুলোদা কিংবা স্কোফিল্ড, কারুরই টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না!
-"আই রাজু, ঠিক এলুম তো রে?"
-"হ্যাঁ গো বুড়োদা, এক্কেরে ঠিক! এই তো আকাশবাণী স্পোর্টিং ক্লাব, এখানেই আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে সাইকেলদাদা!"
-"কিন্তু দরজায় তো তালা! কই তিনি? ভুলোদাই বা কই? এটা আন্ডারগ্রাউন্ড না রে, ব্লান্ডারগ্রাউন্ড, আমাদের। ভর সন্ধ্যেবেলা, আশশ্যাওড়া গাছ. জয়শ্রীরাম!"
রাজুর একটু সাহস বেশি। সে একবার গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে, "দাঁড়াও ফোন করি ভুলোদাকে।"
কিন্তু ফোন লাগে না. ব্যস্ত। একবার, দুবার, তিনবার, ব্যস্ত। "দুত্তেরি ছাই" বলে ফোনটা পকেটস্থ করে ও। আমি নিজের ফোন থেকে ফোন করি ভুলোদাকে, এবং, ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং এর সাথে সাথেই কান ফাটানো চিৎকার করে ওঠে কেউ একজন "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...." ঠিক আমার মাথার উপর আশশ্যাওড়া গাছের মগডালে। আমি আঁতকে উঠি, হাত থেকে ফোন পড়ে কেটে যায় ফোন খানা, এবং চিৎকারও বন্ধ! পরক্ষনেই দেখি রাজু ভূপতিত। মাথা চেপে ধরে উঃ আঃ করছে। ওকে তুলে দৌড়াবো নাকি আগেই দৌড়াবো ভাবতে গিয়ে চোখ পড়ে রাজুর পাশে পড়ে থাকা প্রমান সাইজের ট্যাবখানায়। এটাই মাথায় পড়েছে তবে ওর! কিন্তু আশশ্যাওড়ার পেত্নীর কাছে লেনোভোর ট্যাব কি করছে! ভাবতে ভাবতে দেখি আশশ্যাওড়ার মগডাল থেকে দুইখান গোদা সাদা পা ঝুলছে, আসতে আসতে নিচু হচ্ছে সে দুটো। তারপর প্রকটিত হলো একখানা বারমুডা, তারপর ব্র্যান্ডেড হাফশার্ট আর সবশেষে ভুলোদার অমায়িক বদন খানি! হাতে ভর দিয়ে সে ঝুলছে মগডাল থেকে, আর চিঁচিঁ করে কি একটা বলছে।
রাজু উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষনে, "তুমি গাছে উঠে কি করছিলে ভুলোদা? আর ওই চিৎকারটা কার ছিল ?"
"আগে নামাও আমাকে তোমরা... ও সৌনক, একটু ধরো!"
রাজুর ব্রহ্মতালুতে চোট লেগে মেজাজ গরম, "আগে বলো"!
ঝুলায়মান ভুলোদার চিঁচিঁর মর্মার্থ ছিল এই যে, সে অনেক আগে এসে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমরা বা সাইকেল কেউই না থাকায় সে ভাবে বৌদিকে একটা ফোন করবে। টাওয়ার না পেয়ে রোখের মাথায় গাছে চড়ে যায়। এতক্ষন কথা বলছিলো, কিন্তু ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমার ফোনটা ঢোকে। ভুলোদার রিংটোন হলো এই কিছুদিন আগেই কোলাঘাটের চা দোকানি টার্নড প্লেব্যাক সিঙ্গার কালুদির গাওয়া নতুন গান 'মেরি তেরি'র প্রিলুড। সেটাই বাজাতে ভুলোদাও আমাদের মতো চমকে গিয়ে ট্যাব ফেলে দেয় রাজুর মাথায়। তার পরেই নামার চেষ্টা করতে এই বিপত্তি। নামতে পারছে না।
আমার একটু মায়া হলো। রাজুকে বললাম, "চ, তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা, তার পর হেই সামালো হাইয়া বলে যত জোরে পারিস টান মারবি। ভুলোদা, তুমি হাত ছেড়ে দিও" বলে আমি জামার হাতা গোটানো শুরু করলাম! রাজুর এখনো রাগ যায় নি, সে, "হুঁহ যত্তসব! গাছে উঠে বসে আছে! তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা! একি মুরগি নাকি যে তুমি একটা ঠ্যাং আর আমি একটা! আস্ত জলহস্তী!"- এইসব গজ গজ করতে করতেই জামার হাতা গোটাচ্ছিলো, হঠাৎ পিছন থেকে খুব পরিচিতি গলায় কেউ বলে উঠলো, "আরে মোটাভাই-শুঁটোভাই! আপনারা হেইখানডায় কি করতাসেন ?"
আমরা ভুলোদার কথা বেমালুম ভুলে পিছন ফিরলাম, "আরে দেশলাইদা ! আপনি!"
কিন্তু ভুলোদা ভুলতে দিলে তো! "ওরে ওই স্কোফিল্ড রে! ওরে আমাকে নামা রে কেউ! ওরে ডালটায় কাঠপিঁপড়ের বাসা আছে রে! আঙুলে কামড়াচ্ছে!"
আর তখন ভুলোদার আঙ্গুল! সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড হলো আমাদের দেশলাইদা ! 'করে খাও' পার্টির নেতা! পনের মিনিট ধরে আমাদের থেকে চাকরি চেয়ে গেছে আজ বিকেলে, আর ভুলোদা এত ঘটা করে তার কাছে এনেছে আমাদের চাকরির জন্যে! আমি রাজুর মুখের দিকে, রাজু আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম! দেশলাইদা ভুলোদার চিৎকারে লক্ষ্য করেছেন ভুলোদাকে, "ভুলাদাদা! আপনে ! গাসের উপর কি করতাসেন?"
ভুলোদার উত্তর দেওয়ার পরিস্থিতি নেই , আমিই বললুম, "আপনার কাছে এনেছিল দেশলাইদা, চাকরির জন্যে! কোনোদিন বলেন নি তো আপনি 'করে খাও' -এর এতবড়ো লিডার!"
দেশলাইদা ওরফে সাইকেলদা অমায়িক হেসে বললেন, "সে দিন হ্যাক্কালে সিলো, বুইলেন! এক্ষন আর কইরা খাওনের দিন নাই! এখন সব লুইট্যা খাও!
"কিন্তু আপনার বন্ধুরা? পাল্টি খাও পার্টির? চপ চেনের মালিকরা?" রাজুর ব্যাকুল জিজ্ঞাসা!
-"তারা হক্কলে ফের পাল্টি খাইয়াসে! লুইট্যা খাইতাসে এহন। আমারেও সিনতে পারে না আর!" দুঃখী মুখ করে বললেন সাইকেলদা!
হঠাৎ ধপাস করে আওয়াজ এবং গগনবিদারী আর্তনাদ! ভুলোদা পিঁপড়েভয় এবং মৃত্যুভয়ের মধ্যে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। না, মরেনি, তবে তিন চারটে হাড় না গেলে খুশি হবো না। এত্তদিন ধরে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে শেষে দেশলাইদা প্রসব করলো লোকটা! কিন্তু যন্ত্রনা এখানে শেষ হলে তো! আমাদের সব্বাইকে চমকে দিয়ে ফের একবার কালুদি আর্তনাদ ছাড়লেন, "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...."! ভুলোদার ট্যাব! বৌদির নামখানা জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে!
যন্ত্রনা ভুলে একলাফে খাড়া ভুলোদা, এবং ফোন কানে দিয়ে "হালুউউ, বলুউউউ " বলে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালো আমাদের দিকে, "এই একটু ধরো তো" বলে আমাদের ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে জানি না, তবে বলে গেলো, "তোমরা তো দেখছি চেনো সবাই সবাইকে, কথা টথা বলে নাও তবে"। বলে সিধা গোয়ালের পাশ দিয়ে ধাঁ !
সাইকেলদা সেইদিন চা খাইছিলেন আমাদের। তারপর চশমাটা একটু নামিয়ে বলেছিলেন, "হ্যাকডা কাম আসে। ভৌস্তকদা ফিরাসে রাশিয়া হইতে। ও লোক খুঁইজতাসিলো, হিন্দি জানা লোক। বঙ্কিমসন্দ্রের হিন্দি অনুবাদ করনের তরে । 'লুইট্যা খাও' পার্টির লোকসনেরা কিনতাসে না নইলে! ওরা বড্ডো বাইড়া গিয়াসে! হিন্দি বই না সাপাইলা ব্যবসা চলতাসে না ভৌস্তকদাদার। আমি তো হিন্দি সিখুম না, মইরা গেলেও না। আপনারা করেন তো কন, কথা কই!"
রাজু বললো, "ভৌস্তকদা মানে ভৌস্তক গাঙ্গুলি ? 'করে খাও' পার্টির আমলের তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী? করে খাও কোমায় যাওয়ার পর এখন উনি বই চাপানোর ব্যবসা শুরু করেছেন?"
রাজি হয়ে গেলাম সাইকেলদার কথায়। শারুক খানের স্কুলে পড়ে বড়ো হয়েছি, হিন্দি জানিনা মানে ? একশো বার জানতা হ্যায়, হাজার বার জানতা হ্যায়! ঠিক করলাম যাবো একদিন সাইকেলদার সাথে ভৌস্তকদার বাড়ি।
No comments:
Post a Comment