Tuesday, 24 September 2019

কার্তিক বিভ্রাট

-সে টাকা নাহয় আমি দিলাম। তোদের চাকরিটা তো আর করে দিতে পারলাম না। আর হীরুও কিছু দিও পারলে। মিকিভাইয়ের বিয়ের পর প্রথম কাত্তিকপূজো বলা কথা। কার্তিক তো ফেলতেই হয়। কী বল সৌণক?
-একদম। তাহলে অর্ডার দিয়ে দিই আমাজন থেকে। আগেরবার করেছিলাম যেরকম... বলতে বলতেই থেমে গেল বুড়োদা। মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়ল নীরবতা। আমরাও দেখলাম ভুলোদার মুখটা বিরিয়ানির হাঁড়ি চাপা দেওয়ার কাপড়টার মতো লাল হয়ে গেল। জুলিয়াস সীজারের মতো গলায় ভুলোদা আর্তনাদ করে উঠলো, "সৌণক, তুমি!" তারপর গটগট করে বাড়ির দিকে চলে গেল আমাদেরকে পিছনে ফেলে।
বুঝলেন না তো! বুঝতে গেলে আপনাদের ফিরে যেতে হবে ঠিক একবছর আগের কার্তিকপুজোর দিনে। তখন সবে আমাদের ভুলোদার বিয়ে ঠিক হয়েছে। মাস তিনেক পরে ডিসেম্বরে বিয়ে। এমনসময় হীরুদার ফোন, ভুলোদা নাকি পাগল হয়ে গেছে। হীরুদা যাচ্ছিল মোষখাটালের মোষেদের গা ধোয়াতে।তখন নাকি ভুলোদাকে জিপিওর সামনে এক কাঁধে একটা কার্তিকঠাকুর অন্য কানে ফোন নিয়ে উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখা গেছে।
আমাদের তখন কাজ বলতে কলেজ ইউনিয়নে আড্ডা দেওয়া আর বিকেলের দিকে ভুলোদার বাড়ি গিয়ে লেগপিস-ডানহিল সমেত সরকারের তুলোধোনা করা। কার্তিকপুজো থাকায় কলেজেও ছুটি। আমরা পত্রপাঠ গিয়ে হাজির হলাম ভুলোদার বাড়ি। মোষেদের স্নানাদি
ও অন্যান্য প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরে হীরুদার আসতে দেরী হয়েছিল একটু। যাইহোক, গিয়ে দেখি ভুলোদার প্রাসাদোত্তম বাড়ির সামনে আমাদের সেমিকম্যুনিষ্ট ভুলোদা চুপচাপ বসে আছে আর ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদছে। পাশে পড়ে আছে সেই কার্তিকঠাকুর যার ময়ূরটি লেজ হারিয়ে ময়ূরীতে পরিণত হয়েছে। আর ভুলোদার পোষা নেড়িকুকুরটা অনেকক্ষণ ময়ূরের সাথে ভাব জমানোর বৃথা চেষ্টা ছেড়ে কার্তিকের তীরটা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করছে।
আমরা কাছে যেতেই ভুলোদা আমাদের হাতে ডানহিলের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "কেউ আমার ভালো চায় না।"
কথায় কথায় জানতে পারলাম আজ সকালে ভুলোদার বাড়িতে আমাজন থেকে একটা অর্ডার এসেছিল ক্যাশ অন ডেলিভারীতে। সেটা খুলে নাকি দেখা যায় তাতে একটা কার্তিকঠাকুর আর একটা চিরকূট। তাতে লেখা, "বাবা, আমি আগেই এসে গেলাম। তুমি জলদি মা'কে নিয়ে এসো।" কিন্তু ততক্ষণে ডেলিভারীবয় বাইক চড়ে হাওয়া। তারপর আমাজনে বেশ কয়েকবার ফোন করেও ওরা ওটা ফেরত নিতে চায়নি। বিক্রি হওয়া ঠাকুর নাকি ওরা ফেরত নেয় না। ক'দিন আগের গনেশপুজোর পর মুম্বাইতে নাকি পুজো হওয়া গনেশ ফেরতের লাইন লেগে গিয়েছিল। তাতে নাকি আমাজনের বেজায় ক্ষতি হয়েছে।
যাইহোক, এরপর জিপিওতেও গিয়েছিল আমাদের ভুলোদা যেখানে হীরুদা দেখেছে। কিন্তু তারা নাকি পরামর্শ দিয়ে পুজো করে ফেলার। অগ্রিম নিমন্ত্রণও চেয়ে রেখেছে তারা।
আমরাও সেই পরামর্শই দিলাম। পুজো করে নাও ভুলোদা। তা শুনে ভুলোদা বলে উঠলো, "তুমি বুঝতে পারছো না রাজর্ষি। আমি এখন অবিবাহিত। এই অবস্থায় কার্তিক পুজো করলে ছি ছি পড়ে যাবে। আমার আর বিয়ে হবে?" আমরা বললাম, "কিন্তু ঠাকুর যদি পাপ দেয়! কার্তিকঠাকুরের পাপ তো আর যে সে পাপ নয়!" কিন্তু ভুলোদা তার সিদ্ধান্তে অটল।
ইতিমধ্যে হীরুদাও এসে গেছে। ফেলুদা, ব্যোমকেশ আর কিরীটী এক হয়ে যা বোঝা গেল তা হলো এই যে কেউ ভুলোদার প্রাইম অ্যাকাউন্ট ইউজ করে অর্ডার দিয়েছে কার্তিকটা। কিন্তু সেই অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পাড়াশুদ্ধু লোকের জানা থাকায় আর জানা যায়নি কে বা কারা রয়েছে এই ঘটনার পিছনে।
ঘটনাটা রহস্যই হয়ে ছিল এতোদিন। জানতাম শুধু আমি আর বুড়োদা। আজ বুড়োদা মুখ ফস্কে না বলে ফেললে হয়তো কেউই জানতে পারত না কোনদিন।
যাইহোক, ভুলোদা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আজ অনেকদিন পর। ভুলোদার প্রিয় অরেঞ্জ চিলিজের থেকে খাবার অর্ডারও দেওয়া হয়েছিল সেইমতো। খাবার এসেও গেছে কিন্তু ভুলোদাই তো হাওয়া। এখন তো আর ভুলোদাকে ফোন করে পেমেন্ট করে দিতে বলা যায় না! নিজের পকেট থেকেই খসবে আজ।
সেদিন অবশ্য ভুলোদা নিরাশ করলেও পাড়ার লোকেরা কিন্তু নিরাশ করেনি। তারাই শেষমেশ চাঁদা তুলে বামুন ডেকে পুজোর ব্যবস্থা করে। ভুলোদার কাছের লোক বলে রাতের খিচুড়িভোগে রীতিমতো নিমন্ত্রণও জানিয়েছিল আমাদের। গিয়ে দেখি, প্যান্ডেলের ভিতরে সেই কার্তিক ঠাকুর যার হাতে তীর না থাকায় কেউ একটা ডান্ডা ধরিয়ে দিয়েছে। আর প্যান্ডেলের উপর লেখা, "বাবা আমায় ঘরে ঢুকতে দেয়নি তাই পাড়ার কাকুরা থাকতে দিয়েছে।"

Thursday, 19 September 2019

ভুলোদার দেশলাই বিভ্রাট

বিকেল চারটে কি সাড়ে চারটে হবে, রোজকার মতো আমি আর রাজু গড়ের মাঠে বসে ঘাস চিবুচ্ছি। ভুলোদা ফাইনালি আজ কথা দিয়েছে আমাদের জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ডের বাড়ি নিয়ে যাবে, একটু সন্ধ্যে হলে। বেকার জীবনের অবসান ঘটছে ভেবে আনন্দটা খুব চেষ্টা করেও ঠিক ফিল করে উঠতে পারছিনে। বার বার মনে হচ্ছে, কাল থেকে এই ঘাস গুলো শুধু ঘোড়াতেই খাবে...
"গোরুতে, বুড়োদা, গোরুতে"  রাজু  ভুল শুধরে দেয়, "ঘাস, পাতা, মাধ্যমিকের খাতা সব গোরুতেই খাবে এর পর!"
কটাং করে একটা চাঁটি মারলাম ওকে। ইমোশনের মধ্যে  গোরুর ডাক না ডাকলেই হচ্ছিলো না যেন ওর! পকেট থেকে পিসিমনি বিড়ির প্যাকেটটা সবে বের করেছি, রাজু বলে, "মালটা  রেডি রাখো, দেশলাইদা আসছে!"
দেশলাইদার সাথে অনেকদিনের আলাপ। উনি আমাদের ঘাস চিবুনোর সিনিয়র। মানে আমাদেরও আগে থেকে গড়ের মাঠে আসেন, একলাই; একটু দূরে বসে আপন মনে লম্বা ঘাস, বেঁটে ঘাস, মোটা ঘাস এসব বিভিন্ন রকম ঘাস চিবিয়ে থাকেন, আর উদাস দৃষ্টিতে আকাশ দেখেন। উঠে যাওয়ার ঠিক চার মিনিট পনেরো সেকেন্ড আগে এসে আমাদের পাশে বসেন। একটা হাত বাড়িয়ে দেন, আমি বা রাজু দেশলাইয়ের বাক্স খুলে একখানা বার করে ভদ্রলোকের হাতে দিই, উনি নির্লিপ্ত ভাবে সেটা নিয়ে কান খোঁচাতে শুরু করেন। ঠিক পৌনে তিন  মিনিট পরে "আঃ" বলে একটা স্বস্তির নিঃস্বাস ছেড়ে বলেন, "কাইল ওইদিগেরে ঘাসডা এট্টু ট্যাস্ট কইরা দেখেন মোটাভাই, ভালো রস হইসে!" তার পর উঠে  চলে যান। উনি  আমাকে মোটাভাই আর রাজুকে শুঁটোভাই বলেন, আর আমরা ওনাকে বলি দেশলাইদা।
দেশলাইদাকে দেখে মনটা ফের খারাপ হয়ে গেলো। আজ ওনার বাড়ানো হাতে গোটা বাক্সখানা তুলে দিয়ে বললুম, "রাখুন দেশলাইদা, আর হয়তো দেখা হবে না কোনোদিন"
দেশলাইদা চোখে একটা চশমা পড়েন, পরনে লুঙ্গি আর হাফহাতা ফতুয়া।  আমার কথাটা শুনে আমার দিকে তাকালেন।  তারপর তাকিয়েই রইলেন। খানিক্ষন পর বুঝলাম, জানতে চাইছেন কেন দেখা হবে না।  রাজুও বুঝেছিল ব্যাপারটা, সেই বললো, "একটা চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে বুঝলেন দেশলাইদা, আর হয়তো আসতে পারবো না এদিকপানে!"
আমি বললুম, "ছুটিছাটার দিনে এসে দেখা করে যাবো নাহয় আপনার সাথে। ভালো থাকবেন। " 
দেশলাইদার চশমা নেমে এসেছে প্রায় নাকের ডগায়, "আরে কও কি শুঁটোভাই, তুমাদের চাকরি হোতাসে ? ও শুঁটোভাই, আমারেও একখান জুটায়ে দাও না, ও মোটাভাই"...
পাক্কা পনেরো মিনিট।  পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে এই এককথা বিভিন্ন সুরে ও কথায় বার বার বলে গেলেন দেশলাইদা। শেষকালে খানিকটা বিরক্ত হয়েই উঠে পড়লাম মাঠ থেকে। এমনিতেও সাইকেল স্কোফিল্ডের বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিলো।
অতঃপর বাস ধরে ঝুলে ঝুলে ভুলোদার বলে দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে গমন। ভুলোদা আমাদের যেরকম বিবরণ দিয়েছে ভদ্রলোকের, তাতে কনফিডেন্স পাওয়ার বদলে আমি খানিকটা বোমকে গেছি। 'করে খাও' পার্টির মস্ত লিডার ছিলেন সাইকেল, কিন্তু 'করে খাও' গিয়ে রাজ্যে এখন  'পাল্টি খাও' পার্টির শাসন। 'পাল্টি খাও'-এর পিসিমনি শপথ নিয়েছিলেন দেশ থেকে বহিরাগতদের তাড়াবেন।  সেই শুনে আমাদের সাইকেলদাদা 'বসে  খাও' পার্টির সাথে জোট বাঁধার মিটিং  করতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা। সেখানেই ভদ্রলোককে  ধরে 'লুটে খাও' পার্টির কিছু লোক।  তারপর ? "সাইকেল স্কোফিল্ড নাম হ্যায় তো জেল মে তো জানা হ্যায়"  স্লোগান দিতে দিতে ওনাকে সিধে নিয়ে যায় কোর্টে। সেখানে ৫ টাকার  স্ট্যাম্প পেপার কিনে ওনার নামের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় 'জয়শ্রীরাম"। তারপর থেকেই সাইকেলদা আন্ডারগ্রাউন্ড। তবে ওনার এখনো কিছু বন্ধু আছে, যারা 'করে খাও' থেকে পাল্টি খেয়ে 'পাল্টি খাও' এর মেম্বার এখন।  তারা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার চপোন্নতিতে মন দিয়েছে, মানে চপের ফুডচেন খুলেছে। সেইসব দোকানেই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবেন হয়তো উনি, সেরকমই আমাদের বলেছে ভুলোদা।
তা এত বড়ো বিপ্লবীর সাথে একলা একলা দেখা করাটা ঠিক মানায় না, তাই ভুলোদাকে ধরে কয়ে আসতে রাজি করিয়েছি আমাদের সাথে। সে বলেছে সে আলাদা করে ওলায়  আসবে, তার আবার বাসের ভিড় পোষায় না! অগত্যা, এই ভর সন্ধ্যেবেলা একখানা নোংরা এঁদো গলির মধ্যে ঢুকে তিন নম্বর বাড়ির গোয়ালের পাশ দিয়ে গিয়ে আশশ্যাওড়া গাছের পাশে একটা ক্লাবঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রাজু। ভুলোদা কিংবা স্কোফিল্ড, কারুরই টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না!
-"আই রাজু, ঠিক এলুম তো রে?"
-"হ্যাঁ গো বুড়োদা, এক্কেরে ঠিক! এই তো আকাশবাণী স্পোর্টিং ক্লাব, এখানেই আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে সাইকেলদাদা!"
-"কিন্তু দরজায় তো তালা! কই তিনি? ভুলোদাই বা কই? এটা আন্ডারগ্রাউন্ড না রে, ব্লান্ডারগ্রাউন্ড,  আমাদের। ভর সন্ধ্যেবেলা, আশশ্যাওড়া গাছ. জয়শ্রীরাম!"
রাজুর  একটু সাহস বেশি। সে একবার গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে, "দাঁড়াও ফোন করি ভুলোদাকে।"
কিন্তু ফোন লাগে না. ব্যস্ত। একবার, দুবার, তিনবার, ব্যস্ত। "দুত্তেরি ছাই" বলে ফোনটা পকেটস্থ করে ও। আমি নিজের ফোন থেকে ফোন করি ভুলোদাকে, এবং, ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং এর সাথে সাথেই  কান ফাটানো চিৎকার করে ওঠে কেউ একজন "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...." ঠিক আমার মাথার উপর আশশ্যাওড়া গাছের মগডালে।  আমি আঁতকে উঠি, হাত থেকে ফোন পড়ে কেটে যায় ফোন খানা, এবং চিৎকারও বন্ধ! পরক্ষনেই দেখি রাজু ভূপতিত। মাথা চেপে ধরে উঃ আঃ করছে। ওকে তুলে দৌড়াবো নাকি আগেই দৌড়াবো ভাবতে গিয়ে চোখ পড়ে রাজুর পাশে পড়ে থাকা প্রমান সাইজের ট্যাবখানায়। এটাই মাথায় পড়েছে তবে ওর! কিন্তু আশশ্যাওড়ার পেত্নীর কাছে লেনোভোর ট্যাব কি করছে! ভাবতে ভাবতে দেখি আশশ্যাওড়ার মগডাল থেকে দুইখান গোদা সাদা পা ঝুলছে, আসতে আসতে  নিচু হচ্ছে সে দুটো।  তারপর প্রকটিত হলো একখানা বারমুডা, তারপর ব্র্যান্ডেড হাফশার্ট আর সবশেষে ভুলোদার অমায়িক বদন খানি! হাতে ভর দিয়ে সে  ঝুলছে মগডাল থেকে, আর চিঁচিঁ করে কি একটা বলছে।
রাজু উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষনে, "তুমি গাছে উঠে কি করছিলে ভুলোদা? আর ওই  চিৎকারটা কার ছিল ?"
"আগে নামাও  আমাকে তোমরা... ও সৌনক, একটু ধরো!"
রাজুর ব্রহ্মতালুতে চোট লেগে মেজাজ গরম, "আগে বলো"!
ঝুলায়মান ভুলোদার চিঁচিঁর মর্মার্থ ছিল এই যে, সে অনেক আগে এসে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমরা বা সাইকেল কেউই না থাকায় সে ভাবে বৌদিকে একটা ফোন করবে। টাওয়ার না পেয়ে রোখের মাথায় গাছে চড়ে যায়। এতক্ষন কথা বলছিলো, কিন্তু ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে  আমার ফোনটা  ঢোকে। ভুলোদার রিংটোন হলো এই কিছুদিন আগেই কোলাঘাটের চা দোকানি টার্নড প্লেব্যাক সিঙ্গার কালুদির গাওয়া নতুন গান 'মেরি তেরি'র প্রিলুড। সেটাই বাজাতে ভুলোদাও আমাদের মতো চমকে গিয়ে ট্যাব ফেলে দেয়  রাজুর মাথায়। তার পরেই নামার চেষ্টা করতে এই বিপত্তি। নামতে পারছে না।      
আমার একটু মায়া হলো। রাজুকে বললাম, "চ, তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা, তার পর হেই সামালো হাইয়া বলে যত জোরে পারিস টান মারবি।  ভুলোদা, তুমি হাত ছেড়ে দিও" বলে আমি জামার হাতা গোটানো শুরু করলাম! রাজুর এখনো রাগ যায় নি, সে,  "হুঁহ যত্তসব! গাছে উঠে বসে আছে! তুই একটা ঠ্যাং, আমি একটা! একি  মুরগি নাকি যে তুমি একটা ঠ্যাং আর আমি একটা! আস্ত জলহস্তী!"- এইসব গজ গজ করতে করতেই জামার হাতা গোটাচ্ছিলো, হঠাৎ পিছন থেকে খুব পরিচিতি গলায় কেউ বলে উঠলো, "আরে মোটাভাই-শুঁটোভাই! আপনারা  হেইখানডায় কি করতাসেন ?"
আমরা ভুলোদার কথা বেমালুম ভুলে পিছন ফিরলাম, "আরে দেশলাইদা ! আপনি!"
কিন্তু ভুলোদা ভুলতে দিলে তো! "ওরে ওই স্কোফিল্ড রে! ওরে আমাকে নামা রে কেউ! ওরে ডালটায় কাঠপিঁপড়ের বাসা আছে রে! আঙুলে কামড়াচ্ছে!"
আর তখন ভুলোদার আঙ্গুল! সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড হলো আমাদের দেশলাইদা ! 'করে খাও' পার্টির নেতা! পনের মিনিট ধরে আমাদের থেকে চাকরি চেয়ে গেছে আজ বিকেলে, আর ভুলোদা এত ঘটা করে তার কাছে এনেছে আমাদের চাকরির জন্যে! আমি রাজুর মুখের দিকে, রাজু আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম! দেশলাইদা ভুলোদার চিৎকারে লক্ষ্য করেছেন ভুলোদাকে, "ভুলাদাদা! আপনে ! গাসের উপর কি করতাসেন?"
ভুলোদার উত্তর দেওয়ার পরিস্থিতি নেই , আমিই বললুম, "আপনার কাছে এনেছিল দেশলাইদা, চাকরির জন্যে! কোনোদিন বলেন নি তো আপনি 'করে খাও' -এর এতবড়ো লিডার!"
দেশলাইদা ওরফে সাইকেলদা অমায়িক হেসে বললেন, "সে দিন হ্যাক্কালে সিলো, বুইলেন! এক্ষন আর কইরা খাওনের দিন নাই! এখন সব লুইট্যা খাও!
"কিন্তু আপনার বন্ধুরা? পাল্টি খাও পার্টির? চপ চেনের মালিকরা?" রাজুর ব্যাকুল জিজ্ঞাসা!
-"তারা হক্কলে ফের পাল্টি খাইয়াসে! লুইট্যা খাইতাসে এহন। আমারেও সিনতে পারে  না আর!" দুঃখী মুখ করে বললেন সাইকেলদা! 
হঠাৎ ধপাস করে আওয়াজ এবং গগনবিদারী আর্তনাদ! ভুলোদা পিঁপড়েভয় এবং মৃত্যুভয়ের  মধ্যে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। না, মরেনি, তবে তিন চারটে হাড় না গেলে খুশি হবো না।  এত্তদিন ধরে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে শেষে দেশলাইদা প্রসব করলো লোকটা! কিন্তু যন্ত্রনা এখানে শেষ হলে তো! আমাদের সব্বাইকে চমকে দিয়ে ফের একবার কালুদি আর্তনাদ ছাড়লেন,  "আঁ আঁ আঁ আঁ আঁ...."! ভুলোদার ট্যাব! বৌদির নামখানা জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে!
যন্ত্রনা ভুলে একলাফে খাড়া ভুলোদা, এবং ফোন কানে দিয়ে "হালুউউ, বলুউউউ " বলে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালো আমাদের দিকে, "এই একটু ধরো তো" বলে আমাদের ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে জানি না, তবে বলে গেলো, "তোমরা তো দেখছি চেনো সবাই সবাইকে, কথা টথা বলে নাও তবে"।  বলে সিধা গোয়ালের পাশ  দিয়ে ধাঁ !
সাইকেলদা সেইদিন চা খাইছিলেন আমাদের। তারপর চশমাটা একটু নামিয়ে বলেছিলেন, "হ্যাকডা কাম আসে।  ভৌস্তকদা ফিরাসে রাশিয়া হইতে। ও লোক খুঁইজতাসিলো, হিন্দি জানা লোক।  বঙ্কিমসন্দ্রের হিন্দি অনুবাদ করনের তরে । 'লুইট্যা  খাও' পার্টির লোকসনেরা কিনতাসে না নইলে! ওরা বড্ডো বাইড়া গিয়াসে! হিন্দি বই না সাপাইলা ব্যবসা চলতাসে না ভৌস্তকদাদার। আমি তো হিন্দি সিখুম না, মইরা গেলেও না। আপনারা করেন তো কন, কথা কই!"
রাজু বললো,  "ভৌস্তকদা মানে ভৌস্তক গাঙ্গুলি ? 'করে খাও' পার্টির আমলের তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী? করে খাও কোমায় যাওয়ার পর এখন  উনি বই চাপানোর ব্যবসা শুরু করেছেন?"
রাজি হয়ে গেলাম সাইকেলদার কথায়। শারুক খানের স্কুলে পড়ে বড়ো হয়েছি, হিন্দি জানিনা মানে ? একশো বার জানতা হ্যায়, হাজার বার জানতা হ্যায়! ঠিক করলাম যাবো একদিন সাইকেলদার সাথে ভৌস্তকদার বাড়ি।    

Wednesday, 9 May 2018

রাখে হরি মারে কে

চারদিকে লালচে ধোঁয়া, ভূতের মতো লোকজন হিম্বি-ডুম্বি বলতে বলতে আমায় ঘিরে নাচছে। তাদের মুখগুলো দেখে কোষের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। নাকের জায়গায় ইয়া বড়ো থ্যাবড়া নিউক্লিয়াস। চোখগুলো আর চোখ নেই, মাইটোকন্ড্রিয়া হয়ে জ্বলছে। আর এন্ডোপ্লাসমিক রেটিকিউলিয়ামটা কেমন যেন কুটিল হাসি হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায়। ভয়ে চোখ বন্ধ করতে যাব এমন সময় শুনতে পেলাম কে যেন চেঁচিয়ে বলছে, 'স্যার, তেল গরম হয়ে গেছে।'
তেল গরম! শুনেছি নরকে নাকি পাপী-তাপীদের শাস্তিস্বরূপ গরম তেলে কড়কড়ে করে ভাজা হয়। সাথেসাথেই মনে পড়ল আজ বুড়োদার সাথে থানায় যাওয়ার কথা ছিল। তাহলে কি থানায় আমাদের এমন পিটিয়েছে যে সোজা নরকে এসে পৌঁছেছি!
যাক এসে যখন পড়েছি তখন আর কী করা যাবে। একটা কথা ভেবে তাও খুশি হলাম যে কিডনিটা বেঁচে গেছে। এমন দুর্মুল্যের বাজারে যেখানে মরা কুকুরদেরও ছাড় দিচ্ছে না সেখানে কিডনি সমেত মরাটা কি চাট্টিখানি কথা!
এমনসময় ঠুং ঠাং শব্দ শুনে চোখ খুললাম। দেখি হাতে কাঁটাচামচ নিয়ে কয়েকজন আমায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বুঝতে পারলাম ওরাই আমার খাদক আর নরকে ভাগারকান্ড রমরমিয়েই চলছে। খদ্দেরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, আরে, এদের তো চিনি। আর ডি পি, এস আর আর অর্জুন স্যার! যাদের কথা মনে পড়লেই আমার ভোরবেলায় ইয়ে পেয়ে যেত। রাজর্ষিভাজা হবে শুনে এরা স্কুল কামাই করে এতোদূর এসেছে! ডেডিকেশন মাইরি!
এরপর ওঁরা তিনজন আমায় টিপেটুপে পরীক্ষা করতে লাগলেন। নজর আমার পেটের দুই পাশে। সাহস করে শেষমেশ কিডনির কথাটা জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। শুনে ওঁনারা এমন হাসতে লাগলেন যে আমার পিলে চমকে উঠল। সর্বনাশ! ওঁরা কি আমার কিডনির লোভেই এসেছেন। আজকাল কি ভূতেদেরও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি হয় নাকি!
এমন সময় শুনি বুড়োদার গলা, 'ওঠ রাজু ওঠ।' এতক্ষণ তো বুড়োদার কথা মনেই ছিল না। গর্ব হল বুড়োদার জন্য। নিশ্চয় পালিয়েছে, আর এখন এসেছে আমায় বাঁচাতে। কিন্তু উঠতে গিয়ে টের পেলাম উঠতে আর পারছি না। কে যেন সর্বশক্তি দিয়ে টেনে রেখেছে। তাও শেষমেশ উঠে পড়লাম। উঠে দেখি বুড়োদা মুখের উপর চেঁচাচ্ছে, 'ওরে এমন ঘুমালে দেখবি কোনওদিন লোকজন শ্মশানে গিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। চল, থানায় যেতে হবে তো।'
বুঝলাম স্বপ্ন ছিল। জামাকাপড় পরে বেরুলাম। একে ভোরের স্বপ্ন, তায় বেরোতে না বেরোতে একশালিখ দেখেছি। কিডনিটাকে আমার একটা গান ডেডিকেট করতে ইচ্ছা হল, 'এ চলাই শেষ চলা হয়তো...'

যারা আমাদের আগের পর্ব 'মারে হরি রাখ কে' পড়েছেন, তারা অলরেডি জেনে গেছেন যে বুড়োদার কারণে আমার একখানি কিডনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যদিও আজ যে দেখলাম, তাতে এখন কন্ডিশান অনেকটাই ভালো। এমনকি কিডনিটা আমার বদলে বুড়োদার থেকে নেওয়াই যায়।
যাইহোক থানায় পৌঁছালাম। আমাদের দেখে বড়সাহেব প্রথমে এমনভাবে তাকালেন যে আমরা ওঁনার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছি। কিন্তু নাম বলতেই উনি বসতে বলে আমাদের জন্য জলখাবারের অর্ডার দিলেন। একটু পরেই বলি চড়বে কীনা, তাই এমন জামাই আদর।
কিন্তু তারপর যেটা হলো, সেটার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। উনি আমাদের সামনে একটা কুড়ি হাজার টাকার নোটের বান্ডিল এনে বললেন, 'এই নাও। সরকার থেকে তোমাদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সাহসিকতার জন্য।' শুনে আমরা যেন মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো থেকে পড়লাম। বলে কী!
তারপর যেটা জানতে পারলাম, ইদানীং এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি খুব বেড়ে গিয়েছিল। অম্বল আর কম্বল এই দুই ভাই রাতের বেলা নাকে গামছা বেঁধে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করতে বেরোত। যথারীতি এ ব্যাপারে পৌরসভার কোন হেলদোল ছিল না। অন্যদিকে ম্যানহোলের ঢাকনা খোয়া গেলে দুর্গন্ধে পাড়ায় টিকতে পারা যেত না। তাই বাসিন্দারা নিজেরাই চাঁদা তুলে কিনে নিত। একেকটি ঢাকনা পাঁচ'শ থেকে আট'শ টাকায় বিক্রি হতো। লোকজনের খরচও বেশী হতো না আর একেকটি ঢাকনা মাসে একবার চুরি করেই চলে যেত চোরেদের।
তা ওই কুয়োটা ছিল চোরাই ঢাকনা লুকিয়ে রাখার জায়গা। সেদিন রাতেও নাকি তারা চুরি করতে বেরিয়েছিল। কিন্তু বুড়োদার গান শুনে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কুয়োতেই লুকিয়ে পড়ে। আর পরে বুড়োদা গিয়ে পড়ে ওদের ঘাড়ে।
চোরেরা নাকি এখনও আইসিইউতে, কথা বলার অবস্থায় আসেনি। ঢাকনা সাপ্লাইয়ার নাকি দেখা করতে এসে চোরেদের অবস্থা দেখে ভয়ে নিজমুখে সব দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। ক'দিন আগেই নাকি পাড়ার মোড়ের মোড়েকালি স্বপ্নে ওকে ভয় দেখিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এতেই শেষ নয়। বুড়োদার নাম সাহসিকতার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। তাছাড়া আমাদের নিয়ে নাকি একটা বিজয় মিছিলেরও ব্যবস্থা হয়েছে। শুনে তো আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না!
যাইহোক, টাকা ক'টায় বেশ কয়েকদিন ভালোই চলবে। হোটেলের মাটন-চিকেনে এখন আর ভরসা নেই। ভাবছি একটা নধর পাঁঠা নিয়ে ভুলোদার বাড়িতে হানা দেব। অনেকদিনই যাওয়া হয়নি। 
আর হ্যাঁ, যারা এতোদিন আমাদের একঘরে করে রেখেছিলেন, ট্রিট চাইলে এলে ঘাড়ে বুড়োদা ছুঁড়ে মারব বলে রাখলুম।।

Sunday, 6 May 2018

মারে হরি, রাখে কে

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা।
ভোর তখন সাড়ে পাঁচটা। আমি সবে ঘুমের ফার্স্ট হাফ শেষ করে টয়লেট ব্রেকটা স্কিপ করে স্ট্রেট সেকেন্ডহাফে ঢুকব, এমন সময় ঘরের দেওয়াল-ছাদ বিদীর্ণ করে আওয়াজ এলো 'সেলফি ম্যাঁয়নে লে লিয়া...' রিংটোন এরকম রাখার একটাই কারণ, রাস্তাঘাটে ফোন বাজলে আমি শুনতে না পেলেও পাশের লোকটা ঠিকই বলবে, 'দাদা, হয় ফোনটা ধরুন আর নাহলে কালীঘাটের গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসুন।' ঘুরিয়ে ফোন করবার টাকাটা বেঁচে যায় তাতে। কিন্তু এমন অসময়ে!
ফোন নিয়ে দেখি বুড়োদার ফোন। বুড়োদার তো এখন স্বপ্নে তাঁর ভার্চুয়াল গার্লফ্রেন্ড অভিষিক্তাদির সাথে স্বপ্নে প্যারিসে যাওয়ার কথা। তাহলে কি স্বপ্নেও আজকাল বুড়োদাকে লোকজন ফ্রেন্ডজোন করতে শুরু করল!
যাইহোক, ফোন তুললাম। ফোন তুলেই শুনলাম বুড়োদা রাগসঙ্গীত গাইছে। সাথে একটু আধটু কান্নাও আছে, অনেকটা হিমেশ রেশমিয়া 'নাম তেরা তেরা' ছেড়ে ভৈরবী রাগ গাইলে যেমন শোনায়। বুঝলাম সিওর লেঙ্গি কেস। জিজ্ঞেস করলাম, 'কে লেঙ্গি মারলো?'
-আর লেঙ্গি মারবে না রে! আমার তো আর লেগ-ই ঠিক নেই। 
তারপর পাঁচমিনিট যা বলল তাতে বুঝলাম বুড়োদাকে হরি তুলে নেওয়ার আগে আমাকে শ্রীহরি হাসপাতালে ছুটতে হবে।
হাসপাতাল পৌঁছালাম। বুড়োদার এরকম না হলে জানতেই পারতাম না এটা হাঁস-মুরগীর খামার না হাসপাতাল! বুড়োদার ঘরে ঢুকে দেখলাম বুড়োদার পায়ে মোটা করে সাদা ন্যাকড়া জড়ানো। পায়ে বাঁধা একটা দড়ি উপরে ফ্যান থেকে নেমে বুড়োদার হাতে ধরা। ওটা ধরে টানতেই বুড়োদার ডান ঠ্যাং উঠছে আর ছেড়ে দিলে নামছে। হাসপাতালে এক্সরে না থাকায় নার্স মোবাইলে অনলাইন এক্সরে দিয়ে দেখেছে পা ভাঙেনি। তাই পায়ে কাপড় জড়িয়ে কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে গেছে ডেটিংএ। 
রুগীর সাথে দেখা করতে গেলে ফল নিয়ে যেতে হয়। আমিও আসার সময় কয়েকটা কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে এসেছিলাম। বুড়োদা আমায় দেখেই দড়ি ধরিয়ে বলল, 'নে, টানা শুরু কর। আমার হাত ব্যথা হয়ে গেছে।' কাঁচা আম খেতে খেতে আর দড়ি টানতে টানতে ভাবলাম আমাদেরই আর কিছু হলো না!
বুড়োদাকে নাকি কালরাত্রে দেশাত্মবোধক গানে পেয়েছিল। মাঝরাতে পাড়ার কুকুরদের ঘুম চটকে মার্চ করতে করতে 'চলরে চলরে চল/ উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/ নিম্নে উতলা ধরণীতল/ চলরে চলরে চল' গাইছিল। পথে একটি পরিত্যক্ত কুয়ো করকেটের ছাউনি দিয়ে ঢাকা ছিল। ছোটবেলায় পড়েছিলাম ব্রিজ পার করার সময় মার্চ করতে নেই। কিন্তু বুড়োদা সেটা বুঝলে তো! অভিকর্ষের টানে 'নিম্নে উতলা ধরণীতলে পৌঁছাতে বেশী সময় লাগেনি।
কিন্তু আমাদের বুড়োদা ফাইটারের জাত। ইদানীং মাউন্টেনিয়ারিং শিখছে। যেখানে সেখানে তরতর করে এমন অবলীলায় উঠে পরে যে মনে হয় ডারউইন দাদুই ঠিক। শুধু গাছে চড়াটাই বাকি রেখেছে কারণ গাছের অপঘাতে মৃত্যুও তো প্রাণ হত্যারই সামিল। আমাদের লেজেন্ড বুড়োদা সেই পঙ্গু অবস্থায় কুয়ো চড়ে উড়োদা হয়ে হাসপাতাল পৌছেছে। বুড়োদা আমাদের গর্ব, আমাদের অহঙ্কার, আমাদের দলের মাসদুর রহমান বৈদ্য। যাইহোক, আমার একটা কিন্তু খটকা লাগছিল। একেই বৃষ্টি-বাদলার দিন, মাটি নরম। বুড়োদা গর্তে পড়েছিল নাকি বুড়োদা পড়ে যাওয়ায় গর্ত তৈরী হয়েছিল। মানে বুড়োদার যা ওজন, উল্কাপতনের চেয়ে এফেক্ট কম কিছু হওয়ার নয়।

যাইহোক, বুড়োদাকে যতটা সিরিয়াস অবস্থায় দেখবো ভেবেছিলাম ততটা মোটেও নয়। বরং দু'তিন দিন পরেই ছাড়া পেয়ে যাবে। এমন সময় শুনি কে একজন গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করছে, 'সৌণক ব্যানার্জী, আপনি?'
-হ্যাঁ।
-আর আপনি?
-রাজর্ষি। রাজর্ষি সরকার। ওর বন্ধু, কী দরকার? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলাম।
-থানা থেকে আসছি। সুস্থ হয়ে থানায় আসবেন একবার।
বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে একশ আট। বুড়োদা আমার দিকে তাকাল। আমি মনে মনে ভগবান কে অশেষ ধন্যবাদ দিলাম একজোড়া কিডনি দিয়ে জন্ম দেওয়ার জন্য। হাজার হোক, অসুস্থ মানুষের থেকে তো আর কিডনি চাওয়া যায় না।
শ্রীহরিতে আসাটাই আমার কাল হলো। মারে হরি, রাখে কে!!

Friday, 2 March 2018

ভুলোদা এবং ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ

শীতটা সবে গেছে। ইদানিং বিকেলের দিকে দিব্বি ফুরফুরে হাওয়া দিয়ে থাকে, আর আমি আর রাজু নিয়ম করে গড়ের মাঠে বসে ঘাস চিবিয়ে থাকি। বিয়ের পরে ভুলোদা আমাদের জন্যে বাড়ির বাইরে 'প্রবেশ নিষেধে'র প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে দিয়েছে। নাঃ, আসলে আমরাই ভুলোদাকে বয়কট করেছি!
দোষটা অবশ্য ভুলোদাকে ঠিক দেওয়া যায় না, বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন বৌদি ভালো ভালো রান্না করতো, আর আমাদের ভুরিভোজের ব্যবস্থা হতো কিন্তু ভুলোদার সেসব চোখে দেখাই সার ছিল, চেখে দেখতে গেলেই বৌদির কটাক্ষে ভুঁড়ি ভস্ম হওয়ার ছিল কিনা। কতদিন ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ রুটি খেতে খেতে দেখা যায় যে সামনে বসে অপোগণ্ডের দল প্রেমসে মুরগির ঠ্যাং সাঁটাচ্ছে! আমাদেরই কষ্ট হতো বেচারার জন্যে! গলা দিয়ে নামতেই চাইতো না! কিন্তু বৌদির রান্না এমন অমৃততুল্য যে ভুলোদার রান্নাকেও হার মানিয়ে দেয়, তাই বৌদির কথা ভেবেই কোনোরকমে গলাধঃকরণ করে নিতে হতো আর কি বিরিয়ানী বা মুরগি-রোস্ট।
 বেশিদিন চললো না ব্যাপারটা। একদিন এরকম নেমতন্ন খেতে গেছি এরকম, বৌদি ছখানা থালা দিয়ে গেলেন সাজিয়ে রোজের মতন, আমাদের তিন মক্কেলের, বকুলের, সুচিস্মিতাদির আর স্বয়ং ভুলোদার। তার পর সেই থালায় পড়লো খান চারেক করে রুটি, আর সবুজ, গলা পাঁকের মতো এক দলা করে ঢ্যাঁড়শসেদ্ধ, এক্কেরে ছয় এক্কে ছয়টা থালায়!
 আমাদের অবাক, হতবাক, বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে, ভুলোদা অমায়িক মিহি হেসে বললেন, "ওরে, আমিই তোর বৌদিকে বললাম, যে তুমি শুধু আমার কথাই ভাবলে সোনাই, ওদের কথা ভাবলে না! ওরাও তো রোজ রোজ এত মুরগি মটন খেতে খেতে হাফিয়ে উঠছে, ওদের ও তো প্রাণ কাঁদে ঢ্যাঁড়শের জন্য! তাছাড়া, শৌনকটা এমনিতেই আমার অর্ধেক, চেহারার দিক  থেকে আর কি!এবার তো আমাকেও ছাপিয়ে  যাবে, শুচি আর হীরেনের বিয়ে, ওদের তো ডায়েট করাই উচিত। আর বকুলব্রত, রাজর্ষি দুটোই পেটরোগা! এবার থেকে আমায় যা দেবে, ওদেরও তাই দেবে।"
তার পর থেকে বৌদির হাজার ফোনেও আর ডিনার করিনি ওবাড়িতে।
সে যাক, কথা হচ্ছে যে ইদানিং আমি আর রাজু একদমই হতাশ, ভবঘুরে আর বেকার। কাজের মধ্যে দুই, খাই আর শুই। তাই ভুলোদার বাড়িতে আজ যাবো ভাবছি। ভুলোদা পার্টির অনেককে চেনে টেনে। তাদের মধ্যে একজন আছেন বিরাট শিবভক্ত, এবং তাঁর হাত প্রচুর লম্বা, মানে  যে হাতটা দেখা যায় না সেইটা আর কি।  ভদ্রলোকের নাম মিস্টার সাইকেল জয়শ্রীরাম স্কোফিল্ড।  দেখি যদি ভুলোদা ধরে কয়ে একটা হিল্লে করতে পারে!



Thursday, 1 March 2018

শুভবিবাহ

ভুলোদাকে দেখলে মায়া হয়। অতো বড়ো মাপের ও মনের মানুষটার সাথে এরকম হল, ভাবাই যায় না। যাই হোক, দেখা করতে গিয়েছিলাম ভুলোদার বাড়ি। ভুলোদার কান্নার সুর সানাইয়ের সুরের সাথে মিলে যাওয়ায় অনুনাদ তৈরি হয়েছে, যার ফলে বেশ অনেক দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া নাক থেকে টোয়েন্টি ফোর আওয়ার রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা তো আছেই। আমায় দেখে ভুলোদা হীরুদার গলায় বলে উঠলো, ‘রাজু, ওঠ শিগগির।‘ তারপরই মোষ-খাটালের মোষ ধোয়ার বালতি করে এক বালতি জল ঢেলে দিলো গায়ে। আমি ধড়মড় করে উঠতেই দেখি হীরুদা আর বুড়োদা চেঁচাচ্ছে, ‘কতক্ষণ ধরে ডাকছি। বিয়ে শুরু হলো বলে।‘
-বিয়ে! বিয়ে ভেঙ্গে গেছে না!
-আরেকবার বলে দেখ। ভুলোদা তোর ইয়ে ভেঙ্গে দেবে।
বুঝলাম বাবার দয়ায় স্বপ্ন দেখছিলাম। সেজেগুজে বেরোতে দেখি বিয়ে শুরু হব হব করছে।

সে ভুলোদা সুখে থাকুক বিয়ে করে। ছোটোবেলা থেকে পড়ে এসেছি ‘সেবা পরম ধর্ম।‘ আপাতত হেঁশেলের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় স্বস্কন্ধে তুলে নিলুম। আপাতত এই পর্যন্তই।।

ডেঞ্জারাস

ভুলোদা সাতদিন হল নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করেছে। সাতদিন ধরে ননস্টপ বিসমিল্লা খাঁর সানাইইয়ের করুন সুর বেজে যাচ্ছে। তার ভুঁড়িখানা স্থায়ীভাবে স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধন্ত নিয়েছে। কিন্তু তাঁর শরীর আর এই ধকল সহ্য করতে পারছে না। কাল রাত থেকে সানাইয়ের পরিবর্তে মাঝে মাঝে সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু তা যে শেষে এমন বিপদ ঘটাবে তা আর কেউ আশা করেনি। আজ সকাল থেকে তাঁর গলা থেকে আলট্রাসোনিক সাউন্ড বেরচ্ছে। দলে দলে বাদুড়েরা আসতে শুরু করেছে। খবর দেওয়া হয়েছে বনবিভাগে।
উপস্থিত অতিথিবর্গ হায় হায় করতে করতে বিয়েবাড়ি ত্যাগ করেছেন। বুড়োদা অবশ্য হায় হায় করছিল অন্য কারনে। সে রসগোল্লার কড়াইয়ের কাছে গিয়ে দেখে সবকটি রসগোল্লাই তাদের স্থায়ী আস্তানা ছেড়ে ঘাঁটি গেড়েছে বিভিন্ন জনার পেটে। একটিও আর নাই।

হীরুদার মোষ-খাটালে কাজ থাকায় বিয়েতে আসতে পারেনি। সব শুনে বলল, 'বাপরে! কী ডেঞ্জারাস!!'

নতুন হবে দাদা

ভৌস্তক অন্তর্ধান রহস্য